ফুটবলের জীবন্ত কিংবদন্তী লিওনেল মেসিকে নিয়ে লেখা গল্প
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৭ ।। ফুটবলের রাজা মেসি
।। ফুটবলের রাজা মেসি ।।
।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর।।

উৎসর্গ
পৃথিবীর সকল মেসি-ভক্তের প্রতি,
যাঁরা একটি ফুটবলারের মধ্যে শুধু একজন খেলোয়াড় নয়, বরং স্বপ্ন, অধ্যবসায় ও মানবিকতার প্রতিচ্ছবি খুঁজে পান
কানসাস সিটির স্টেডিয়ামের চারপাশে রাত নামছে ধীরে ধীরে। আলো ঝলমল করছে চারদিকে। ভিড়ের মধ্যে এক অদ্ভুত নীরবতা। যেন সবাই বুঝে গেছে—আজকের রাতটা সাধারণ কোনো রাত না।
উপরের গ্যালারিতে বসে আছেন আন্তোনেলা রোকুজ্জো। রোজারিও শহরের সেই ছোট্ট মেয়েটি, যাকে নিয়ে একসময় লিওনেল মেসির জীবন শুরু হয়েছিল এক নীরব, গোপন অনুভূতির মতো। শৈশবের সেই বন্ধু, যে পরে হয়ে উঠেছে জীবনের সবচেয়ে স্থির আশ্রয়।
আন্তোনেলা শুধু একজন স্ত্রী নন, তিনি সেই মানুষ, যিনি মেসির ভেতরের ক্লান্ত ছেলেটাকে ধরে রেখেছেন নীরবে। যিনি বড় বড় ট্রফির চেয়ে বেশি চেনেন মেসির চোখের ভেতরের নরম ক্লান্তি।
পাশে তাদের তিন সন্তান—থিয়াগো, মাতেও আর সিরো। তারা হাততালি দিচ্ছে, আবার হঠাৎ চুপ করে যাচ্ছে। মাঠের দিকে তাকিয়ে আছে সবাই। যেন চোখের সামনে কোনো গল্প লেখা হচ্ছে, আর সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দু একজন মানুষ—লিওনেল মেসি।
ম্যাচ শুরু হতেই আর্জেন্টিনার দলে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস দেখা যায়। আর্জেন্টিনা জাতীয় ফুটবল দল বল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। মাঝমাঠে দাঁড়িয়ে আছেন মেসি। খুব শান্ত। খুব স্বাভাবিক। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতার ভেতরেই লুকিয়ে আছে ঝড়।
স্টেডিয়ামের এক কোণে বসে থাকা এক কিশোর ফিসফিস করে বলে—
— “আজ কিছু একটা হবে…”
তার পাশে বসা বাবা শুধু মাথা নাড়েন। কিছু বলেন না। কারণ ফুটবলে মেসি যখন থাকে, তখন কথা কমে যায়। অনুভবই বড় হয়ে ওঠে।
প্রথম গোল আসে হঠাৎ করে। যেন সময় নিজেই থেমে গিয়ে বলটা মেসির পায়ের কাছে রেখে দেয়। গোল হয়ে যায়।
গ্যালারিতে চিৎকার ওঠে—
— “মেসি!”
আন্তোনেলার চোখ তখন এক মুহূর্তের জন্য অতীতে ফিরে যায়। সেই ছোট্ট রোজারিও শহর। যেখানে এক কিশোর মেসি লজ্জা নিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিল—
— “আমি একদিন ফুটবলার হব… তুমি কি পাশে থাকবে?”
সেই এক লাইনেই শুরু হয়েছিল এক নীরব প্রেম, যা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হতে থাকে।
আন্তোনেলা হাত দু’টি বুকের কাছে জড়িয়ে ধরেন। চোখে জল জমে আসে, কিন্তু মুখে হাসি। খুব নরম, খুব নীরব এক হাসি।
হঠাৎ তিনি নিচের মাঠের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে গুনগুন করে উঠেন। পাশে বসা সন্তানরা অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকায়। মেসির স্ত্রী গুন গুন করে গান গেয়ে চলেছেন:

লিওনেল মেসি, লিওনেল মেসি,
তোমাকে ভালোবাসে বিশ্ববাসী।
বাংলার জনগণ ভালোবাসে বেশী,
ভাবে তারা তাকে নিজ দেশবাসী।।
লিওনেল মেসি, লিওনেল মেসি,
আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি।
জয়ের মুকুট মাথায় নিয়ে,
হেঁটে যাও তুমি আকাশ ছুঁয়ে।।
লিওনেল মেসি, লিওনেল মেসি,
একইভাবে আমি তোমায় ভালবাসি ।
সুখের দিনে, দুঃখের রাতে,
তাইতো আমি তোমারই পাশে ছুটে আসি।।
লিওনেল মেসি, লিওনেল মেসি,
তোমাকে ভালোবাসে বিশ্ববাসী।।
গানটি কেউ শোনে না। স্টেডিয়ামের গর্জনের মধ্যে হারিয়ে যায়। কিন্তু মায়ের কণ্ঠ শুনে ছোট্ট সিরো মুচকি হাসে। থিয়াগো হাততালি দেয়। মাতেও বলে—
— “মা, এটা কি বাবার গান?”
আন্তোনেলা হেসে মাথা নাড়েন।
— “হ্যাঁ, বাবার জন্যই।”
দ্বিতীয় গোলটা আসে আরও নিখুঁতভাবে। এবার কেউ আর অবাক হয় না। শুধু মনে হয়—এটাই তো হওয়ার কথা ছিল।
ছোট ছেলে মাতেও বাবার দিকে তাকিয়ে বলে—
— “ড্যাডি আবার!”
কিন্তু কেউ উত্তর দেয় না। কারণ সবাই জানে, এখানে শব্দ অপ্রয়োজনীয়।
তৃতীয় গোলটা আসতেই স্টেডিয়াম যেন কেঁপে ওঠে। পৃথিবীর ভারসাম্য একটু বদলে গেছে এমন মনে হয়।
মেসি দৌড়ান না। শুধু দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকান। তার চোখে ক্লান্তি নেই, অহংকার নেই। আছে শুধু এক ধরনের শান্ত বিস্ময়।
আন্তোনেলা আবার ফোনে লেখেন—
“চলো আর্জেন্টিনা! সবসময় তোমার সঙ্গে আছি, লিওনেল মেসি! তুমি অবিশ্বাস্য!”
এই ছোট বাক্যটা স্টেডিয়ামের চেয়েও বড় হয়ে যায়।
ম্যাচ শেষ হয় তিন শূন্য ব্যবধানে। কিন্তু গল্প শেষ হয় না।

ড্রেসিংরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা এক সাংবাদিক আরেকজনকে বলেন—
— “মানুষ কি জানে, ও আসলে মানুষ না কিছু?”
অন্যজন হেসে দেন।
— “না। ও শুধু ফুটবল।”
কিন্তু সত্যিটা কেউ সহজে বলতে পারে না। কারণ সত্যিটা খুব সহজ—মেসি খেলেন, তাই পৃথিবী একটু সুন্দর লাগে।
হয়তো এই কারণেই পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ তাকে শুধু একজন খেলোয়াড় হিসেবে দেখে না। কেউ তাকে জাদুকর বলে, কেউ কিংবদন্তি বলে, কেউ বলে স্বপ্নের কারিগর। কিন্তু সেই রাতে কানসাস সিটির আকাশের নিচে আরেকটি নামই সবচেয়ে বেশি মানিয়ে যায়—ফুটবলের রাজা মেসি।
রাজা হওয়ার জন্য সবসময় মুকুট লাগে না। কখনো কখনো মানুষের ভালোবাসাই মুকুট হয়ে ওঠে। মেসির মাথায় সেই মুকুট বহু বছর ধরেই আছে।
তিনি শুধু গোল করেন না, কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেন। তিনি শুধু ম্যাচ জেতেন না, মানুষের কল্পনাকেও জিতিয়ে দেন। তার খেলা দেখে শিশুরা স্বপ্ন দেখে, বৃদ্ধরা যৌবনের উচ্ছ্বাস ফিরে পায়। তাই গ্যালারিতে বসে থাকা মানুষগুলো তাকে দেখে শুধু একজন ফুটবলারকে দেখে না, দেখে এক জীবন্ত কিংবদন্তিকে।
গ্যালারির এক প্রান্তে ছোট ছেলেটা আবার বলে ওঠে—
— “আমি বড় হয়ে মেসির মতো হব।”
তার বাবা এবার প্রথমবারের মতো হাসেন।
— “না, তুমি মেসির মতো হতে পারবে না। তুমি শুধু তুমি হতে পারবে। সেটাই সবচেয়ে বড় কথা।”
স্টেডিয়ামের আলো ধীরে ধীরে নিভে যায়। কিন্তু বাতাসে থেকে যায় এক নাম—মেসি।
আর সেই নামের ভেতরে লুকিয়ে থাকে স্বপ্ন, ভালোবাসা, আর বিস্ময়। কোথাও যেন ভেসে আসে আন্তোনেলার সেই মৃদু সুর—
“লিওনেল মেসি, লিওনেল মেসি,
আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি...”
মাঠ তখন প্রায় ফাঁকা। তবু মনে হয়, আলো নিভে গেলেও একজন মানুষ রয়ে গেছেন। তিনি দৌড়াচ্ছেন না, গোলও করছেন না। তবু কোটি মানুষের হৃদয়ে তিনি খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন।
কিছু মানুষ ইতিহাস লেখেন। কিছু মানুষ ইতিহাসের অংশ হন। আর কিছু মানুষ এমন হন, যাদের নামই ইতিহাস হয়ে যায়। লিওনেল মেসি সেই বিরল মানুষের একজন। প্রতিভা তাকে মহান করেছে, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা তাকে করেছে ফুটবলের রাজা।
লন্ডন, ১৮ জুন, ২০২৬
