তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
যুক্তরাজ্যের বাজেটে ৩৫ বিলিয়ন পাউন্ডের ব্যয়চাপ, সতর্ক করল আইএফএস
লন্ডন, ১৩ অক্টোবর: যুক্তরাজ্যের আসন্ন বাজেটে সরকারি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন পাউন্ডের অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। এ অর্থের সংস্থান করতে কর বাড়ানো অথবা সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে বলে সতর্ক করেছে অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ফিসকাল স্টাডিজ (আইএফএস)।
সংস্থাটির মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা এবং প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধির পরিকল্পনা সরকারের আর্থিক হিসাবকে আরও জটিল করে তুলেছে। আগামী ২৮ অক্টোবর বাজেট ঘোষণার আগে অর্থমন্ত্রী জন হিলিকে তাই সরকারি ব্যয় ও রাজস্বের মধ্যে সামঞ্জস্য আনার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দিতে হবে।
আইএফএসের ২০২৬ সালের ‘গ্রিন বাজেট’ বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি দপ্তরগুলোর নির্ধারিত বাজেটের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যেতে পারে। ফলে বর্তমান ব্যয়ের পরিকল্পনা অপরিবর্তিত রাখলে স্বাস্থ্যসেবা, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন সরকারি পরিষেবায় বাস্তব ব্যয় কমাতে হতে পারে। এতে পরিষেবার মান কিংবা পরিসর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে, সরকারি পরিষেবার ব্যয় যথাযথভাবে বজায় রাখা এবং প্রতিরক্ষা খাতে বাড়তি অর্থ বরাদ্দ দিতে হলে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হবে। আইএফএসের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০–৩১ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রায় ১১ বিলিয়ন পাউন্ড অতিরিক্ত অর্থ লাগতে পারে। বিদ্যমান সরকারি পরিষেবার ব্যয়ও সুরক্ষিত রাখতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন মিলিয়ে কর বৃদ্ধি অথবা সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা কমানোর মাধ্যমে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন পাউন্ডের সংস্থান করতে হতে পারে।
আইএফএসের পরিচালক হেলেন মিলার সতর্ক করে বলেছেন, সরকার যদি এমন ব্যয়সীমা নির্ধারণ করে, যা বাস্তবে মেনে চলার ইচ্ছা বা সক্ষমতা নেই, তাহলে বাজেটের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হবে। তাঁর মতে, কঠিন সিদ্ধান্ত আগামী বছরের ব্যয় পর্যালোচনা পর্যন্ত পিছিয়ে না রেখে বাজেটেই সরকারের সামগ্রিক ব্যয় পরিকল্পনা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
তবে ৩৫ বিলিয়ন পাউন্ডকে ইতিমধ্যে তৈরি হওয়া সরকারি ঘাটতি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এটি মূলত ভবিষ্যৎ ব্যয়ের চাপ মোকাবিলা, সরকারি পরিষেবা বজায় রাখা এবং প্রতিরক্ষা খাতে বাড়তি অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন মেটানোর সম্ভাব্য হিসাব। সরকার কর বাড়াবে, ভাতা কমাবে, প্রতিরক্ষা ব্যয়ের পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করবে, নাকি সরকারি পরিষেবায় ব্যয় সংকোচন করবে—তা এখনো চূড়ান্ত নয়।
আইএফএস আরও বলেছে, সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে ঋণ নিয়ে সব অতিরিক্ত ব্যয় মেটানো ঝুঁকিপূর্ণ হবে। ২০১৯ সালের পর থেকে জাতীয় আয়ের অনুপাতে ঋণের সুদ পরিশোধের বোঝা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। তাই নতুন ব্যয়ের সংস্থান করতে হলে কর বৃদ্ধি কিংবা অন্য খাতে ব্যয় কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।
এদিকে, মূল্যস্ফীতি বাড়লে সরকারের কর-আয়ও বাড়তে পারে। ফলে সরকারের আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য যে অতিরিক্ত সুরক্ষা বা ‘ফিসকাল হেডরুম’ রয়েছে, তা নিয়ে আশঙ্কা থাকলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। তবে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, মজুরি বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসের ওপর নির্ভর করে প্রকৃত হিসাব বদলে যেতে পারে।
যুক্তরাজ্যের সাধারণ মানুষের জন্য বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই আর্থিক চাপের বোঝা শেষ পর্যন্ত কার ওপর পড়বে। কর বাড়ানো হলে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়তে পারে। আবার সরকারি পরিষেবা ও ভাতায় কাটছাঁট করা হলে নিম্ন আয়ের পরিবার এবং সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারেন।
আগামী ২৮ অক্টোবরের বাজেটে অর্থমন্ত্রীকে তাই শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলালেই চলবে না; একই সঙ্গে সরকারি পরিষেবা, প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বাস্তবসম্মত পরিকল্পনাও তুলে ধরতে হবে।