বিশ্বব্যবস্থা পুনর্গঠনে ট্রাম্পের মহাপরিকল্পনা: ইউরোপের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
ভয়েস অব পিপল ডেস্ক রিপোর্ট, ৯ জানুয়ারি ২০২৬ :
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রায় আট দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্কের ভিত্তি ছিল একটি যৌথ প্রতিশ্রুতি—গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন রক্ষায় সম্মিলিত নিরাপত্তা। ১৯৪৭ সালের মার্চে প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের ঐতিহাসিক বক্তৃতার মাধ্যমে যে যুগের সূচনা হয়েছিল, সেই যুগের অবসান ঘটছে—এমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি (NSS)।
ডিসেম্বরে প্রকাশিত এই কৌশলপত্রে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা আর আগের মতো ‘নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার’ নেতৃত্ব দিতে আগ্রহী নয়। বরং সেই ব্যবস্থাকেই উদ্ধৃতি চিহ্নে রেখে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে—যা অনেক বিশ্লেষকের চোখে একটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক বার্তা।

‘নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা’ থেকে সরে আসার ঘোষণা ট্রাম্পের
নতুন নীতিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো—বিশেষ করে জাতিসংঘ—মার্কিন স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ এবং অনেক ক্ষেত্রেই ‘আমেরিকাবিরোধী মানসিকতায়’ পরিচালিত। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে সুপ্রজাতীয় (supranational) প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব কমানোর পথে হাঁটবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইতোমধ্যে ২০২৫ সালের মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে ইউরোপকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইউরোপের সবচেয়ে বড় হুমকি রাশিয়া নয়, বরং ইউরোপের ভেতরের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়। তিনি মুক্ত মতপ্রকাশ দমন এবং রাজনৈতিক বিরোধিতা রুদ্ধ করার অভিযোগ তুলেছিলেন ইউরোপীয় উদারপন্থীদের বিরুদ্ধে। ফরাসি দৈনিক লে মোঁদ এই বক্তব্যকে ইউরোপের বিরুদ্ধে ‘আদর্শিক যুদ্ধ ঘোষণা’ হিসেবে আখ্যা দেয়।
নতুন NSS কার্যত এই বক্তব্যকেই রাষ্ট্রীয় নীতিতে রূপ দিয়েছে।
জাতিরাষ্ট্রের প্রাধান্য, শক্তিধর রাষ্ট্রের আধিপত্য
এই কৌশলপত্রে বলা হয়েছে—
“বিশ্ব রাজনীতির মৌলিক একক হলো জাতিরাষ্ট্র, এবং তা-ই থাকবে। বৃহৎ, ধনী ও শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর অতিরিক্ত প্রভাব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চিরন্তন বাস্তবতা।”
এতে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র আবারও শক্তির ভারসাম্যভিত্তিক ‘গ্রেট পাওয়ার পলিটিক্স’-এর দিকে ফিরতে চাইছে। এই অবস্থানের সঙ্গে রাশিয়ার চিন্তাভাবনার মিল রয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ক্রেমলিন।
যুক্তরাজ্যের সাবেক সেনাপ্রধান লর্ড রিচার্ডস বলেন, “ট্রাম্প, পুতিন ও শি জিনপিং মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে আবার শক্তিধর রাষ্ট্রের রাজনীতিতে ফিরতে চাইছেন।”
তবে কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক স্যার লরেন্স ফ্রিডম্যান মনে করেন, অতীতের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাও পুরোপুরি নিয়ম মেনে চলেনি; অতএব অতিরিক্ত নস্টালজিয়া বিপজ্জনক।
লাতিন আমেরিকায় ‘মনরো নীতির’ পুনরুত্থান
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করা যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কৌশলের প্রথম বড় উদাহরণ। যদিও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এই অভিযানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, ওয়াশিংটন দাবি করছে—এটি মার্কিন আইনের আওতায় বৈধ।
নতুন NSS অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম গোলার্ধে নিজেদের শ্রেষ্ঠ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত রাখতে চায়। এটি ১৮২৩ সালের মনরো নীতির আধুনিক ও কঠোর পুনর্প্রয়োগ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিশেষ করে পানামা খাল, কলম্বিয়া, কিউবা ও লাতিন আমেরিকায় চীনের প্রভাব কমানো এই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, চীন এখন এই অঞ্চলে প্রধান বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত শক্তি—যা ওয়াশিংটনের জন্য কৌশলগত হুমকি।
মানবাধিকার চাপ থেকে সরে আসছে যুক্তরাষ্ট্র
নতুন নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—স্বৈরতান্ত্রিক দেশগুলোর ওপর মানবাধিকার প্রশ্নে আর চাপ সৃষ্টি না করার সিদ্ধান্ত। মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর ঐতিহ্য ও শাসনব্যবস্থাকে মেনে নিয়েই কাজ করবে।
তবে এই সহনশীলতা ইউরোপের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে না—এটাই সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য।
ইউরোপ নিয়ে কড়া ভাষা, ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়
নথিতে ইউরোপের ‘বর্তমান গতিপথ’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ইউরোপ শুধু অর্থনৈতিক অবনতির নয়, বরং ‘সভ্যতাগত বিলুপ্তির’ ঝুঁকিতে রয়েছে।
এমনকি আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে—আগামী কয়েক দশকের মধ্যে ন্যাটোর কিছু সদস্য রাষ্ট্র সংখ্যাগরিষ্ঠভাবে ‘অ-ইউরোপীয়’ হয়ে যেতে পারে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে অযোগ্য করে তুলবে।
বিশ্লেষক কারিন ভন হিপেল বলেন, “এটি একটি আদর্শিক ও জাতিবাদী নথি। এর অন্তর্নিহিত বার্তা হলো—পশ্চিমে আর খ্রিস্টান শ্বেতাঙ্গ পুরুষদের আধিপত্য নেই, আর সেটাকেই হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।”
ইউরোপের সামনে কঠিন বাস্তবতা
ইতোমধ্যে ইউরোপের অনেক নেতা বুঝতে শুরু করেছেন—যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো নির্ভরযোগ্য মিত্র নাও থাকতে পারে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্ৎস বলেছেন, ইউরোপকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ‘স্বাধীনতা অর্জন’ করতে হবে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—এটি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। ইউরোপীয় দেশগুলো বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ছাতার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
লর্ড রিচার্ডস সতর্ক করে বলেন, “ইইউ কোনোভাবেই এককভাবে ‘গ্রেট পাওয়ার’ হতে পারবে না। তাই ইউরোপকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কার প্রভাববলয়ে থাকবে।”
এই নতুন মার্কিন কৌশল কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে বিভাজন নয়, বরং উভয় সমাজের ভেতরের গভীর সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকেও প্রকাশ করে। অভিবাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে উদ্বেগ—দুই মহাদেশেই এক ধরনের ‘এস্টাবলিশমেন্ট-বিরোধী গণঅভ্যুত্থান’ তৈরি করছে।
বিশ্ব যে এক নতুন, অনিশ্চিত ও শক্তিনির্ভর যুগে প্রবেশ করছে—এই নথি তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত। আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে কঠিন মূল্য দিতে হতে পারে ইউরোপকেই।