নির্বাচনের আগে রক্তাক্ত দেশ

১১ মাসে ঢাকায় ৪ শতাধিক হত্যা, সারাদেশে ২৩০ জন গুলিবিদ্ধ; আহত প্রায় ৭ হাজার !

১১ মাসে ঢাকায় ৪ শতাধিক হত্যা, সারাদেশে ২৩০ জন গুলিবিদ্ধ; আহত প্রায় ৭ হাজার !

ঢাকা প্রতিনিধি, ১৩ ডিসেম্বর :  চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত গত ১১ মাসে দেশে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন ২৩০ জনের বেশি মানুষ। এসব সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন ৮০ জনেরও বেশি। রাজনৈতিক নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, তরুণ ও সাধারণ নাগরিক—গুলির শিকারদের তালিকা দিন দিন দীর্ঘ হচ্ছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)–এর অপরাধ ও মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।

এইচআরএসএসের তথ্য বলছে, একই সময়ে রাজনৈতিক বিরোধ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ৮৫২টি সহিংস ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১২৯ জন, আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৬ হাজার ৯৬৬ জন। সহিংসতার মাত্রা ও প্রকাশ্য চরিত্র দেশজুড়ে উদ্বেগের মাত্রা বাড়িয়ে তুলছে।

এরই মধ্যে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক প্রকাশ্য গুলির ঘটনা মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। গতকাল শুক্রবার দিন-দুপুরে রাজধানীর বিজয়নগরে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে গুরুতর আহত করে দুর্বৃত্তরা। বর্তমানে তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। একই দিন সন্ধ্যায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে রাব্বি নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হন

এর আগের দিন পুরান ঢাকার শ্যামবাজারে মসলা ব্যবসায়ী আব্দুর রহমানকে গুলি করে হত্যা করা হয়। কয়েক দিন আগে খুলনার আদালতপাড়ায় প্রকাশ্যে দুজনকে গুলি করে হত্যা, এর আগে মিরপুরে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়ার প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড এবং চট্টগ্রামের ব্যস্ততম সড়কে আব্দুল হাকিম নামের এক ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা—চলতি মাসেই এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে।

পুলিশ ও আইন-শৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। খুন, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সশস্ত্র সন্ত্রাস পরিস্থিতিকে আরও ভয়ংকর করে তুলছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসেই সারা দেশে হত্যা মামলা হয়েছে ২৭৯টি। একই সময়ে ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় ১৮৪টি, নারী ও শিশু নির্যাতনে ১ হাজার ৭৪৪টি, অপহরণে ৯৩টি এবং চুরি-ছিনতাইয়ে ১ হাজার ১১০টি মামলা নথিভুক্ত হয়। সব মিলিয়ে ওই এক মাসে ১৪ হাজার ৪৬৫টি মামলা হয়েছে।

মহানগরভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এলাকায় সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩৮৩টি মামলা, এরপর চট্টগ্রামে ৪১২টিগাজীপুরে ২৭০টি মামলা হয়েছে। রেঞ্জভিত্তিক হিসাবে ঢাকা রেঞ্জে ২ হাজার ৭৪০টি মামলা নিয়ে শীর্ষে, এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ (২ হাজার ৪১১)রাজশাহী রেঞ্জ (১ হাজার ৩৯৪)। অন্য রেঞ্জগুলোর মধ্যে খুলনা, রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও বরিশালেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।

পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক প্রতিশোধ, সমাবেশকেন্দ্রিক সংঘর্ষ, কমিটি গঠন নিয়ে দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি—এসবই সহিংসতার প্রধান কারণ।

এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, দেশে শুধু রাজনৈতিক সহিংসতাই নয়, বরং মব সহিংসতা, গণপিটুনি, নারী নিপীড়ন ও ধর্ষণ, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু, সংখ্যালঘু নির্যাতন এবং সভা-সমাবেশে বাধা—সব মিলিয়ে মানবাধিকার পরিস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে অবনতি ঘটছে।

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী স্বীকার করেছেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চললেও রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা, অসহিষ্ণুতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মতে, সীমান্ত দিয়ে অবাধে আগ্নেয়াস্ত্র প্রবেশ দেশের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১১ মাসে শুধু রাজধানীতেই চার শতাধিক হত্যার অভিযোগ উঠেছে। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও।

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রকাশ্যে গুলি ও হত্যা এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি জনজীবনে ভয়, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার স্থায়ী ছায়া ফেলছে