ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ২৬ ।। স্বদেশরা কেন সীমান্ত ছাড়ে?

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ২৬ ।।  স্বদেশরা কেন সীমান্ত ছাড়ে?

স্বদেশরা কেন সীমান্ত ছাড়ে?

।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।

উৎসর্গ
সেই সব তরুণ-তরুণীর প্রতি, যারা জন্মভূমিকে ভালোবেসেও ন্যায্য সুযোগ, মর্যাদা ও ভবিষ্যতের আশায় একদিন সীমান্ত পেরিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে।

য়নাল খোন্দকার। এখন চারিদিকে দেখেন সবকিছু অন্ধকার। বয়স এখন পঁচাত্তর। মনে এখনো বাস করে একাত্তর। শরীর আগের মতো নেই, কিন্তু বুকের ভেতর এখনও একটি সবুজ-লাল পতাকা উড়ে। ১৯৭১ সালে কাঁধে রাইফেল তুলে তিনি মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। মৃত্যুকে সামনে রেখেও যুদ্ধ করেছিলেন একটাই বিশ্বাস নিয়ে—একদিন এই দেশের মানুষ নিরাপদে বাঁচবে, ন্যায়বিচার পাবে, নিজের দেশে মাথা উঁচু করে স্বপ্ন দেখবে।

যুদ্ধ শেষে বিজয় নিয়ে ফিরেছিলেন তিনি। মনে হয়েছিল, এবার তাঁর সন্তানেরা এমন এক বাংলাদেশে বড় হবে, যেখানে পরিচয়ের চেয়ে যোগ্যতা বড় হবে, ভয়ের চেয়ে স্বাধীনতা শক্তিশালী হবে, অন্যায়ের চেয়ে ন্যায়ের জয় হবে। দেশ দেশ করে প্রায় মধ্য বয়সে এসে বিয়ে করেন খোন্দকার সাহেব। আর দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে থাকেন। 

সেই স্বপ্ন থেকেই একমাত্র ছেলের নাম রাখেন সীমান্ত স্বদেশ খোন্দকার। কারণ তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রথমে স্বদেশ ছেড়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিয়েছিলেন। 

ছেলেই তাঁর কাছে স্বদেশ। তাঁর উত্তরাধিকার।

মেয়ের নাম রাখেন মমতা মুক্তি খোন্দকার

ভাবেন, এই দেশ একদিন ঘৃণা, অন্যায় আর বৈষম্য থেকে মুক্তি পাবে; মানুষ মানুষকে মমতায় আগলে রাখবে। কিন্তু এখন মানুষ অন্য মানুষকে দেখতে পারে না।

মুক্তিযুদ্ধের পর অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। জয়নাল খোন্দকার এখন প্রতিদিন খবরের কাগজ পড়েন। টেলিভিশনের সংবাদ শোনেন। কখনো চুপচাপ বারান্দায় বসে থাকেন।

তিনি দেখেন, দুর্নীতির খবর শেষ হয় না। শিক্ষিত তরুণ বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় থাকে। কোথাও সুপারিশ, কোথাও প্রভাব, কোথাও অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে অনেক তরুণের মনে ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা জন্মায়। সড়কে দুর্ঘটনা, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার খবর, প্রতারণা, দখলদারিত্ব, মূল্যস্ফীতির চাপ—সব মিলিয়ে তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে, এই দেশ কি সেই দেশ, যার জন্য তিনি যুদ্ধ করেছিলেন?

তিনি জানেন, দেশে এখনও অসংখ্য সৎ মানুষ আছেন। অসংখ্য তরুণ লড়াই করে এগিয়ে যাচ্ছে। তবু তাঁর মনে হয়, সাধারণ মানুষের জীবন যেন অকারণে আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

এক সন্ধ্যায় সীমান্ত স্বদেশ বাবার পাশে এসে বসে।

"আব্বা, আমি আরেকটা চাকরির ইন্টারভিউ দিয়ে এলাম।"

"কী হলো?"

ছেলে মৃদু হেসে বলে, "হয়তো হবে না।"

"কেন?"

"যোগ্যতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করেনি। কিন্তু মনে হয়েছে, আমার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল আমি কার পরিচিত।"

জয়নাল খোন্দকার কোনো উত্তর দিতে পারেন না। তিনি কোম্পানী কমান্ডার হয়েও মুক্তিযোদ্ধার সনদ নেননি। তাঁর কথা ছিল দেশকে ভালবেসে যুদ্ধ করেছি, সনদ নিতে হবে কেন? অতচ আজকাল ভূয়া মুক্তিযোদ্ধ হয়েও অনেকে সনদ নিয়ে কি দাপটই না দেখাছে।

তিনি শুধু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

এই মুখটিই তো তাঁর স্বাধীন বাংলাদেশের মুখ হওয়ার কথা ছিল।

পরের কয়েক মাসে সীমান্ত আরও কয়েকটি পরীক্ষায় অংশ নেয়। বিদেশে পড়তে যাওয়া বন্ধুদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আড্ডার বিষয় বদলে যায়। বিসিএসের বইয়ের জায়গায় আসে আইইএলটিএসের গাইড, বিশ্ববিদ্যালয়ের নোটের জায়গায় বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার।

একদিন জয়নাল খোন্দকার ছেলেকে ডেকে বলেন,

"তুই বিদেশে চলে যা।"

সীমান্ত বিস্মিত হয়ে তাকায়।

"আপনি তো সব সময় বলতেন, দেশ ছেড়ে যাবি না।"

বৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।

"বলতাম। কারণ আমি বিশ্বাস করতাম, এই দেশ তোদের স্বপ্ন পূরণ করবে। এখন তোকে আটকে রাখার মতো সাহস আমার নেই। বাবা হয়ে আমি চাই, তুই অন্তত এমন একটা জায়গায় থাকিস, যেখানে পরিশ্রমের মূল্য পাবি।"

কথা বলতে বলতে তাঁর গলা কেঁপে ওঠে।

"আমি দেশকে ছাড়তে বলিনি, বাবা। কিন্তু যদি দেশ আমার ছেলেকে ধরে রাখতে না পারে, তাহলে আমি ছেলেকে দোষ দেব কীভাবে?"

তারপর শুরু হয় নতুন প্রস্তুতি।

সীমান্ত ইংরেজি শেখে। পরীক্ষায় বসে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করে। মা সংসারের সঞ্চয় ভাঙেন। বাবা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পাওয়া সম্মাননাপত্রের দিকে একবার তাকিয়ে আবার আলমারির ড্রয়ার বন্ধ করে দেন।

অবশেষে ভিসা আসে।

যেদিন বিমানবন্দরে যাওয়ার দিন আসে, জয়নাল খোন্দকার ছেলের পাসপোর্ট হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকেন।

একাত্তরে তিনি সীমান্ত পাহারা দিয়েছিলেন, যাতে দেশের মানুষ নিরাপদে দেশে ফিরতে পারে।

আজ তাঁর নিজের ছেলে সেই সীমান্ত পেরিয়ে চলে যাচ্ছে ভবিষ্যতের খোঁজে।

বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে সীমান্ত বাবাকে জড়িয়ে ধরে।

"আব্বা, আমি কি দেশ ছেড়ে যাচ্ছি?"

জয়নাল খোন্দকার ধীরে ধীরে মাথা নাড়েন।

"না বাবা। মানুষ দেশ ছাড়ে না। মানুষ শুধু সেই জায়গায় যায়, যেখানে তার স্বপ্ন বাঁচতে পারে।"

বিদেশে গিয়ে সীমান্ত বুঝতে পারে, জীবন সহজ নয়। সকালে ক্লাস, বিকেলে কাজ, রাতে পড়াশোনা। তীব্র শীত, একাকিত্ব, কঠোর পরিশ্রম—সবই আছে।

তবু প্রতিটি দিনের শেষে তার মনে হয়, আজকের পরিশ্রম আগামী দিনের দরজা খুলতে পারে।

আর বাংলাদেশে জয়নাল খোন্দকার প্রতিদিন বারান্দায় বসে থাকেন।

সন্ধ্যা হলে আকাশের দিকে তাকান।

যে আকাশের নিচে একদিন স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই আকাশ দিয়েই আজ উড়ে যায় একের পর এক বিমান।

প্রতিটি বিমানের দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে একই প্রশ্ন জাগে—

স্বদেশরা কেন সীমান্ত ছাড়ে?

অনেক ভেবে তিনি একটি উত্তরই খুঁজে পান।

দেশপ্রেম মানুষকে জন্মভূমির সঙ্গে বেঁধে রাখে।

কিন্তু ন্যায্য সুযোগ, নিরাপত্তার অনুভূতি, মর্যাদা আর ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা—এই চারটি জিনিসই মানুষকে সেখানে থেকে যেতে শেখায়।

যখন সেই আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন সীমান্ত শুধু একজন মানুষের নাম থাকে না।

সীমান্ত হয়ে ওঠে একটি প্রজন্মের প্রতীক।

আর স্বদেশ তখন শুধু একটি দেশ নয়।

স্বদেশ হয়ে ওঠে এমন এক স্বপ্ন, যাকে ভালোবেসেও অনেক মানুষ একদিন পেছনে ফেলে যেতে বাধ্য হয়।

লন্ডন, ৩১ জুলাই, ২০২৬