লালমনিরহাট রেল বিভাগে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে চলছে ট্রেন
লালমনিরহাটে ২২ ইঞ্জিনের ১৬টিই মেয়াদোত্তীর্ণ, যাত্রীরা প্রতিদিন ঝুঁকির পথে
বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১৩ ডিসেম্বর: লালমনিরহাট রেল বিভাগ যেন এক নীরব বিপর্যয়ের প্রহর গুনছে। দেশের উত্তরাঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই রেলপথে প্রতিদিন ২০ জোড়া ট্রেন ছুটে চলে ঢাকাসহ বিভিন্ন গন্তব্যে। কিন্তু সেই যাত্রার প্রতিটি কিলোমিটারে লুকিয়ে আছে অদৃশ্য আতঙ্ক—কারণ যে ২২টি লোকোমোটিভ দিয়ে পুরো অঞ্চলের ট্রেন পরিচালিত হচ্ছে, তার ১৬টিই বহু আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ। চারটি ইঞ্জিনের মেয়াদ শেষ হয়েছে ৫০ বছর আগে, আটটির ৩৫ বছর, দুইটির ৩০ বছর এবং বাকি দুটির ২০ বছর আগে।

প্রয়োজন অন্তত ৩০টি লোকোমোটিভ। অথচ আছে মাত্র ২২টি—তার বেশির ভাগই অচল হওয়ার অপেক্ষায়। মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনের উপর ভরসা করেই চলছে ১০ জোড়া আন্তনগর, ৮ জোড়া মেইল ও ২ জোড়া লোকাল ট্রেন। প্রতিটি চালনার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন শঙ্কা। রেলওয়ের একাধিক লোকোমাস্টার জানালেন, ট্রেন চালাতে গেলে তাঁদের বুক ধড়ফড় করে। মাঝপথে হঠাৎ ইঞ্জিন শক্তি হারালে যেকোনো মুহূর্তে ট্রেন থেমে যেতে পারে, সৃষ্টি হতে পারে বড় দুর্ঘটনা। নির্ধারিত সময়সূচি ঠিক রাখা যায় না, গন্তব্যে পৌঁছানো নিয়েও প্রতিদিন থেকে যায় অনিশ্চয়তা।
একজন লোকোমাস্টার ক্ষোভ নিয়ে বলেন, “নতুন ইঞ্জিনের জন্য আমরা বহুবার চাহিদাপত্র পাঠিয়েছি। কিন্তু কোনোদিনই সাড়া পাইনি। জীবন হাতে নিয়ে ট্রেন চালাই।”
স্টেশন কর্মচারী সাইফুল ইসলামও একই বেদনার গল্প তুলে ধরলেন। তাঁর ভাষায়, “লালমনিরহাট রেল বিভাগ বরাবরই উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার। উত্তরাঞ্চলের অর্ধেক ট্রেন এখান থেকেই চলে, অথচ নতুন ইঞ্জিনের ছিটেফোঁটাও দেখি না। সংকটে পড়ে অনেক মেইল ও লোকাল ট্রেন বন্ধ করে দিতে হয়েছে।”
বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির সভাপতি মনিরুজ্জামান বললেন, “দেশে নতুন লোকোমোটিভ কেনা হলেও লালমনিরহাটের ভাগ্যে কোনোদিন নতুন ইঞ্জিন জোটেনি। এ বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।”
লোকোমোটিভ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা বিভাগীয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ধীমান ভৌমিকও স্বীকার করলেন সংকটের কঠিন বাস্তবতা। “আমরা নিয়মিত চাহিদাপত্র পাঠাচ্ছি। মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেন চালাতে আমাদেরও দুশ্চিন্তা হয়,”—বললেন তিনি।
বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) আহমেদ মাহবুব চৌধুরী জানান, সারা দেশেই লোকোমোটিভ সংকট চলছে। আধুনিক ৩০টি নতুন ইঞ্জিন কেনার পরিকল্পনা আছে, কিন্তু কবে তা বাস্তবায়ন হবে—তার নির্দিষ্ট সময় নেই।
এ যেন এক দীর্ঘশ্বাসের গল্প—যে অঞ্চলের হাজারো মানুষ ট্রেনে চড়ে জীবিকা, শিক্ষা বা চিকিৎসার জন্য প্রতিদিন বেরিয়ে পড়েন, তাঁদের জীবন আজ ঝুলে আছে লোহায় মোড়ানো পুরোনো ইঞ্জিনের সহনশীলতার ওপর। তবু ট্রেন ছাড়ে, মানুষ উঠে বসেন, আর রেলওয়ের কর্মীরা দোয়া করেন—আজ যেন কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।
উত্তরাঞ্চলের মানুষের প্রশ্ন—মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনের ওপর আর কত দিন ভরসা করে চলবে তাঁদের জীবন? নতুন লোকোমোটিভের এই অপেক্ষা কখন শেষ হবে?