কলিকালের কলধ্বনি-৪৫ ।। নাগরিকত্ব সংকটের মুখে বাংলাদেশি মুসলিম সম্প্রদায়: একসাথে দাঁড়ানোর সময়

ব্রিটেনে বসবাস করা বাংলাদেশি মুসলিম কমিউনিটির জন্য আজ এক বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। আমাদের কমিউনিটি নেতারা প্রায়ই নিজেদের এলাকায় বিভিন্ন সংগঠন চালানোর ব্যস্ততায় থাকেন। পদ-পদবীর দৌরাত্ম্যও অনেকের মনোযোগ কেড়ে নেয়।
কিন্তু এদিকে ব্রিটেনে বসবাস করাটাই ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠছে—এটিতে অনেকেরই খেয়াল নেই। অধিকাংশই ইংরেজি পত্র-পত্রিকা পড়েন না, বা পড়তে চান না, বা হয়তো পারতেও পারেন না। শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিককালে কী ধরনের আইন বা নিয়ম পরিবর্তন হচ্ছে, তাও অনেকেই উদাসীন।
আমাদের জন্য তাই একান্ত প্রয়োজন সচেতনতা। আগের চেয়ে আরও বেশি খবরাখবর রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। অন্তত ‘ভয়েস অব পিপল’ বা অনুরূপ অনলাইন পত্রিকার দিকে নজর রাখা জরুরি।
কারণ ব্রিটেনে প্রতিদিনই নতুন আইন ও নিয়ম পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই সবাইকে উদাত্ত আহ্বান জানাই—সচেতন হই, নিয়মিত পত্র-পত্রিকা পড়ি এবং একে অপরকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করি।
ব্রিটেন—যাকে আমরা সবসময় আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকার রক্ষার উদাহরণ হিসেবে দেখেছি—আজ সেখানে প্রায় নব্বই লাখ মুসলিম নাগরিকের নাগরিকত্ব ঝুঁকির মুখে। এদের মধ্যে বড় অংশই বাংলাদেশের বংশোদ্ভূত। জন্মসূত্রে বা দীর্ঘদিন ধরে ব্রিটেনে বসবাস করা মানুষরা এখন এক ধরনের “দুই-স্তরের নাগরিকত্ব” ব্যবস্থার শিকার। রঙিন জনগোষ্ঠীর মধ্যে নাগরিকত্ব হারানোর সম্ভাবনা সাদা নাগরিকের তুলনায় প্রায় ১২ গুণ বেশি।
আইনের সাম্প্রতিক পরিবর্তন এবং গোপন প্রক্রিয়ার কারণে মানুষ জানতেও পারছে না কখন নাগরিকত্ব বাতিল হতে পারে। ২০১৪ সালের আইন naturalised নাগরিকদেরও নাগরিকত্ব বাতিলের আওতায় আনে। ২০২২ সালের Nationality and Borders Act নাগরিককে জানানো ছাড়াই নাগরিকত্ব বাতিল করার সুযোগ দেয়। ২০২৫ সালের আইন অনুযায়ী, হোম সেক্রেটারির আপিল প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত নাগরিকত্ব ফেরত নেওয়া যায়। এই সব পরিবর্তন সাধারণ নাগরিকদের জন্য অনিশ্চয়তার এক নিরাপত্তাহীন পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
মুসলিম সম্প্রদায় এবং দক্ষিণ এশিয়ার বংশোদ্ভূত নাগরিকদের জন্য এর প্রভাব মানবিক ও সামাজিকভাবে মারাত্মক। নাগরিকত্ব হারালে পরিবারের নিরাপত্তা, শিক্ষার অধিকার, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা—সবকিছু ঝুঁকির মুখে পড়ে। শামীমা বেগমের কাহিনী তাই নিছক উদাহরণ নয়; শিশু অবস্থায় সিরিয়ায় পাচার, পরে নাগরিকত্ব হারানো—এ ধরনের ঘটনা আজ সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে।
হোম অফিসের প্রক্রিয়ার গোপনীয়তা আরও ভয়ঙ্কর। প্রায় কোনো নাগরিক জানে না তার নাগরিকত্ব বাতিলের সম্ভাবনা আছে কি না। বিদেশে জন্মানো সন্তানদের নাগরিকত্ব হারালে statelessness বা রাষ্ট্রবিহীনতার ঝুঁকি থাকে। শামীমা বেগমের আইনি লড়াই দেখিয়েছে, নাগরিকত্বের নিরাপত্তা শুধু কাগজে নেই, বাস্তবে এটি প্রায় অপ্রাপ্য।
সরকার দাবি করছে, এই প্রক্রিয়া কেবল “সর্বাধিক বিপজ্জনক মানুষ” রক্ষার জন্য। কিন্তু বাস্তবতা অন্য—প্রায় ৯০ লাখ মুসলিম নাগরিক, যার মধ্যে বড় অংশ বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত, এখন প্রতিনিয়ত নাগরিকত্ব হারানোর ভয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এটি স্পষ্টভাবে জাতিগত বৈষম্য এবং অসাম্য। আন্তর্জাতিক তুলনায় ব্রিটেনে নাগরিকত্ব বাতিলের সংখ্যা অত্যধিক: ২০১০ সাল থেকে ২০০+ নাগরিক, অধিকাংশ মুসলিম ও দক্ষিণ এশিয়ার। ফ্রান্সের উদাহরণ তুলনায় ২০০২–২০২০ সময়ে মাত্র ১৬টি ঘটনা।
মানবাধিকার সংস্থা ও সমালোচকরা এটিকে “দুই-স্তরের নাগরিকত্ব” বলছেন। Runnymede Trust এবং Reprieve দাবি করছে, জাতিগত ভিত্তিতে নাগরিকত্ব বাতিল করা বন্ধ করতে হবে। British Nationality Act 1981, Section 40(2) বাতিল করতে হবে। ইতোমধ্যেই যাদের নাগরিকত্ব বাতিল হয়েছে, তাদের ফেরত দিতে হবে। শাবনা বেগম বলেন, “নাগরিকত্ব একটি অধিকার, বিশেষাধিকার নয়। সরকার ‘দুইস্তরীয় নীতি’ গ্রহণ করছে।”
এ অবস্থায় আমাদের প্রতিবাদ এবং সচেতনতার কাজ অবিলম্বে শুরু করতে হবে। আমরা যদি চুপ থাকি, আমাদের নাগরিক অধিকার আরও বিপন্ন হবে।
আমরা কী করতে পারি:
-
সচেতনতা বৃদ্ধি: কমিউনিটি কেন্দ্র, মসজিদ ও সামাজিক মিডিয়ায় নাগরিকত্ব ও আইনি অধিকার নিয়ে তথ্য ছড়ানো।
-
আইনি সহায়তা: আইনজীবী ও মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ।
-
প্রতিবাদ ও লবি কার্যক্রম: স্থানীয় এমপিদের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ এবং সরকারকে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান।
-
নিয়মিত আপডেট: হোম অফিস এবং সরকারি বিজ্ঞপ্তি পর্যবেক্ষণ।
প্রিয় বাংলাদেশি মুসলিম সম্প্রদায়, মনে রাখুন: আমাদের ইতিহাসে প্রতিটি কঠিন সময়ে আমরা একত্রিত হয়েছি। আজও সেই ঐক্যই আমাদের শক্তি। আমরা শুধু নিজের জন্য নয়, আমাদের সন্তানদের জন্য দাঁড়াচ্ছি। আমাদের নাগরিকত্ব কেবল কাগজ নয়, এটি আমাদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং মর্যাদা।
এবার সময় এসেছে প্রতিবাদ, সচেতনতা ও সংহতির মাধ্যমে আমাদের অধিকার রক্ষার। চুপ থাকার সময় শেষ। একসাথে দাঁড়াই, একসাথে আওয়াজ তুলি, এবং আমাদের নাগরিকত্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করি।
নাগরিকত্ব রক্ষা করুন, মর্যাদা রক্ষা করুন, একসাথে দাঁড়ান।