কলিকালের কলধ্বনি ।। ৭৭ ।। ক্ষমতার চূড়ায় দাঁড়িয়ে একা স্টারমার: তবে কি তাঁর নেতৃত্ব হচ্ছে চূরমার?

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৭৭ ।। ক্ষমতার চূড়ায় দাঁড়িয়ে একা স্টারমার: তবে কি তাঁর নেতৃত্ব হচ্ছে চূরমার?

উৎসর্গ:
“গণতন্ত্রের নীরব সংকটকে যারা শুনতে জানেন—তাদের প্রতি।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার

ব্রিটিশ রাজনীতি আজ এক অদ্ভুত নীরবতার ভেতর দাঁড়িয়ে আছে। এই নীরবতা শান্ত নয়, স্বস্তিরও নয়—এটি ভারী, চাপা, আর গভীরভাবে অস্বস্তিকর। শব্দের অনুপস্থিতিতেই এখানে সবচেয়ে বেশি কথা বলা হচ্ছে। কিয়ার স্টারমারকে ঘিরে যে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে, তা আর কেবল গুঞ্জন বা বিশ্লেষকদের অনুমান নয়; এটি এখন বাস্তব, দৃশ্যমান, এবং ক্রমশ অসহনীয় হয়ে উঠছে।

সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহকারীর পদত্যাগের পর স্টারমার যে কার্যত একা হয়ে পড়েছেন, তা আর আড়াল করার সুযোগ নেই। ব্রিটিশ রাজনীতিতে একা হয়ে পড়া মানে শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়—এটি প্রায়শই পতনের পূর্বাভাস। এখানে নেতৃত্ব মানে একা সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়; বরং দলের ভেতরে সমর্থনের জাল বুনে রাখা। সেই জাল যখন ছিঁড়ে যেতে শুরু করে, তখন প্রধানমন্ত্রীর পদটিও হঠাৎ করে খুব উঁচু আর খুব নির্জন হয়ে ওঠে।

বরিস জনসন একসময় বলেছিলেন, রাজনীতিতে “হের্ড ইনস্টিংক্ট”—দলের ভেতরের সমষ্টিগত মনোভাব—একবার নেতার বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ালে আর ফিরে আসে না। আজ সেই কথাই যেন ডাউনিং স্ট্রিটের করিডোরে করিডোরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। স্টারমারের বিরুদ্ধে এখনো প্রকাশ্য বিদ্রোহ নেই, কোনো নাটকীয় চ্যালেঞ্জও দেখা যায়নি। কিন্তু ব্রিটিশ রাজনীতির ইতিহাস বলে, বিদ্রোহ কখনোই উচ্চস্বরে শুরু হয় না। এটি শুরু হয় ফিসফাসে, তারপর নীরবতায়। আর সেই নীরবতা এখন স্পষ্ট, ভারী, এবং ভয় ধরানো।

এই সংকটকে কেবল স্টারমারের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে বড় ভুল হবে। গত এক দশকে ব্রিটেন একের পর এক প্রধানমন্ত্রীর পতন দেখেছে—ডেভিড ক্যামেরন, থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস। প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে দলীয় বিভাজন, জনআস্থার সংকট কিংবা রাজনৈতিক চাপের নিচে ভেঙে পড়েছেন। প্রশ্নটা তাই ব্যক্তিকে ছাড়িয়ে যায়। সমস্যা কি শুধু নেতাদের? নাকি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে নেতৃত্ব টিকে থাকার মতো পরিবেশই আর নেই?

ব্রিটেনের গণতন্ত্র আজ এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে নেতৃত্ব দ্রুত উঠে আসে, আবার সমান দ্রুত ভেঙেও পড়ে। এটি গণতন্ত্রের শক্তির প্রমাণ নয়; বরং এর অস্থিরতার লক্ষণ। স্থিতিশীলতা যেখানে অনুপস্থিত, সেখানে নেতৃত্বও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। স্টারমার সেই ভঙ্গুর বাস্তবতারই সর্বশেষ প্রতিচ্ছবি।

স্টারমারের চারপাশে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তার মূল কারণ শুধু দলীয় চাপ নয়—এটি জনগণের আস্থার ক্ষয়। ব্রিটেনে এখন এক ধরনের রাজনৈতিক ক্লান্তি জমে উঠেছে। মানুষ দেখছে, নেতা বদলায়, মুখ বদলায়, প্রতিশ্রুতি বদলায়, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের সংকটগুলো বদলায় না। মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন—সমস্যাগুলো একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এই ক্লান্তি কোনো একটি দলের বিরুদ্ধে নয়; এটি পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। আর এই ক্লান্তিই স্টারমারের নেতৃত্বকে সবচেয়ে বেশি দুর্বল করে দিচ্ছে।

গণতন্ত্রে ক্ষমতা আসে ভোটে, কিন্তু টিকে থাকে আস্থায়। ভোট একদিনের ঘটনা; আস্থা প্রতিদিনের। সেই আস্থাই যখন ক্ষয়ে যায়, তখন সংখ্যাগরিষ্ঠতাও কাগুজে হয়ে ওঠে। স্টারমারের সংকট এখানেই—তিনি ক্ষমতার শীর্ষে আছেন, কিন্তু আস্থার জমি যেন তাঁর পায়ের নিচে সরে যাচ্ছে।

বিশ্ব রাজনীতির বড় ছবিতে তাকালে দেখা যায়, নেতৃত্বের এই সংকট কেবল ব্রিটেনের নয়। এটি বৈশ্বিক। দ্রুত তথ্যপ্রবাহ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তাত্ক্ষণিক বিচার, দলীয় রাজনীতির ভাঙন, জনগণের ক্রমবর্ধমান হতাশা—সব মিলিয়ে নেতৃত্ব এখন এক অনিশ্চিত ভারসাম্যের খেলা। এক ভুল বক্তব্য, এক ভুল সিদ্ধান্ত, এক ভুল সময়জ্ঞানেই সবকিছু ভেঙে পড়তে পারে। স্টারমারের অবস্থানও এই বৈশ্বিক বাস্তবতার অংশ। তিনি শুধু ব্রিটেনের সংকটের মুখোমুখি নন; তিনি সেই বিশ্বব্যাপী নেতৃত্ব সংকটেরও প্রতীক, যেখানে নেতারা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি চাপের মুখে, বেশি নজরদারির নিচে, এবং বেশি ঝুঁকির মধ্যে।

যদি স্টারমার সত্যিই পতনের দিকে এগিয়ে যান, তবে ব্রিটেন আরেকটি রাজনৈতিক শূন্যতার মুখে পড়বে। তাঁর বদলে শাবানা মাহমুদের নাম শোনা যাচ্ছে। ব্রেক্সিটের পর থেকে দেশটি এমনিতেই স্থিতিশীলতা খুঁজে পাচ্ছে না। নেতৃত্বের ঘনঘন পরিবর্তন অর্থনীতি, কূটনীতি এবং সামাজিক আস্থার ওপর গভীর ক্ষত তৈরি করছে। জনগণ আজ এমন এক মানসিক অবস্থায় দাঁড়িয়ে, যেখানে তারা আর নিশ্চিত নয়—পরবর্তী নেতা আদৌ কতদিন টিকবেন। এই অনিশ্চয়তা গণতন্ত্রের জন্য একটি বিপজ্জনক সংকেত।

ব্রিটেনের এই মুহূর্ত আমাদের একটি মৌলিক সত্য মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন আর ক্ষমতার হস্তান্তরে সীমাবদ্ধ নয়। এটি টিকে থাকে আস্থা, জবাবদিহি এবং নৈতিক নেতৃত্বে। যেখানে নেতৃত্ব দুর্বল, সেখানে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। স্টারমারের ভবিষ্যৎ যাই হোক, ব্রিটিশ রাজনীতির এই অস্থিরতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে—ক্ষমতার চূড়ায় দাঁড়ানো মানুষটি যত শক্তিশালীই মনে হোক, বাস্তবে তিনি-ই সবচেয়ে বেশি একা।

একা হয়ে পড়া নেতার পতন তাই শুধু তাঁর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি পুরো ব্যবস্থার ব্যর্থতা। আর সেই ব্যর্থতার মূল্য দেয় জনগণ। ব্রিটেন আজ ঠিক সেই কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক

লন্ডন, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬