ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

বিয়ের সাজে পাচারের ফাঁদ, চীনে ‘বউ’ হয়ে যাচ্ছে শত শত বাংলাদেশি তরুণীরা

বিয়ের সাজে পাচারের ফাঁদ, চীনে ‘বউ’ হয়ে যাচ্ছে শত শত বাংলাদেশি তরুণীরা

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১৭ আগস্ট:

চারদিকে ঝলমলে আলো। নতুন কনের পরনে লাল বেনারসি, হাতে মেহেদির নকশা। পাশে বরের সাজে বসে আছেন এক বিদেশি নাগরিক। ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে চলছে গায়েহলুদ, বিয়ে ও নানা আনুষ্ঠানিকতা। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে—এটি আর দশটি স্বাভাবিক বিয়ের মতোই।

কিন্তু এই সাজানো দৃশ্যের আড়ালেই তৈরি হচ্ছে মানবপাচারের ভয়ংকর ফাঁদ। উন্নত জীবনের স্বপ্ন, ভালো চাকরি কিংবা বিদেশি স্বামীর সঙ্গে সুখী সংসারের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশের কিশোরী ও তরুণীদের পাচার করছে একটি আন্তর্জাতিক চক্র। চীন ও কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন দেশে নিয়ে গিয়ে তাঁদের কেউ পড়ছেন বন্দিত্বে, কেউ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, আবার কারও জীবনে নেমে আসছে যৌন দাসত্বের অন্ধকার।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, পাচারের এই প্রক্রিয়াকে বৈধতার চেহারা দিতে ব্যবহার করা হচ্ছে বিয়ের কাবিননামা।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালেই প্রায় ১ হাজার ৩০০ বাংলাদেশি নারী ‘বউ’ হিসেবে চীনে গেছেন। মানবপাচার নিয়ে কাজ করা তদন্তকারীদের ধারণা, তাঁদের অন্তত অর্ধেকই পাচারের শিকার হয়ে থাকতে পারেন।

কাবিননামাই হয়ে উঠছে পাচারের ঢাল

পাচারকারীরা প্রথমে খুঁজে নেয় দরিদ্র পরিবারের অপেক্ষাকৃত কম বয়সী তরুণীদের। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সীমান্তবর্তী এলাকা, পার্বত্য অঞ্চল ও প্রত্যন্ত গ্রাম—সবখানেই স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে চলছে এই টার্গেটিং।

কাউকে বলা হয় চীনে ভালো বেতনের চাকরি দেওয়া হবে। কাউকে দেওয়া হয় ধনী বিদেশি পাত্রের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব। বলা হয়, বিয়ের পর নতুন জীবনে আর্থিক স্বচ্ছলতা আসবে, পরিবারের অভাব দূর হবে।

এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় ধাপ।

তরুণীকে ঢাকায় এনে একটি গোপন আস্তানায় রাখা হয়। সেখানে নানা কৌশলে তাঁর আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও ধারণ করে রাখা হয়। পরে সেসব ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাঁকে বিয়েতে রাজি হতে বাধ্য করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

চীনা নাগরিককে বর সাজিয়ে আয়োজন করা হয় গায়েহলুদ ও বিয়ের অনুষ্ঠান। তোলা হয় ছবি-ভিডিও। তৈরি করা হয় কাবিননামা ও অন্যান্য কাগজপত্র। পরে এসব নথি ব্যবহার করা হয় বিদেশে যাওয়ার ভিসা প্রক্রিয়ায়।

অর্থাৎ যে বিয়ে একজন নারীর নিরাপত্তা ও নতুন জীবনের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কথা, সেটিই হয়ে উঠছে পাচারকারীদের কাছে বিদেশে পাঠানোর ‘বৈধ কাগজ’।

শাপলার গল্পে ভয়ংকর বাস্তবতা

খুলনার শাপলা—নামটি পরিবর্তিত—এই চক্রের হাত থেকে ফিরে আসা একজন নারী।

সংসারের আর্থিক সংকট দূর করার আশায় চাকরির প্রস্তাবে গত বছরের ২১ ডিসেম্বর তিনি ঢাকায় আসেন। অভিযোগ অনুযায়ী, মানবপাচার চক্রের হোতা নাইমা খাতুন তাঁকে চাকরির কথা বলে ঢাকায় ডেকে আনেন। পরে বাড্ডার একটি আস্তানায় আটকে রেখে তাঁর আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করা হয়।

সেই ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ২ ফেব্রুয়ারি তাঁকে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয় ওয়াং জেন জেন নামের এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে। বিয়ের কিছুদিন পর ১৪ মার্চ স্বামীর সঙ্গে চীনে চলে যান শাপলা।

কিন্তু যে জীবনকে সুখের সংসার বলে দেখানো হয়েছিল, চীনে পৌঁছানোর পর সেটিই হয়ে ওঠে বন্দিজীবন।

শাপলার বর্ণনা অনুযায়ী, হেনান প্রদেশের একটি ছোট ঘরে তাঁকে তালাবদ্ধ করে রাখা হতো। চলত নির্যাতন। একপর্যায়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকেই সুযোগ বুঝে পালিয়ে কাছের একটি রেস্টুরেন্টে আশ্রয় নেন তিনি।

ভাষা জানেন না। পরিচিত কেউ নেই। সঙ্গে নেই নিরাপদ কোনো আশ্রয়। রেস্টুরেন্টে থাকা কয়েকজন চীনা নাগরিকের কাছে সাহায্য চান শাপলা। মোবাইল ফোনের অনুবাদ ব্যবহার করে তাঁরা তাঁর বিপদের কথা বুঝতে পারেন। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে তাঁকে উদ্ধার করা হয় এবং তাঁর কথিত স্বামী ওয়াং জেন জেনকে আটক করা হয়।

মানবপাচার নিয়ে কাজ করা সংস্থা জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের সহযোগিতায় গত ৫ আগস্ট দেশে ফিরতে সক্ষম হন শাপলা।

একজন ফিরেছেন, কতজন এখনো বন্দি?

দেশে ফিরে শাপলা তদন্তকারীদের যে তথ্য দিয়েছেন, সেটিই আরও বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে।

তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু চীনের গুয়াংজু ও আশপাশের এলাকাতেই অর্ধশতাধিক বাংলাদেশি নারী বন্দি অবস্থায় থাকতে পারেন। তাঁদের অনেকের পাসপোর্টও কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাঁদের কেউ হয়তো পরিবারের কাছে এখনো জানাতে পারেননি কোথায় আছেন। কেউ হয়তো যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছেন না। আবার কেউ হয়তো ভয় দেখানোর কারণে নীরব থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

একজন শাপলা ফিরে এসেছেন। কিন্তু তাঁর মতো আর কতজন একই পরিস্থিতিতে আছেন—সেই হিসাবই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন।

১২ থেকে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে একটি জীবন

তদন্তে উঠে এসেছে, পাচার হওয়া নারীদের বয়স ও চেহারার ওপর ভিত্তি করে তাঁদের ‘মূল্য’ নির্ধারণ করা হয়। একেকজন নারীকে নিয়ে ৮ লাখ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

শাপলার অভিযোগ, তাঁর কথিত স্বামী তাঁকে ২০ লাখ টাকায় কিনে নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।

একজন মানুষকে পণ্যের মতো মূল্য নির্ধারণ করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পাঠানো হচ্ছে। স্থানীয় ও বিদেশি দালালদের মধ্যে ভাগ হয়ে যাচ্ছে সেই অর্থ। আর যার বিনিময়ে টাকা আসছে, সেই নারী হারাচ্ছেন নিজের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ।

চীনের পাশাপাশি কম্বোডিয়াতেও একই চিত্র

শুধু চীন নয়, কম্বোডিয়াতেও বাংলাদেশি নারীদের পাচারের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

গত ১ জুলাই পাচারের শিকার এক বাংলাদেশি নারী ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহায়তায় কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফেরেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নারী পাচার চক্রের হোতা রুবেলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডি।

এতে স্পষ্ট হচ্ছে, বিদেশি পাত্র কিংবা চাকরির প্রলোভনকে সামনে রেখে নারীদের পাচারের যে কৌশল তৈরি হয়েছে, তা এক দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

নারীই যখন পাচারচক্রের হোতা

এই চক্রের আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো—পাচারকারীদের মধ্যে নারীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

চীনে নারী পাচারের ঘটনায় নাইমা ও সিলভিয়া নামের দুই বাংলাদেশি নারীর নাম তদন্তে এসেছে। তাঁরা চীনে অবস্থান করে নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

দেশে তাঁদের হয়ে কাজ করছে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ জন সক্রিয় দালাল। তাঁদের মধ্যে জান্নাতুল বাকি আদর, সজিব, কলি চাকমা ও রিকা চাকমাসহ বেশ কয়েকজনের নাম তদন্তে এসেছে।

শাপলার মা মামলা করার পরও চীনে অবস্থানরত প্রধান অভিযুক্ত নাইমা মোবাইল ফোনে তাঁদের হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন পরিবারটি।

ফলে শুধু উদ্ধার করাই নয়, পাচারচক্রের বিদেশি ও দেশীয় নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে তাদের আইনের আওতায় আনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

আইন আছে, দরকার সচেতনতা ও নজরদারি

মানবপাচার প্রতিরোধে আইন থাকলেও বাস্তবে পাচারকারীরা আইনের ফাঁক ও মানুষের অসহায়ত্বকে কাজে লাগাচ্ছে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবার, প্রত্যন্ত অঞ্চল ও পার্বত্য এলাকার তরুণীরা হয়ে উঠছেন সহজ টার্গেট।

মানবপাচার নিয়ে কাজ করা জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ারের কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ করে এই অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। প্রান্তিক ও পাহাড়ি এলাকায় ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে।

কারণ পাচারকারীর প্রথম অস্ত্র বন্দুক নয়—প্রলোভন।

একটি চাকরির প্রতিশ্রুতি, বিদেশে ভালো জীবনের স্বপ্ন কিংবা ধনী বিদেশি পাত্রের প্রস্তাব দিয়েই শুরু হয় ফাঁদ। এরপর সেই ফাঁদকে বিয়ের সাজ, কাবিননামা ও ছবি-ভিডিও দিয়ে বৈধতার আবরণ দেওয়া হয়।

তাই বিদেশি পাত্রের সঙ্গে বিয়ে, বিদেশে চাকরি কিংবা দ্রুত ভিসার প্রস্তাব এলেই শুধু পরিবারের সম্মতিকে যথেষ্ট মনে করলে চলবে না। পাত্রের পরিচয়, কর্মস্থল, ঠিকানা, বিয়ের বৈধতা, ভিসার ধরন এবং মধ্যস্থতাকারীদের পরিচয় যাচাই করতে হবে।

নইলে যে মেয়েটি লাল বেনারসি পরে স্বপ্নের সংসারে পা রাখছে বলে মনে করবে, বিমানবন্দরের দরজা পেরোনোর পর তার সামনে খুলে যেতে পারে এমন এক পৃথিবী—যেখান থেকে ফিরে আসার পথটুকুও হয়তো থাকবে না।