মোল্লা নাসির উদ্দিন হোজ্জার একটি শিক্ষনীয় ছোট গল্প
এক গ্রামের চায়ের দোকানে সন্ধ্যাবেলা মানুষ জড়ো হতো। সেখানেই বসতেন মোল্লা নাসিরুদ্দিন, সাদা দাড়ি, ঝকঝকে চোখ আর মুখে সবসময় একটা দুষ্টু হাসি নিয়ে। সবাই তাঁকে ভালোবাসত, কারণ তিনি কথায় কথায় এমন সব কথা বলতেন যা শুনে মনে হতো—আহা, এত সহজ ছিল ব্যাপারটা!
একদিন সন্ধ্যায় দোকানে বসে আড্ডা চলছিল। হঠাৎ গ্রামের সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী হাজি করিম এসে বসলেন। তিনি অনেক টাকার মালিক, তিনতলা পাকা বাড়ি, দশটা দোকান, লোকে মাথায় করে রাখে। কিন্তু সেদিন তাঁর মুখ ভার, চোখ লাল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
"মোল্লা, আমি যা চেয়েছি সব পেয়েছি। টাকা আছে, লোকে সম্মান করে, ছেলে বিদেশে পড়ে, মেয়ের বিয়ে রাজার মতো হয়েছে। কিন্তু আমার ভেতরটা খালি। রাতে ঘুম হয় না। মনে হয় আমি বড় অভাগা। সুখটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।"
চায়ের দোকানে সবাই চুপ করে গেল। মোল্লা একটু হাসলেন। তারপর ধীরেসুস্থে উঠে দোকানের কোণ থেকে একটা ছোট্ট মাটির প্রদীপ তুলে নিলেন। একটা মোমবাতি লাগিয়ে আগুন জ্বালালেন। টিমটিমে আলোয় পুরো দোকানটা যেন হেসে উঠল।
মোল্লা প্রদীপটা হাজি করিমের সামনে রেখে বললেন,
"হাজি সাহেব, এই আলোটা একটু দেখো তো। এটা কি তোমার মুখ আলো করে দিচ্ছে না? আমার মুখ? ওই কোণের বুড়ো চাচার মুখ? পুরো দোকানটা উজ্জ্বল হয়ে গেছে, তাই না?"
হাজি করিম মাথা নাড়লেন, "হ্যাঁ মোল্লা, সত্যি।"
মোল্লা হঠাৎ একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করলেন,
"এখন বলো তো, এই আলোটা কি তুমি পকেটে ভরে বাড়ি নিয়ে যেতে পারবে? নিজের জন্য একলা রেখে দিতে পারবে?"
হাজি করিম হেসে ফেললেন, "আরে মোল্লা, পাগল হয়েছ? আলো তো পকেটে ভরা যায় না। আলো তো ছড়িয়ে দেওয়ার জিনিস। যত বেশি ছড়াবে, তত বেশি পাবে। আটকে রাখলে তো নিভে যাবে!"
মোল্লা গম্ভীর হয়ে বললেন,
"বস্! তুমি নিজেই উত্তর দিয়ে দিলে।
সুখও ঠিক এই মোমবাতির আলোর মতো।
তুমি যতই টাকা জমাও, দামি জামা কাপড় কিনে নিজেকে সাজাও, বড় বাড়িতে একলা বসে থাকো—সুখটা তোমার কাছে আসবে না। কারণ সুখ আটকে রাখার জিনিস নয়। সুখ ছড়িয়ে দেওয়ার জিনিস।"
তিনি একটু থেমে আবার বললেন,
"তুমি যদি একজন গরিবকে দু'মুঠো খেতে দাও, একটা বিধবার ঘরে চাল পাঠাও, কারো মেয়ের বিয়েতে একটু সাহায্য করো, কারো কষ্ট শুনে দু'কথা সান্ত্বনা দাও—তখন সেই সুখ ছড়িয়ে পড়বে। আর ছড়াতে ছড়াতে একসময় তোমার নিজের বুকের ভেতর এসে ঠাঁই নেবে। তখন দেখবে, রাতে ঘুম আসছে, মুখে হাসি লেগে আছে।"
চায়ের দোকানে সবাই চুপ করে শুনছিল। হাজি করিমের চোখ দিয়ে দু'ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। তিনি উঠে মোল্লাকে জড়িয়ে ধরলেন।
পরের সপ্তাহ থেকে গ্রামে নতুন খবর ছড়াল—হাজি করিম মসজিদের পাশে একটা এতিমখানা খুলেছেন, গরিব ছাত্রদের পড়ার খরচ দিচ্ছেন, প্রতি শুক্রবার দোকানের সামনে গরম খিচুড়ি বিতরণ করছেন। আর লোকে বলাবলি করতে লাগল—হাজি সাহেবকে এখন আর কখনো বিষণ্ণ মুখে দেখা যায় না। তাঁর মুখে সবসময় একটা আলো ঝকঝক করছে—যেন একটা জ্বলন্ত প্রদীপ।
আর মোল্লা? তিনি আবার চায়ের দোকানে বসে হাসছেন। কেউ জিজ্ঞেস করল, "মোল্লা, তুমি কি সুখী?"
মোল্লা চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন,
"আমি তো আলোর মতোই বেঁচে আছি—যত ছড়াই, তত পাই।"
শিক্ষা:
প্রকৃত সুখ কখনো নিজের পকেটে ভরা যায় না।
তাকে ছড়িয়ে দিতে হয়।
যে ছড়ায়, তার ঘরেই শেষে সবচেয়ে বেশি আলো জ্বলে।