"একটি শব্দ, একটি সিদ্ধান্ত, একটি জীবন বাঁচানোর ঘটনা অবলম্বনে

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ২৫ ।। না ।।

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ২৫ ।। না ।।

।। না ।। 

।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর।।

 উৎসর্গ

বাংলাদেশের সেই তরুণদের, যারা অন্ধকারের হাতছানি উপেক্ষা করে আলোর পথ বেছে নেয়।"

কলেজপড়ুয়া ১৯ বছরের তরুণ রিফাত সেই এঁদো গলিতে দাঁড়িয়ে আছে

ঢাকার মোহাম্মদপুরের সরু গলি। কলেজপড়ুয়া ২০ বছরের তরুণ রিফাত সেই এঁদো গলিতে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে খুব অস্থির দেখাচ্ছে। বারবার সে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। কখনো মোবাইলের স্ক্রিন জ্বালিয়ে দেখছে, আবার কখনো চারপাশে তাকিয়ে নিচ্ছে।

গলির এক পাশে পুরোনো দেয়াল, অন্য পাশে ছোট ছোট ঘর। নর্দমার গন্ধ, মানুষের ব্যস্ত চলাচল আর গাড়ির হর্নের শব্দের মাঝেও রিফাতের কানে যেন কিছুই ঢুকছে না। তার মাথার ভেতর শুধু ঘুরছে একটি কথাই—

"পাঁচ হাজার টাকা।"

মাত্র পাঁচ হাজার টাকা।

এই টাকার জন্যই আজ সে এখানে দাঁড়িয়ে আছে।

বাবার ছোট ব্যবসা কয়েক মাস ধরে ভালো যাচ্ছে না। মায়ের নিয়মিত ওষুধ লাগে। ছোট বোনের কলেজের ফি বাকি পড়ে আছে। সংসারের চাপ তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে ভেঙে দিচ্ছে।

ঠিক তখনই মোবাইল কেঁপে ওঠে।

একটি বার্তা আসে—

"ভাই, পার্সেলটা নিয়ে শুধু নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দিবেন। কোনো ঝামেলা নেই। কাজ শেষ, টাকা হাতে।"

রিফাত বার্তাটির দিকে তাকিয়ে থাকে।

তার হাত কাঁপতে থাকে।

কাজটা কী?

সে জানে না।

অথবা, হয়তো জানে—কিন্তু নিজের মনকে বোঝাতে চাইছে যে সে জানে না।

কয়েকদিন আগে বন্ধু সজীব তাকে এই কাজের কথা বলেছিল।

—"দোস্ত, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। শুধু একটা জিনিস নিয়ে যাবি। হাজার হাজার মানুষ এসব করে।"

রিফাত তখন বলেছিল—

—"কিন্তু যদি খারাপ কিছু হয়?"

সজীব হেসে বলেছিল—

—"জীবনে একটু ঝুঁকি না নিলে টাকা আসে না।"

আজ সেই ঝুঁকির সামনে দাঁড়িয়ে রিফাত বুঝতে পারছে, সব ঝুঁকি সমান নয়। কিছু ঝুঁকি শুধু টাকা হারায়, আর কিছু ঝুঁকি পুরো জীবনটাই কেড়ে নেয়।

হঠাৎ পেছন থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে আসে।

—"রিফাত?"

সে চমকে ফিরে তাকায়।

পাশের বাসার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আজিজ স্যার দাঁড়িয়ে আছেন।

—"এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? মুখটা এমন অস্থির লাগছে কেন?"

রিফাত কিছু বলতে পারে না। চোখ নামিয়ে ফেলে।

আজিজ স্যার তার মুখ দেখে বুঝতে পারেন, ছেলেটার ভেতরে কোনো বড় দ্বন্দ্ব চলছে।

—"কোনো সমস্যায় পড়েছিস?"

অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর রিফাত ধীরে ধীরে সব খুলে বলে।

আজিজ স্যার দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

—"তুই জানিস, মাদক ব্যবসায়ীরা এখন আর শুধু নিজেরা কাজ করে না। তারা তোদের মতো তরুণদের ব্যবহার করে। অনলাইনে যোগাযোগ করে, সহজ টাকার লোভ দেখায়, তারপর ধীরে ধীরে মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যায় যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন।"

রিফাত চুপ করে শুনতে থাকে।

আজিজ স্যার বলেন—

—"একটা কথা মনে রাখিস, অপরাধীরা কখনো নিজের সন্তানকে এই কাজে পাঠায় না। তারা অন্যের সন্তানকে ব্যবহার করে।"

কথাটা রিফাতের বুকের ভেতর আঘাত করে।

সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে সে টেলিভিশনে খবর দেখে। দেশের বিভিন্ন সীমান্তপথ দিয়ে ইয়াবা, হেরোইন, ক্রিস্টাল মেথসহ নানা ধরনের মাদক ঢুকছে। পরে সেগুলো ছড়িয়ে পড়ছে শহর থেকে গ্রামে। অনলাইন মাধ্যম, কুরিয়ার সার্ভিস আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে তরুণদের জড়িয়ে ফেলছে অপরাধী চক্র।

রিফাতের মনে পড়ে যায় আজকের সেই পার্সেলের কথা।

পরদিন কলেজে গিয়ে সে আরও একটি ধাক্কা খায়।

তার বন্ধু তন্ময়, যে একসময় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পেত, যে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখত—সে এখন মাদকের নেশায় ডুবে গেছে।

তন্ময়ের মা কাঁদতে কাঁদতে বলে—

—"আমার ছেলে কোথায় হারিয়ে গেল, আমি জানি না।"

রিফাত স্তব্ধ হয়ে যায়।

সে বুঝতে পারে, মাদক শুধু একজন মানুষকে ধ্বংস করে না। এটি একটি পরিবারকে ভেঙে দেয়, স্বপ্নকে হত্যা করে।

সন্ধ্যায় আবার ফোন আসে।

—"কাজটা করবি? না করলে অন্য কাউকে দেব।"

কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকে রিফাত।

তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বলে—

—"না।"

ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

রিফাত আবার বলে—

—"আমি আমার জীবন নষ্ট করার কাজে অংশ নেব না।"

কল কেটে যায়।

কয়েকদিন পর সে জানতে পারে, যে ছেলেটি তার বদলে সেই পার্সেল বহন করেছিল, সে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে।

রিফাতের বুক কেঁপে ওঠে।

সে ভাবে—সেদিন যদি সে রাজি হতো?

তার জীবনও হয়তো অন্য এক অন্ধকার পথে চলে যেত।

আজিজ স্যারের অনুপ্রেরণায় রিফাত কলেজের বন্ধুদের নিয়ে একটি সচেতনতা দল গড়ে তোলে—"না"।

তাদের লক্ষ্য, তরুণদের বোঝানো—মাদকের প্রথম প্রলোভনকে প্রত্যাখ্যান করাই সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ।

কয়েক মাস পর তন্ময় চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করে।

একদিন কলেজের অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে তন্ময় বলে—

—"একটা ভুল সিদ্ধান্ত আমার জীবন শেষ করে দিতে বসেছিল। তোমরা কেউ সেই ভুল করো না।"

চারদিকে নীরবতা নেমে আসে।

রিফাত মঞ্চে উঠে বলে—

—"মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুধু পুলিশের নয়, শুধু সরকারের নয়। এই যুদ্ধ প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি তরুণের।"

সে একটু থামে।

তারপর বলে—

—"কারণ জীবন বাঁচানোর প্রথম শব্দটি হলো—"

সবাই একসঙ্গে বলে ওঠে—

"না।"

আর সেই একটি শব্দেই শুরু হয় নতুন এক লড়াই—অন্ধকারের বিরুদ্ধে, ধ্বংসের বিরুদ্ধে, হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নগুলোকে ফিরিয়ে আনার জন্য।