ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৬ ।। এ কোন্‌ সকাল ?

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৬ ।। এ কোন্‌ সকাল ?

উৎসর্গ

যাঁরা প্রার্থনার ঘরে শান্তি খুঁজতে গিয়ে অশান্তির শিকার হন—

এ কোন্‌ সকাল ?

।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।

ফজরের আকাশ তখনও পুরোপুরি ফর্সা হয়নি। খুলনার দৌলতপুর এলাকার পশ্চিম কাশীপুরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশের সেই জামে মসজিদটা ভোরের নরম অন্ধকারে ডুবে ছিল। চারপাশে এমন এক নীরবতা, যেটা শুধু রাতের নয়—প্রার্থনার পরের নীরবতাও।

ভেতরে নামাজ শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। মুসল্লিরা কেউ তাসবিহে, কেউ কোরআন তিলাওয়াতে, কেউ আবার চুপচাপ বসে আছেন। সেই সময়টা এমন, যেন মানুষ নিজের ভেতরের শব্দগুলোকে একটু গুছিয়ে নেয়।

লোকমান হাকিম তখন মসজিদের ভেতরেই ছিলেন।

মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। শান্ত স্বভাবের মানুষ। প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর তিনি কিছুক্ষণ কোরআন তিলাওয়াত করেন, তারপর চুপচাপ বসে থাকেন—যেন নিজের জীবনের হিসাবটা নীরবে মেলান।

বারান্দায় বসেছিলেন আলম শেখ। কাপড়ের ব্যবসায়ী। জীবনের ক্লান্তি যার চোখে, কিন্তু নামাজের পরের এই নীরবতায় যিনি একটু স্বস্তি খুঁজে পান।

সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল।

এতটাই স্বাভাবিক যে, অস্বাভাবিকতার কোনো পূর্বাভাসই ছিল না।

হঠাৎ মসজিদের সামনে দিয়ে একটি লাল মোটরসাইকেল ধীরে চলে গেল। কেউ খুব একটা খেয়াল করেনি। ভোরের শহরে এটা নতুন কিছু নয়।

কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরই—

মসজিদের ভেতরে গুলির শব্দ।

ছোট, তীক্ষ্ণ, নির্মম।

যেন কেউ সিজদার মাঝেই শান্ত বাতাসকে ছিঁড়ে ফেলল।

লোকমান হাকিম যেখানে বসেছিলেন, সেখানেই সব থেমে গেল। আলম শেখ বারান্দায় বসা থেকে এক মুহূর্তে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।

রক্ত, শব্দ আর অবিশ্বাস—সব একসাথে মিশে গেল মসজিদের মেঝেতে।

দুর্বৃত্তরা এসেছিল, আবার চলে গিয়েছিল। খুব দ্রুত। এত দ্রুত যে, মনে হয় তারা কখনো ছিলই না—শুধু শব্দটাই রেখে গেছে।

একজন মুসল্লি বললেন, “আমরা ভেবেছিলাম মসজিদে এসে সব ভয় শেষ হয়। আজ বুঝলাম, ভয় কখনো কখনো সিজদার ভেতরেও ঢুকে পড়ে।”

লোকমান হাকিম কোনোভাবে ফোনে স্বজনদের খবর দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। সেই শেষ মুহূর্তগুলো ছিল ভাঙা, অস্পষ্ট, আর ভারী।

তারপর নীরবতা।

সেই নীরবতা, যেটা গুলির শব্দের পরও থামে না।

সকালের আলো পুরোপুরি উঠতেই দৌলতপুর পশ্চিম কাশীপুরের সেই মসজিদ ঘিরে পুলিশ, স্থানীয় মানুষ আর কৌতূহলের ভিড় জমে গেল। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেল লাল মোটরসাইকেল। দুইজন মানুষ। দ্রুত চলে যাওয়া ছায়ার মতো। কিন্তু কাছের কোনো ক্যামেরা ছিল না। তাই পুরো ছবিটা এখনো অসম্পূর্ণ।

ইমাম আমানত উল্লাহ বললেন, “ফজরের পর লোকমান সাহেব আমার সঙ্গে কোরআন পড়ছিলেন। আধা ঘণ্টা পর এই খবর পাই। এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না।”

মসজিদের এক মুসল্লি বললেন, “তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। প্রতিদিন নামাজ পড়তেন। এমন ঘটনা আমরা কখনো কল্পনাও করিনি।”

তদন্ত শুরু হলো। পুলিশ বলল—ব্যবসায়িক বিরোধ, ব্যক্তিগত শত্রুতা, এমনকি চরমপন্থী সংশ্লিষ্টতার দিকও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আর এ ধরনের কোন ঘটনার পরে তো সব সময়ই বলা হয় ‘খতিয়ে’ দেখা হচ্ছে। কে জানে, কখন এই খতিয়ে দেখা শেষ হবে?

কিন্তু মসজিদের ভেতরের মানুষগুলো শুধু একটা প্রশ্নই বুঝতে পারছিল—

“কেন আল্লাহর ঘর মসজিদে আজ গুলি চলবে?”

এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর কেউ মেলাতে পারেন না।

কারণ মসজিদ তো সেই জায়গা, যেখানে মানুষ সব প্রশ্ন রেখে আসে, উত্তর খুঁজতে নয়।

বিকেলে মেঝের দাগ শুকাতে শুরু করলেও মানুষের চোখে যে দাগ লেগে গেল, সেটা শুকায়নি।

একজন বৃদ্ধ মুসল্লি বারান্দায় বসে শুধু বলছিলেন, “এ কোন সকাল ছিল?”

তার কণ্ঠে রাগ ছিল না। ছিল অবিশ্বাসের ভার।

রাত নামার আগে মসজিদ আবার কিছু মানুষের পায়ের শব্দ শুনল। তারা কেউ কথা বলল না। শুধু দাঁড়িয়ে থাকল—যেন সময়কে বুঝতে চাইছে।

কিন্তু সময় তখন আর বোঝানোর মতো অবস্থায় ছিল না।

দৌলতপুর পশ্চিম কাশীপুরের সেই মসজিদে সেই সকাল শুধু একটি ঘটনা নয়—

এটি একটি প্রশ্ন হয়ে রয়ে গেল।

এ কোন সকাল?

লন্ডন, ১৬ জুন ২০২৬।