‘‘বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস’’ উপলক্ষে ভয়েস অব পিপল এর বিশেষ বিশ্লেষণধর্মী ফিচার

বাল্যবিবাহ রোধে শিক্ষা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা জরুরি

বাল্যবিবাহ রোধে শিক্ষা, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা জরুরি

কন্যা-জায়া-জননী ডেস্ক, ভয়েস অব পিপল, ১১ অক্টোবর:

উৎসর্গ

পৃথিবীর সকল কন্যাশিশু ও মেয়েদের প্রতি—

তাদের স্বপ্ন, সাহস, অধিকার ও সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায়।

প্রতিটি মেয়ে বেড়ে উঠুক নিরাপদে, শিক্ষার আলোয় এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের স্বাধীনতায়।

কন্যাশিশুর শিক্ষা, নিরাপত্তা ও নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বানের মধ্য দিয়ে আজ রোববার পালিত হচ্ছে বিশ্ব কন্যাশিশু দিবস। বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য এবং শিক্ষার মাঝপথে ঝরে পড়ার ঝুঁকি এখনো বিশ্বের কোটি কোটি মেয়ের স্বাভাবিক বিকাশের পথে বাধা হয়ে আছে। বাংলাদেশেও মেয়েদের শিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও বাল্যবিবাহ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘বাল্যবিবাহ বন্ধ করুন, কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিনিয়োগ করুন’। এর মূল বক্তব্য হলো, শুধু অল্প বয়সে বিয়ে বন্ধ করলেই কন্যাশিশুর অধিকার নিশ্চিত হয় না। তার জন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা এবং ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সুযোগ।

কন্যাশিশুর জীবনের সংকট কতটা গভীর হতে পারে, তার একটি উদাহরণ উঠে এসেছিল জাতিসংঘ শিশু তহবিলের (ইউনিসেফ) ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনে। সেখানে কক্সবাজারের উখিয়ার ১৬ বছর বয়সী তাহমিনার কথা বলা হয়। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় পরিবারের আর্থিক সংকট ও বাবার অসুস্থতার কারণে তার বিয়ের চিন্তা শুরু হয়। কিন্তু পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাওয়া কিশোরীটি সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি। তার অভিজ্ঞতা দেখায়, পারিবারিক সংকটের সময় অনেক মেয়ের শিক্ষা ও ব্যক্তিগত স্বপ্ন কত সহজে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।

বিশ্বজুড়ে বাল্যবিবাহের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর এক কোটিরও বেশি মেয়ের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের সুফলও রয়েছে। শিক্ষা বিস্তার, আইনগত সুরক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে গত ২৫ বছরে বিশ্বে আনুমানিক ৬ কোটি ৮০ লাখ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছে বলে ইউনিসেফের বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে মেয়েদের বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণ বেড়েছে। কিন্তু বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো এক বিষয় নয়। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের (এমআইসিএস) উদ্ধৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে। আর ১৩ দশমিক ৪ শতাংশের বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর বয়সের আগেই। এই পরিসংখ্যান কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষায় আরও কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

দারিদ্র্য ও বাল্যবিবাহের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। পরিবারের আয় কম হলে অনেক সময় মেয়েদের পড়াশোনার খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ে। কোথাও সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, কোথাও যৌতুকের চাপ, আবার কোথাও প্রচলিত সামাজিক ধারণা অল্প বয়সে বিয়ের সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করে। ফলে বাল্যবিবাহকে শুধু একটি সামাজিক প্রথা হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র বোঝা যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং মেয়েদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতার অভাব।

এ পরিস্থিতিতে মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি ও আর্থিক সহায়তার গুরুত্ব অপরিসীম। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে যাতে কোনো মেয়েকে বিদ্যালয় ছাড়তে না হয়, সে জন্য শিক্ষা ব্যয়ের পাশাপাশি পুষ্টি, যাতায়াত ও নিরাপত্তার বিষয়েও নজর দেওয়া প্রয়োজন। শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি বাড়ানো নয়, মেয়েরা যাতে নিয়মিত ক্লাস করতে পারে এবং মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারে, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

একই সঙ্গে দরিদ্র পরিবারের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাল্যবিবাহের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। পরিবার যখন খাদ্য, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে হিমশিম খায়, তখন মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় নারীর হাতে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছানো পরিবারের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি সন্তানদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর ভূমিকা বাড়াতে পারে। তবে এসব কর্মসূচির সুফল নিশ্চিত করতে স্বচ্ছ উপকারভোগী নির্বাচন, নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহি প্রয়োজন।

কন্যাশিশুর উন্নয়নকে শুধু বিদ্যালয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখলেও চলবে না। শিক্ষা শেষে কর্মসংস্থান, কারিগরি প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং আর্থিক স্বাধীনতার পথ তৈরি করতে হবে। একটি মেয়ে যেন নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী পেশা বেছে নিতে পারে, নিজের উপার্জন ব্যবহার করতে পারে এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মতামত দিতে পারে, সেটিই হওয়া উচিত ক্ষমতায়নের মূল লক্ষ্য।

পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মেয়ের ভবিষ্যৎকে শুধু বিয়ে ও সংসারজীবনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ছেলেমেয়ে উভয়ের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিকাশে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিদ্যমান আইন কার্যকর করা, জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিতে থাকা কিশোরীদের জন্য সহায়তা ও অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

কন্যাশিশুর নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজের সম্মিলিত ভূমিকা অপরিহার্য। যৌন হয়রানি, সহিংসতা ও বৈষম্যের আশঙ্কায় কোনো মেয়েকে যেন বিদ্যালয় ছাড়তে না হয়, সে জন্য কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকতে হবে। বাল্যবিবাহের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে পারলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি পরিবারকে বিকল্প সহায়তার ব্যবস্থাও করতে হবে।

বিশ্ব কন্যাশিশু দিবসের তাৎপর্য তাই একটি দিনের আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে অনেক বেশি। এ দিবস মনে করিয়ে দেয়, একটি মেয়ের শৈশব রক্ষা করা, তার শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করা রাষ্ট্র ও সমাজের দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ব।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন অনেকাংশে নির্ভর করছে আজকের কন্যাশিশুরা কী ধরনের সুযোগ পাচ্ছে, তার ওপর। তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ ভবিষ্যতের দক্ষ কর্মী, উদ্যোক্তা, শিক্ষক, চিকিৎসক, গবেষক ও সচেতন নাগরিক তৈরির ভিত্তি গড়ে দেয়। তাই কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষা কোনো দয়া বা অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয় নয়; এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও টেকসই অগ্রগতির অপরিহার্য শর্ত।

কন্যাশিশুকে শুধু সুরক্ষা দেওয়াই যথেষ্ট নয়, তাকে নিজের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ দিতে হবে। বাল্যবিবাহমুক্ত শৈশব, মানসম্মত শিক্ষা, নিরাপদ পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার পথ নিশ্চিত করা গেলে একটি মেয়ের জীবন যেমন বদলাবে, তেমনি শক্তিশালী হবে পরিবার, সমাজ ও দেশের ভবিষ্যৎ।