স্থবির যোগাযোগ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎহীন লাখো মানুষ

স্টর্ম গোরেত্তি: যুক্তরাজ্যজুড়ে তাণ্ডব

স্টর্ম গোরেত্তি: যুক্তরাজ্যজুড়ে তাণ্ডব


ভয়েস অব পিপল নিউজ, ৯ জানুয়ারি :  যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের কিছু অংশে আঘাত হানা ভয়াবহ শীতকালীন ঝড় ‘স্টর্ম গোরেত্তি‘ দেশজুড়ে এক অভূতপূর্ব বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। প্রবল বাতাস, ভারী বৃষ্টি ও তুষারপাতের কারণে রেল ও বিমান চলাচল স্থগিত, হাজার হাজার ঘরবাড়ি বিদ্যুৎহীন, বহু স্কুল বন্ধ এবং স্বাভাবিক জীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

নতুন তুষার ও বরফ সতর্কতা
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর মেট অফিস জানিয়েছে, রোববার পর্যন্ত স্কটল্যান্ড ও উত্তর ইংল্যান্ডের বিস্তীর্ণ এলাকায় তুষার ও বরফের নতুন হলুদ সতর্কতা জারি থাকবে।
রোববার ভোর ২টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত এই সতর্কতা কার্যকর থাকবে স্কটল্যান্ড, ইস্ট ও ওয়েস্ট মিডল্যান্ডস, নর্থ-ইস্ট ও নর্থ-ওয়েস্ট ইংল্যান্ড এবং ইয়র্কশায়ারে।
এদিকে, শুক্রবার দুপুর থেকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বড় অংশে বরফের সতর্কতা জারি রয়েছে। আংশিক গলে যাওয়া তুষার আবার জমে যাওয়ায় সড়ক ও পথচারী চলাচলে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডেও শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত তুষার ও বরফ সতর্কতা বলবৎ রয়েছে।

কর্নওয়াল ও আইলস অব সিলিতে সবচেয়ে ভয়াবহ আঘাত

ঝড়ের সবচেয়ে তীব্র আঘাত পড়েছে কর্নওয়াল ও আইলস অব সিলি অঞ্চলে। ঘণ্টায় প্রায় ১০০ মাইল গতির বাতাসে গাছ উপড়ে পড়েছে, বিদ্যুতের লাইন ছিঁড়ে গেছে এবং বহু রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। কর্নওয়াল কাউন্সিল শুক্রবার সকালে বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলার আহ্বান জানায়। এদিকে আরএনএলআই (RNLI)–এর স্বেচ্ছাসেবীরা কর্নওয়ালের উপকূলে “হারিকেন-শক্তির বাতাসে” একের পর এক উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন। ফালমাউথ এলাকায় এক রাতেই সাতটি উদ্ধার অভিযানের কথা জানানো হয়েছে—যা স্বেচ্ছাসেবীদের ভাষায় তাদের দেখা সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি।

বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও জাতীয় গ্রিডের লড়াই
স্টর্ম গোরেত্তির প্রভাবে যুক্তরাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিম ও ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ঘটে।

শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত:
দক্ষিণ-পশ্চিম ইংল্যান্ডে ৪০ হাজারের বেশি বাড়ি
ওয়েস্ট মিডল্যান্ডসে প্রায় ৯ হাজার
ইস্ট মিডল্যান্ডসে ৭০০-এর বেশি
ওয়েলসে ২০০-এর বেশি বাড়ি বিদ্যুৎহীন ছিল।

ন্যাশনাল গ্রিড জানিয়েছে, অতিরিক্ত প্রকৌশলী এনে রাতদিন কাজ করে শুক্রবার দুপুরের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৬৯ হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে। তবে পড়ন্ত গাছ, তুষার ও আটকে থাকা যানবাহনের কারণে অনেক এলাকায় পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

আদালত ব্যবস্থাও অচ
ঝড়ের প্রভাব পড়েছে ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাতেও। সড়ক যোগাযোগ ভেঙে পড়ায় বার্মিংহাম ক্রাউন কোর্টে একটি রিমান্ড বন্দীকেও হাজির করা সম্ভব হয়নি।
একটি গুরুতর মামলার সাজা ঘোষণার শুনানি বাতিল করতে হয়, কারণ আদালতের সেল ব্লকে মাত্র ছয়জন কর্মী উপস্থিত ছিলেন।

স্কুল বন্ধ, স্কটল্যান্ডে দীর্ঘস্থায়ী সংকট
স্কটল্যান্ডের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কয়েকদিন ধরে চলা তীব্র তুষারপাত ও হিমাঙ্কের নিচের তাপমাত্রা স্কুল বন্ধ ও যাতায়াত বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে।
স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি জানিয়েছেন, এখন সরকারের মনোযোগ ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার ও স্বাভাবিকতায় ফেরার দিকে।
রেকর্ড তাপমাত্রা ও বাতাসের গতি

মেট অফিসের তথ্যমতে:
সর্বনিম্ন তাপমাত্রা: -১৩.৩° সেলসিয়াস, ব্রেমার (অ্যাবারডিনশায়ার)
সর্বোচ্চ বাতাসের গতি: ৯৯ মাইল/ঘণ্টা, আইলস অব সিলির সেন্ট মেরিজ—১৯৯১ সালের পর সর্বোচ্চ
স্কটল্যান্ডের কিছু এলাকায় ২৫–২৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত তুষারপাত রেকর্ড হয়েছে।

গৃহহীনদের জন্য জরুরি ব্যবস্থা (SWEP)
ঝড়ের ভয়াবহতা বিবেচনায় ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বহু স্থানীয় কর্তৃপক্ষ Severe Weather Emergency Protocol (SWEP) চালু বা বাড়িয়েছে। এর আওতায় খোলা আকাশের নিচে থাকা মানুষদের জন্য জরুরি আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
লন্ডনের মেয়রের দপ্তর জানিয়েছে, জানুয়ারিতে এটি দ্বিতীয়বারের মতো SWEP চালু করা হলো।
এর পটভূমিতে ম্যানচেস্টারে সাম্প্রতিক ঠান্ডায় রাস্তায় ঘুমানো অবস্থায় দুজনের মৃত্যুর খবর গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সরকারকে কোবরা বৈঠকের আহ্বান
লিবারেল ডেমোক্র্যাট এমপি গিডিয়ন আমোস সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে কোবরা (COBRA) জরুরি কমিটির বৈঠক আহ্বানের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়,
“দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলকে বারবার উপেক্ষা করা হয়, কিন্তু এই সংকটে আমাদের উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।”

স্টর্ম গোরেত্তি শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি যুক্তরাজ্যের জরুরি সাড়া ব্যবস্থা, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর এক কঠিন পরীক্ষা।
বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, বিচার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে গৃহহীন মানুষের জীবন—সবকিছুই এই ঝড়ের মুখে নাজুক হয়ে পড়েছে। সামনে তাপমাত্রা বাড়লে তুষার গলার কারণে বন্যার ঝুঁকিও দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করেছে স্কটিশ পরিবেশ সংস্থা। ঝড় থেমে গেলেও, এর ক্ষত সারাতে সময় লাগবে আরও কয়েক দিন—বা হয়তো আরও বেশি।