কলিকালের কলধ্বনি – পর্ব: ৪৩।।  দেশের জনগনের কত গুণ: ১১ মাসে ৩৫০৯ খুন!

কলিকালের কলধ্বনি – পর্ব: ৪৩।।  দেশের জনগনের কত গুণ: ১১ মাসে ৩৫০৯ খুন!

দেশের জনগনের কত গুণ: ১১ মাসে ৩৫০৯ খুন!

।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর।। 

মানুষ যখন ভোরে ঘুম ভাঙে, তখন তার প্রথম ভাবনা হওয়া উচিত আশা, নিরাপত্তা আর স্বাভাবিক দিনের প্রত্যাশা। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে ভোর মানে আর আলো নয়—এক ধরনের অজানা শঙ্কা। বাসার দরজা খুলে বাইরে পা রাখা যেন লটারির টিকিট; কে জানে দিনের শেষে কোন অঘটনের খবর হবে আপনার? কার বাড়িতে আজ মৃত্যু ঢুকবে? কার সন্তান আর ফেরত আসবে না? একসময়ের প্রাণচঞ্চল শহরে রুদ্ধশ্বাস, গ্রামের নিস্তব্ধতা যেন আগের চেয়ে বেশি ভারী। এই পরিবেশে দাঁড়িয়ে পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়, আমাদের বর্তমানের নগ্ন প্রতিচ্ছবি।

প্রিয় পাঠক, বিদেশে বসে দেশের পত্রিকা পড়লে আজকাল গা শিউরে উঠে। অবশ্য যারা পত্র-পত্রিকা পড়েন না, টিভির খবর দেখেন  না তারা একদিক থেকে বেঁচে গেছেন। আনন্দে আছেন বিলাত, আমেরিকায়। কিন্তু আমাদের মতো যারা লেখালেখি জাতীয় কাজের সাথে জড়িত তাঁদের প্রতিদিন এসব লোমহর্ষক ঘটনা পড়তে হয়। আর সেটা নাড়ির টানে, দেশের টানে। অবশ্য অনেক প্রবাসী করতে পারেন আলাদা মানে! 

প্রতিদিনই আজকাল দেশে খুন হচ্ছে। ঘরে বা সড়কে কোথাও মানুষ নিরাপদ নয়। যেমন দেখুন,  গত ১১ মাসে দেশে হয়েছে ৩,৫০৯টি খুন।  ভেবে দেখুন জনগনের কত গুণ! দেশের জনগনের কেউ না কেউ এসব খুন করছে। আর দেশের মানুষই মরছে। আর এই জনগনের জন্যই আমরা বিদেশ থেকে প্রতিদিন খেটেখুটে মিলিয়ন মিলিয়ন পাউন্ড/ডলার পাঠাই। আমরাই দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরাই। আর জনগন করে টাকার বড়াই। রাস্তাঘাটে করে লডাই।

এসব খুন, মব সন্ত্রাস ইত্যাদি সভ্য সমাজে স্বাভাবিক হতে পারে না।  প্রতিটি খুনের পেছনে একটি পরিবার আছে, একটি অপূর্ণ জীবন আছে, আছে একটি ছিন্ন ভবিষ্যৎ। তারপরও রাষ্ট্রের ভাষ্য—“পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে।” কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে সম্পূর্ণ উল্টো কথা। প্রতিদিন গণমাধ্যমে উঠে আসে ধর্ষণ, খুন, ছিনতাই, অপহরণ, দস্যুতা, চুরি—যেন অপরাধই আজকের প্রাত্যহিকতার অনিবার্য অংশ।

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, গত ১১ মাসে মামলা হয়েছে ১,৬৮,৫০৫টি। খুন ৩,৫০৯, ডাকাতি ৫৭৮, নারী ও শিশু নির্যাতন ২০,৬৯১, চুরি–সিঁধেল চুরি ১১,৮২৩, অপহরণ ১,০১৪। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া ৫,৭৬৩টি অস্ত্রের মধ্যে এখনও ১,৩৪০টি উদ্ধার হয়নি। একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো কতটা দুর্বল হলে এমন বিপুলসংখ্যক অস্ত্র অপরাধীদের হাতে ঘুরে বেড়ায়—এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিচ্ছে না।

অন্যদিকে সমাজে তৈরি হয়েছে আরেক ভয়ংকর বাস্তবতা—গণপিটুনির সংস্কৃতি। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, শুধু এই বছরেই শতাধিক মানুষ জনতার হাতে প্রাণ হারিয়েছে। এটি আইনশৃঙ্খলার প্রতি মানুষের অবিশ্বাসের নগ্ন প্রকাশ। মানুষ বিশ্বাস করছে না যে বিচার পাবে, তাই নিজেই বিচারক হয়ে উঠছে। এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রতীক।

৯৯৯–এ আসা কলের ধরনও সমাজের মানসিক ভাঙন প্রকাশ করে। মারামারি–সংঘর্ষের কল ৭৯,২৩৯, ধর্ষণ–সংক্রান্ত সাহায্য–কল ৯৮৮, স্বামীর নির্যাতনে অসহায় নারীর কল ১৪,৯২৮—এই সংখ্যাগুলো শুধু অপরাধ নয়, আমাদের সামাজিক কাঠামোর বেদনাকে প্রকাশ করে। যেন মানুষের জীবন আরও দুর্বোধ্য, আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে; আর রাষ্ট্র কেবল নীরব সাক্ষী।

এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন একটাই—আমরা কোনদিকে যাচ্ছি? যে দেশে প্রতিদিন হত্যার সংখ্যা বাড়ে, যেখানে নারী ও শিশু নিরাপত্তাহীন, যেখানে অপরাধীদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে সাধারণ মানুষ ফিসফিস করে কথা বলে, সেখানে উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের দাবি নিছকই রাজনৈতিক মায়া। আগামী নির্বাচনের আগাম বার্তা ইতিমধ্যে বাতাসে ভাসছে, আর অপরাধের এই ঢেউ যদি শিগগিরই না থামে, তাহলে সেই নির্বাচনই অস্থিরতার নতুন জন্মক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

জাতি এখন যে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, সেখানে সবচেয়ে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ। দ্রুত বিচার, আধুনিক পুলিশিং, অপরাধীদের জামিন–নিয়ন্ত্রণ, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার—এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তা কি সত্যিই হবে? না কি অপরাধই ধীরে ধীরে হয়ে উঠবে এই সরকারের আরেকটি ‘উন্নয়নের’ পরিমাপ?

আজকের কলামে তাই একটাই আহ্বান—জাগো, রাষ্ট্র, জাগো জনতা। খুব দেরি হয়ে যাচ্ছে। যদি এখনই লাগাম টেনে ধরা না যায়, তবে এই অপরাধের অন্ধকার আগামী বছর আরও ভয়ংকর কোনো সংখ্যায় পরিণত হবে, যা হয়তো আর সামলানো যাবে না।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক।
লন্ডন, ১০ ডিসেম্বর ২০২৫