বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে একমাত্র বিদেশি বীরপ্রতীক উইলিয়াম আব্রাহাম সাইমন ঔডারল্যান্ড এর উপর ভিত্তি করে এ অনুগল্প
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ২৪।। একমাত্র বিদেশি বীরপ্রতীক
।। একমাত্র বিদেশি বীরপ্রতীক ।।
।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর।।
উৎসর্গ
“একজন বিদেশি হয়েও যিনি বাংলার মানুষের স্বাধীনতাকে নিজের লড়াই বানিয়েছিলেন
—সেই বীরপ্রতীক ঔডারল্যান্ডের প্রতি শ্রদ্ধায়”

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে একমাত্র বিদেশি বীরপ্রতীক উইলিয়াম আব্রাহাম সাইমন ঔডারল্যান্ড
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত।
ঢাকা তখন এক ভয়াবহ রাতের সাক্ষী।
চারদিকে আগুনের লেলিহান শিখা। আকাশ কাঁপছে গুলির শব্দে। মানুষের আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে উঠেছে বাতাস। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শুরু করেছে নির্মম হত্যাযজ্ঞ।
টঙ্গীর বাটা কারখানার ভবনে দাঁড়িয়ে একজন বিদেশি মানুষ নিঃশব্দে তাকিয়ে আছেন অন্ধকার ঢাকার দিকে।
তার নাম উইলিয়াম আব্রাহাম সাইমন ঔডারল্যান্ড।
হাতে কোনো অস্ত্র নেই তখন। পরনে একজন সাধারণ কর্মকর্তার পোশাক। কিন্তু তার বুকের ভেতরে শুরু হয়ে গেছে আরেকটি যুদ্ধ।
তিনি ধীরে ধীরে নিজের কাছে প্রশ্ন করেন,
— "আমি কি আবারও সেই একই ইতিহাস দেখতে থাকব? আমি কি শুধু একজন দর্শক হয়ে থাকব?"
এই প্রশ্নের উত্তরই কয়েক মাসের মধ্যে তাঁকে পরিণত করবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের এক কিংবদন্তি যোদ্ধায়।
ঔডারল্যান্ড বাংলাদেশে এসেছিলেন যুদ্ধ করতে নয়।
তিনি এসেছিলেন চাকরি করতে।
১৯৭০ সালের শেষ দিকে বাটা কোম্পানির প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। টঙ্গীর বাটা কারখানায় দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়েই তিনি হয়ে ওঠেন শ্রমিক-কর্মচারীদের প্রিয় মানুষ।
কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে তিনি বসতেন, কথা বলতেন। কারও সমস্যা হলে শুনতেন। নিজের পদমর্যাদাকে কখনো দূরত্ব তৈরির দেয়াল হতে দেননি।
কেউ প্রশংসা করলে তিনি বলতেন,
— "এই সাফল্য আমার নয়, আমাদের সবার।"
কেউ জানত না, শান্ত স্বভাবের এই বিদেশি কর্মকর্তার ভেতরে লুকিয়ে আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক যোদ্ধার অভিজ্ঞতা।
মাত্র কয়েক বছর বয়সে দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে। পরে বাটা কোম্পানিতে কাজ শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেন। বন্দি হন, পালিয়ে যান, আবার গোপন প্রতিরোধ আন্দোলনে যোগ দেন।
যুদ্ধ তাঁকে শিখিয়েছিল—অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা মানে অন্যায়কে শক্তিশালী করা।
১৯৭১ সালের মার্চে টঙ্গীর শ্রমিক আন্দোলনের সময় তিনি আবার সেই পুরোনো সত্যের মুখোমুখি হন।
গুলির শব্দ।
রক্তাক্ত মানুষ।
ভয়ে কাঁপতে থাকা শ্রমিকদের মুখ।
নিজের চোখে দেখা সেই দৃশ্য তাঁর ভেতরে গভীর ক্ষত তৈরি করে।
তিনি বুঝতে পারেন, এই দেশের মানুষের ওপর যা ঘটছে তা শুধু একটি রাজনৈতিক সংকট নয়, এটি মানবতার সংকট।
৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনে তিনি আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেন—একটি জাতি স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেছে।
তারপর আসে সেই কালরাত।
২৫ মার্চের গণহত্যা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপে নাৎসি বর্বরতা দেখেছিলেন তিনি। কিন্তু ঢাকার সেই রাত তাঁকে আবার মনে করিয়ে দেয়—মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের এই নিষ্ঠুরতা কোনো সীমান্ত মানে না।
তিনি সিদ্ধান্ত নেন, এবার তিনি শুধু দেখবেন না।
তিনি এগিয়ে আসবেন।
দিনের আলোয় তিনি থাকতেন বাটা কোম্পানির একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। তাঁরা তাঁকে বিশ্বাস করত। সেনানিবাসে তাঁর যাতায়াত ছিল।
কিন্তু সেই বিশ্বাসের আড়ালেই চলছিল অন্য এক কাজ।
তিনি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক তথ্য সংগ্রহ করে পৌঁছে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে।
পাকিস্তানি বাহিনীর পরিকল্পনা, অবস্থান, অভিযান—যা জানতে পারতেন, তা কাজে লাগত মুক্তিযোদ্ধাদের।
এক রাতে কয়েকজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধার সামনে বাংলাদেশের মানচিত্র খুলে বসেন তিনি।
একজন তরুণ অবাক হয়ে প্রশ্ন করে,
— "স্যার, আপনি তো আমাদের দেশের মানুষ নন। আমাদের জন্য এত ঝুঁকি নিচ্ছেন কেন?"
ঔডারল্যান্ড কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন।
তারপর বলেন,
— "মানুষের স্বাধীনতার লড়াইয়ে দেশের সীমা থাকে না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই আসল পরিচয়।"
এই মানুষটি শুধু তথ্য দেননি।
তিনি প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
বাটা কারখানার গোপন জায়গায় মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা যুদ্ধের কৌশল শেখান। অস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেন। কীভাবে শত্রুর যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে দিতে হয়, কীভাবে অভিযান পরিচালনা করতে হয়—নিজের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা দিয়ে তা শেখান।

মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম এ জি ওসমানীর সাথে বীরপ্রতীক উইলিয়াম আব্রাহাম সাইমন ঔডারল্যান্ড
তিনি ছিলেন টাই পরা একজন করপোরেট কর্মকর্তা।
আবার কখনো কাঁধে অস্ত্র তুলে নেওয়া এক গেরিলা যোদ্ধা।
মুক্তিযোদ্ধারা তাঁকে ভালোবেসে ডাকত—ঔডারল্যান্ড ভাই।
তিনি জানতেন, ধরা পড়লে ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে।
তবুও পিছিয়ে যাননি।
কারণ তাঁর কাছে তখন বাংলাদেশ শুধু একটি কর্মস্থল ছিল না।
এটি হয়ে উঠেছিল মানুষের মুক্তির প্রতীক।
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১।
বাংলাদেশ স্বাধীন।
লাখো মানুষের আনন্দের মাঝে দাঁড়িয়ে ঔডারল্যান্ড হয়তো মনে মনে ফিরে দেখেছিলেন সেই মার্চের রাতকে।
যে রাতে তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন—চুপ করে থাকবেন না।
স্বাধীনতার পরও তিনি বাংলাদেশে থেকে যান। আরও কয়েক বছর বাটা কোম্পানির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৮ সালে অবসর নিয়ে ফিরে যান অস্ট্রেলিয়ায়।
কিন্তু বাংলাদেশ তাঁকে ভুলে যায়নি।
মহান মুক্তিযুদ্ধে অসাধারণ অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত করে।
তিনি হয়ে ওঠেন—
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে একমাত্র বিদেশি বীরপ্রতীক।
২০০১ সালের ১৮ মে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন বাংলাদেশপ্রেমি এই মহান মুক্তিযোদ্ধা উইলিয়াম আব্রাহাম সাইমন ঔডারল্যান্ড।
কিন্তু ইতিহাসে তিনি থেকে যান।
কারণ তিনি প্রমাণ করে গেছেন—
জন্মভূমি মানুষকে পরিচয় দেয়, কিন্তু ভালোবাসা মানুষকে আপন করে নেয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে তাই এক বিদেশি মানুষের নামও চিরকাল লেখা থাকবে শ্রদ্ধার অক্ষরে—
উইলিয়াম আব্রাহাম সাইমন ঔডারল্যান্ড, বীরপ্রতীক।
লন্ডন, ২৮ জুলাই ২০২৬