ব্রিটেনে বাংলাদেশিসহ ৯০ লাখ বৃটিশ মুসলিম নাগরিকত্ব ঝুঁকিতে !

ব্রিটেনে বাংলাদেশিসহ ৯০ লাখ বৃটিশ মুসলিম নাগরিকত্ব ঝুঁকিতে !

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ১৩ ডিসেম্বর: যুক্তরাজ্য, যা দীর্ঘদিন ধরে আইনের শাসন ও নাগরিক অধিকার রক্ষার উদাহরণ হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানে এখন প্রায় ৯০ লাখ  বৃটিশ মুসলিম নাগরিকের নাগরিকত্ব ঝুঁকির মুখে। বিশেষ করে মুসলিম ঐতিহ্যসম্পন্ন সম্প্রদায় এবং দক্ষিণ এশিয়ার বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিকরা “দুই-স্তরের নাগরিকত্ব” ব্যবস্থার শিকার হচ্ছেন। বর্তমান আইন অনুযায়ী, ব্রিটিশ সরকার যদি মনে করে কোনো নাগরিক অন্য দেশের নাগরিকত্ব নিতে পারে, তাহলে হোম সেক্রেটারি তার নাগরিকত্ব বাতিল করতে পারেন।

এই পরিস্থিতি শুধুই আইনি সমস্যা নয়; এটি মানবিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলছে। এই রিপোর্টে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, কীভাবে আইনের পরিবর্তন, গোপন প্রক্রিয়া এবং জাতিগত বৈষম্য মিলিতভাবে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন অস্থির করছে। এছাড়া, বাংলাদেশি সম্প্রদায় কীভাবে আইনি ও সামাজিকভাবে নিজেদের রক্ষা করতে পারে তাও তুলে ধরা হয়েছে।

আইনি কাঠামো ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট :


বর্তমান আইন অনুযায়ী, ব্রিটিশ সরকার যদি মনে করে কোনো নাগরিক অন্য দেশের নাগরিকত্ব নিতে পারে, তাহলে হোম সেক্রেটারি তার নাগরিকত্ব বাতিল করতে পারেন।

আইনের সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলো নাগরিকদের জন্য আরও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে:

২০১৪ সালের আইন – Naturalised নাগরিকদেরও নাগরিকত্ব বাতিলের প্রযোজ্য।

২০২২ সালের Nationality and Borders Act – নাগরিককে জানানো ছাড়াই নাগরিকত্ব বাতিল করার ক্ষমতা।

২০২৫-এর আইন – হোম সেক্রেটারির আপিল প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত নাগরিকত্ব ফেরত নেওয়া যাবে না।

 “দুই-স্তরের নাগরিকত্ব” আইনের ফলে যা হতে পারে: 

- জাতিগত বৈষম্য ও মুসলিম সম্প্রদায়ের ঝুঁকি মিক্স জনগোষ্ঠীর মধ্যে পাঁচজনের তিনজন নাগরিকত্ব হারানোর

ঝুঁকিতে থাকবেন, যা সাদা নাগরিকদের তুলনায় প্রায় ১২ গুণ বেশি।

- দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সম্প্রদায়:

- ভারতীয় ~৯৮৪,০০০

- পাকিস্তানি ~৬৭৯,০০০

- বাংলাদেশি বিপুলসংখ্যক নাগরিক বৃটেন থেকে বহিস্কারের ঝুঁকিতে 

এই আইনের ফলে মানবিক ও সামাজিক কি ধরনের প্রভাব  পড়ছে:


- শামীমা বেগম, যিনি শিশু অবস্থায় সিরিয়ায় আইএস দ্বারা পাচার হন, পরে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব হারান। তার দীর্ঘ আইনি লড়াই এখনও চলছে।

- নাগরিকত্বের ঝুঁকি এখন শুধুই যুদ্ধকালীন বা সন্ত্রাসবিরোধী কারণে সীমাবদ্ধ নয়; সাধারণ নাগরিকরাও এতে প্রভাবিত হচ্ছেন।

- পরিবার, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব পড়ছে।

- ফলস্বরূপ, সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সংকটাপন্ন।

- গোপনীয়তা ও আপিল প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা
- প্রায় কোনো নাগরিক জানেন না তার নাগরিকত্ব বাতিল হতে পারে কি না।

- বিদেশে জন্মানো সন্তানদের নাগরিকত্ব হারালে statelessness বা রাষ্ট্রবিহীনতার ঝুঁকি থাকে।

- শামীমা বেগমের উদাহরণ থেকে দেখা যাচ্ছে, ব্যক্তি আইনি প্রক্রিয়ায় থাকলেও হোম অফিস সরাসরি তথ্য দেয় না।

বৃটিশ সরকারের প্রতিক্রিয়া : 


- হোম অফিস বলছে, এই ব্যবস্থা কেবল “সর্বাধিক বিপজ্জনক মানুষ” রক্ষার জন্য।

- কনজারভেটিভ এমপি সার অ্যান্ড্রু মিচেল বলেছেন, নাগরিক “আজ আছে, কাল নেই” ধরনের পরিস্থিতিতে থাকতে পারে এবং হোম অফিস তাকে কিছু জানায় না।

অন্যান্য দেশের সাথে তুলনা : 


- যুক্তরাজ্য: ২০১০ সাল থেকে ২০০+ নাগরিকত্ব বাতিল, অধিকাংশ মুসলিম ও দক্ষিণ এশিয়ার।

- ফ্রান্স: ২০০২–২০২০ সময়ে মাত্র ১৬ বার।

- বিশ্বের ৫৬টি দেশ: নাগরিকত্ব বাতিলের প্রথা নেই।

এই আইনের বিরোধিতা করে সমালোচক ও মানবাধিকার সংস্থার যেসব দাবি : 

- Runnymede Trust ও Reprieve: জাতিগত ভিত্তিতে নাগরিকত্ব বাতিল করা বন্ধ করতে হবে।

- British Nationality Act 1981, Section 40(2) বাতিল করা উচিত।

- ইতোমধ্যেই যাদের নাগরিকত্ব বাতিল হয়েছে, তাদের ফেরত দিতে হবে।

শাবনা বেগম (Runnymede Trust CEO) এর মন্তব্য হচ্ছে:
“নাগরিকত্ব একটি অধিকার, বিশেষাধিকার নয়। সরকার ‘দুইস্তরীয় নীতি’ গ্রহণ করছে।”

মায়া ফোয়া (Reprieve Chief) এর মন্তব্য হচ্ছে :
“দ্বিতীয়-শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা মৌলিক নীতির পরিপন্থী।”

বৃটিশ বাংলাদেশি মুসলিম সম্প্রদায়ের  এখন করণীয় কি কি ?


- সচেতনতা বৃদ্ধি: কমিউনিটি কেন্দ্র, মসজিদ ও সামাজিক মিডিয়ায় তথ্য ভাগ করা। নিজ এলাকার ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ব্যস্ত না থেকে এ ধরনের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবাদ জানানো দরকার।

- আইনি সহায়তা: আইনজীবী ও মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ।

- ক্যাম্পেইন ও লবি কার্যক্রম: স্থানীয় এমপিদের মাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ।

- নিয়মিত আপডেট: হোম অফিস ও সরকারি বিজ্ঞপ্তি পর্যবেক্ষণ।


রিপোর্ট এর মূল বিষয়বন্তু এক নজরে :

- প্রায় ৯ মিলিয়ন মানুষ নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে।

- মুসলিম ও মিশ্র পটভূমি সম্পন্ন জনগোষ্ঠী সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

- আইনগত পরিবর্তন নাগরিকত্ব প্রক্রিয়াকে কঠোর ও অনিশ্চিত করেছে।

- সমালোচকরা এটিকে গোপনীয়, বৈষম্যমূলক ও অস্বচ্ছ ব্যবস্থা বলছেন।

- বাংলাদেশী কমিউনিটির নেতৃবৃন্দের এ বিষয়ে সঠিক স্থানে প্রতিবাদমুখর হওয়ার আশু প্রয়োজন। 

=======================

References:

1. Middle East Eye — “UK: Millions of British Muslims could lose citizenship…” 2. The Independent — ‘Secretive’ system critics call it “racist two‑tier” 3. 5 Pillars — মুসলিম সম্প্রদায়ের ঝুঁকি ও বিশ্লেষণ 4. Arab News — রিপোর্টের সমালোচনামূলক ভাবনা ও হোম অফিসের প্রতিক্রিয়া