রেললাইনের কেবিন থেকে প্রশিক্ষকের আসনে

লন্ডনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মারওয়ার অনন্য যাত্রা

লন্ডনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মারওয়ার অনন্য যাত্রা

ভয়েস অব পিপল প্রতিবেদন, ১৬ আগস্ট:

লন্ডনের ব্যস্ত রেলপথে প্রতিদিন ছুটে চলে অসংখ্য ট্রেন। হাজারো মানুষের গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার এই বিশাল ব্যবস্থার আড়ালে কাজ করেন এমন অনেক মানুষ, যাঁদের গল্প সাধারণ যাত্রীর চোখে ধরা পড়ে না। তাঁদেরই একজন মারওয়া খায়ের—বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক নারী, যিনি যাত্রীসেবা এজেন্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে ডকল্যান্ডস লাইট রেলওয়ে বা ডিএলআরের ট্রেন অপারেটর হয়েছেন, পরে সেই অভিজ্ঞতা দিয়ে তৈরি করছেন নতুন প্রজন্মের অপারেটরদের।

মারওয়ার গল্প শুধু একটি চাকরি বদলের গল্প নয়। এটি নিজের সামর্থ্যের ওপর আস্থা, পারিবারিক ধারণাকে বদলে দেওয়া এবং পুরুষ-প্রধান কর্মক্ষেত্রে নিজের জায়গা তৈরি করার গল্প।

ব্যাংক থেকে রেললাইনে

কর্মজীবনের শুরুতে রেলওয়ে মারওয়ার পরিকল্পনাতেই ছিল না। ২০১০ সালের দিকে তিনি ন্যাটওয়েস্ট ব্যাংকে কাজ করছিলেন। এর আগে ওষুধের দোকান ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানেও চাকরি করেছেন।

ব্যাংকিং পেশায় স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট তাঁর সেই পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা তৈরি করে। তখন ডিএলআরে কর্মরত এক বন্ধু তাঁকে রেলওয়েতে আবেদন করার পরামর্শ দেন।

ভালো বেতন, দীর্ঘমেয়াদি চাকরির সুযোগ এবং নতুন কিছু শেখার সম্ভাবনা মারওয়াকে আকৃষ্ট করে। শেষ পর্যন্ত তিনি আবেদন করেন ডিএলআরের প্যাসেঞ্জার সার্ভিস এজেন্ট বা পিএসএ পদে।

কাজটি বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তার দায়িত্ব অনেক বেশি। স্বয়ংক্রিয় ট্রেনে পিএসএকে একদিকে যাত্রীসেবা দিতে হয়, অন্যদিকে ট্রেন পরিচালনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়। স্টেশনে ট্রেন থামার পর দরজা নিরাপদে বন্ধ করা, যাত্রা শুরুর প্রস্তুতি নেওয়া, নিয়মিত ঘোষণা দেওয়া, যাত্রীদের গন্তব্য বুঝিয়ে দেওয়া—সবই তাঁর দায়িত্বের অংশ।

আর লন্ডনের মতো বহুজাতিক শহরে এই দায়িত্বের গুরুত্ব আরও বেশি। বিশেষ করে পূর্ব লন্ডনে বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাস। অনেক যাত্রী লন্ডনের জটিল পরিবহনব্যবস্থায় নতুন। তাঁদের পথ দেখানোও পিএসএর কাজ।

চার মাসের প্রশিক্ষণ, তারপর লাইসেন্স

ডিএলআরে যোগ দেওয়ার আগে মারওয়ার কোনো বিশেষ টেকনিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল না। কিন্তু সেটিই বাধা হয়নি।

প্রায় চার মাসের প্রশিক্ষণের পর তাঁকে আরও দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। লিখিত ও ব্যবহারিক পরীক্ষা সফলভাবে শেষ করার পরই মেলে ট্রেন পরিচালনার লাইসেন্স।

২০১১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রেন অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব নেন মারওয়া।

তবে এই সিদ্ধান্তে তাঁর পরিবার শুরুতে খুব একটা খুশি ছিল না। পরিবারের প্রচলিত ধারণা ছিল—রেল চালানো বা এ ধরনের কাজ পুরুষদের জন্য। একজন নারীর জন্য এমন পেশা বেছে নেওয়া ছিল অস্বাভাবিক।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা বদলায়। আজ তাঁর পরিবারই তাঁর সবচেয়ে বড় সমর্থকদের একজন।

অলিম্পিকের মশাল আর একটি কণ্ঠস্বর

রেলওয়েতে যোগ দেওয়ার মাত্র এক বছর পর মারওয়ার সামনে আসে এমন একটি সুযোগ, যা তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে আছে।

২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিক ও প্যারালিম্পিকের সময় ক্যানারি ওয়ার্ফ থেকে স্ট্র্যাটফোর্ডে প্যারালিম্পিকের মশাল বহনকারী ডিএলআর ট্রেনটির অপারেটর হিসেবে তাঁকে বেছে নেওয়া হয়।

এর পেছনে ছিল তাঁর একটি বিশেষ দক্ষতা—ট্রেনে যাত্রীদের উদ্দেশে ঘোষণা দেওয়ার আকর্ষণীয় কণ্ঠ ও উপস্থাপনার ধরন।

বিশেষ সেই যাত্রায় বিবিসিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম উপস্থিত ছিল। মারওয়ার ঘোষণা হয়ে ওঠে আয়োজনটিরও একটি অংশ। সেই কণ্ঠ পরবর্তী সময়ে ডিএলআরের প্রশিক্ষণেও জায়গা করে নেয়।

ট্রেন অপারেটরদের জন্য তৈরি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ভিডিওতে তাঁর কণ্ঠে পরিচালন পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা রেকর্ড করা হয়েছে।

একজন অপারেটরের কণ্ঠ এভাবেই পরিণত হয় অন্য অপারেটরদের শেখার উপকরণে।

যখন স্বয়ংক্রিয় ট্রেন চালাতে হয়েছে হাতে

ডিএলআর স্বয়ংক্রিয় রেলব্যবস্থা। কিন্তু সব সময় প্রযুক্তি নিখুঁতভাবে কাজ করে না।

মারওয়ার কর্মজীবনের শুরুর দিকে সিগন্যালিং ব্যবস্থার ত্রুটি ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কখনো দিনে কয়েকবার পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে ম্যানুয়ালি ট্রেন চালাতে হয়েছে।

ম্যানুয়াল ড্রাইভিং তাঁর কাছে যেমন রোমাঞ্চকর ছিল, তেমনি ছিল কঠিন দায়িত্ব। অনুমতি ও নির্দিষ্ট নির্দেশনা ছাড়া এভাবে ট্রেন চালানো যায় না। নির্দিষ্ট স্টেশন থেকে নির্দিষ্ট স্টেশন পর্যন্ত ট্রেন চালানোর সময় নিরাপত্তাই ছিল সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

সমস্যা হতো যাত্রীদের নিয়েও। ডিএলআর ট্রেনে চালকের জন্য আলাদা কেবিন না থাকায় যাত্রীরা সরাসরি চালকের কাছে আসতে পারেন। কিন্তু ম্যানুয়াল মোডে ট্রেন চালানোর সময় চালকের মনোযোগ সামনের দিকে রাখা জরুরি।

তাই আগে থেকেই ঘোষণা দিয়ে যাত্রীদের সতর্ক করতে হতো—ট্রেনটি এখন ম্যানুয়াল মোডে চলছে, গতি স্বাভাবিকের চেয়ে কম হতে পারে এবং গন্তব্যে পৌঁছাতে বাড়তি সময় লাগবে।

তারপরও অনেক যাত্রী জানতে চাইতেন, ট্রেন এত ধীরে চলছে কেন।

মারওয়ার কাছে তখন উত্তর ছিল একটাই—যত তাড়া থাকুক, নিরাপত্তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেই।

কঠিন মুহূর্তের মুখোমুখি

রেলওয়ের চাকরি শুধু প্রযুক্তি ও যাত্রীসেবার বিষয় নয়। কখনো কখনো অপারেটরদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যা মানসিকভাবে অত্যন্ত কঠিন।

ট্রেনের সামনে কেউ ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি সামলানোর দায়িত্বও পিএসএর ওপর পড়ে। এমন ঘটনার পর অনেক সহকর্মী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি।

মারওয়া নিজেও এমন পরিস্থিতিতে সহকর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কখনো তাঁকে গিয়ে ট্রেন সরিয়ে নেওয়া বা রিভার্স করার মতো কঠিন দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে।

এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁর কাছে চাকরির কঠিন বাস্তবতার অংশ। কিন্তু একই সঙ্গে এগুলো তাঁকে আরও দৃঢ় করেছে।

অপারেটর থেকে প্রশিক্ষক

চার বছর ট্রেন পরিচালনার পর মারওয়ার কর্মজীবনে আসে নতুন মোড়। এবার তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয় অপারেটরদের প্রশিক্ষক হিসেবে।

এবার তাঁকে শুধু নিজে সঠিকভাবে কাজ করলেই চলবে না। অন্যদেরও সেই কাজ শেখাতে হবে, ভুল ধরিয়ে দিতে হবে এবং প্রয়োজনে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

পুরুষ-প্রধান কর্মক্ষেত্রে একজন নারী প্রশিক্ষক হিসেবে এই দায়িত্ব সহজ ছিল না।

মারওয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু নারী প্রশিক্ষকের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিতে হবে—এই কারণে দুজন প্রশিক্ষণার্থী কোর্স ছেড়ে দিয়েছিলেন। এমনকি একজন তাঁকে বলেছিলেন, তিনি এমন কোনো নারীকে মানতে চান না, যিনি তাঁকে কী করতে হবে তা বলে দেবেন।

কথাগুলো কষ্ট দিয়েছে। কিন্তু তাঁকে থামাতে পারেনি।

বরং বুঝিয়েছেন—পেশাগত দক্ষতার কোনো লিঙ্গ নেই।

বর্তমানে ডিএলআরের অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকদের একজন মারওয়া। তাঁর বিভাগে কর্মরত বিপুলসংখ্যক অপারেটর কোনো না কোনো সময়ে তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।

একসময় যে পেশায় প্রবেশ করতে পরিবারকে বোঝাতে হয়েছিল, আজ সেই পেশাতেই অন্যদের দক্ষ করে তুলছেন তিনি।

শিকড়ের টান সিলেটে

মারওয়ার জন্ম সৌদি আরবে। বেড়ে ওঠা যুক্তরাজ্যে। তাঁর বাবা ছিলেন প্রকৌশলী এবং কর্মজীবনের বড় সময় কাটিয়েছেন সৌদি আরবে। তাঁদের পারিবারিক শিকড় বাংলাদেশের সিলেটের গোলাপগঞ্জে। সুযোগ পেলেই তিনি বাংলাদেশে যান। দেশের সঙ্গে সম্পর্কও ধরে রেখেছেন গভীরভাবে।

বাংলাদেশের মেট্রোরেল এখনো তাঁর চড়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে তাঁর আক্ষেপ আছে। লন্ডনের রেলপথে এত বছর কাজ করার পর নিজের দেশের মেট্রোরেলে একদিন যাত্রী হওয়ার অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই তাঁর জন্য আলাদা অনুভূতির হবে।

চার বোনের পরিবারে বড় হয়েছেন মারওয়া। তাঁর মতে, তাঁর সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা বাবা-মায়ের। তাঁরা সন্তানদের ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ের পার্থক্য করেননি। পড়াশোনার পাশাপাশি গান, বাদ্যযন্ত্র ও অন্যান্য বিষয়ে আগ্রহী হওয়ার স্বাধীনতাও দিয়েছেন।

তাই মারওয়ার গল্পে পরিবারও গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্র।

নতুন প্রজন্মের মেয়েদের জন্য বার্তা

আজকের মারওয়া শুধু একজন রেল প্রশিক্ষক নন; তিনি একটি সম্ভাবনার উদাহরণ।

তিনি মনে করেন, ব্রিটিশ-বাংলাদেশি মেয়েদের ভবিষ্যৎকে কয়েকটি প্রচলিত পেশার মধ্যে আটকে রাখার কোনো কারণ নেই। ডাক্তার, শিক্ষক কিংবা প্রচলিত চাকরির বাইরেও রেলওয়ে, প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার মতো অসংখ্য ক্ষেত্র নারীদের জন্য উন্মুক্ত।

প্রয়োজন শুধু সুযোগ এবং সেই সুযোগ গ্রহণের সাহস।

মারওয়ার নিজের জীবন যেন সেই কথারই প্রমাণ—ব্যাংকের অনিশ্চয়তা তাঁকে রেললাইনে এনেছিল, রেললাইন তাঁকে অপারেটর বানিয়েছে, আর সেই অভিজ্ঞতাই শেষ পর্যন্ত তাঁকে নিয়ে গেছে প্রশিক্ষকের আসনে।

লন্ডনের ছুটে চলা ট্রেনের ভেতর তাঁর কণ্ঠ আজও যাত্রীদের পথ দেখায়। আর প্রশিক্ষণকক্ষে সেই কণ্ঠ নতুন অপারেটরদের শেখায়—নিরাপত্তা, দায়িত্ব এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কীভাবে একটি ট্রেন ও তার যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে হয়।

একসময় যে নারীকে শুনতে হয়েছিল, ‘এটা মেয়েদের কাজ নয়’, তিনিই আজ প্রমাণ করছেন—কোনো পেশার দরজা নারী বা পুরুষের জন্য আলাদা করে তৈরি হয় না। দরজা খুলে ঢোকার সাহসটাই আসল।