ব্রিটেন সংবাদ
দাসপ্রথার ক্ষতিপূরণ চেয়ে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি
লন্ডন, ১৯ সেপ্টেম্বর : শত শত বছর আগের দাসপ্রথার দায়ে ব্রিটেনের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে আন্তর্জাতিক আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্যারিবীয় দেশগুলো। জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্যবিরোধী চুক্তিকে আইনি ভিত্তি করে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে মামলা করা যায় কি না, তা নিয়ে ক্যারিবীয় আইনজীবীরা কাজ শুরু করেছেন।
বার্বাডোসের প্রধানমন্ত্রী মিয়া মোটলি এ উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। চলতি সপ্তাহে তিনি ক্ষতিপূরণ আদায়ের কৌশল নিয়ে একটি সম্মেলনের আয়োজন করেছেন। সেখানে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। ক্যারিবীয় আইনজীবীরা বিশেষ করে জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় বিষয়টি তোলার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছেন।

এর পেছনে সাম্প্রতিক একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ঘটনা রয়েছে। গত ৩১ আগস্ট জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য বিলোপ কমিটি বা সিইআরডি দাস বাণিজ্য, উপনিবেশবাদ ও আফ্রিকীয়দের ওপর বর্ণভিত্তিক দাসপ্রথার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির জন্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে নতুন নির্দেশনা প্রকাশ করে। কমিটি বলেছে, ঐতিহাসিক দাসপ্রথার প্রভাব আজও বর্ণবৈষম্য ও বৈষম্যের বিভিন্ন রূপে টিকে থাকলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা বিবেচনা করার আন্তর্জাতিক আইনি দায়িত্ব রয়েছে।
এর আগে মার্চে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ট্রান্সআটলান্টিক দাস বাণিজ্য ও আফ্রিকীয়দের বর্ণভিত্তিক দাসত্বকে মানবতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। প্রস্তাবটির পক্ষে ১২৩টি দেশ ভোট দেয়; ৫২টি দেশ ভোটদানে বিরত থাকে। যুক্তরাজ্যও ভোটদানে বিরত ছিল। তবে জাতিসংঘের ওই প্রস্তাব আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়।
দাসপ্রথার ক্ষতিপূরণ নিয়ে ক্যারিবীয় দেশগুলোর আইনি তৎপরতার সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ জ্যামাইকা। গত ৭ সেপ্টেম্বর জ্যামাইকার সরকার রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছে একটি আবেদন জমা দিয়েছে। এতে তিনটি আইনি প্রশ্ন ব্রিটিশ প্রিভি কাউন্সিলের বিচারিক কমিটির কাছে পাঠানোর অনুরোধ করা হয়েছে—জ্যামাইকায় আফ্রিকীয়দের জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়া ও দাসত্বে বাধ্য করা ইংরেজ আইনে কখনো বৈধ ছিল কি না, তা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন ছিল কি না এবং যুক্তরাজ্যের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা আছে কি না।
জ্যামাইকার আবেদনে সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট অর্থের অঙ্ক দাবি করা হয়নি। বরং দাসপ্রথার ঐতিহাসিক ও দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির জন্য উপযুক্ত প্রতিকার কী হতে পারে, তা আইনি দৃষ্টিতে নির্ধারণের বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। জ্যামাইকার এই উদ্যোগকে ক্যারিবীয় দেশগুলোর সংগঠন ক্যারিকমের সরকারপ্রধানরা সমর্থন করেছেন।
অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান পরিষ্কার—দাস বাণিজ্যকে তারা নিন্দনীয় ঐতিহাসিক অন্যায় হিসেবে স্বীকার করলেও যুক্তরাজ্য ক্ষতিপূরণ দেবে না। ৮ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ সরকারের একজন মুখপাত্র পুনরায় এই অবস্থান জানান।
এই আইনি বিতর্কের নতুন দিক হলো—ক্যারিবীয় দেশগুলো এখন শুধু ঐতিহাসিক অন্যায়ের নৈতিক স্বীকৃতি বা আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং বর্তমান আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অতীতের দাসপ্রথার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের জন্য কোনো আইনি প্রতিকার দাবি করা যায় কি না, সেই প্রশ্ন আদালতের সামনে তোলার চেষ্টা করছে।
তবে ব্রিটেনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা হলে সেটি কোন আদালতে, কোন আইনের অধীনে এবং আদালতের সেই মামলা গ্রহণের এখতিয়ার আছে কি না—এসব প্রশ্ন এখনো আইনি প্রক্রিয়ার অংশ। ফলে ‘ব্রিটেনকে ক্ষতিপূরণ দিতেই হবে’—এমন কোনো আদালতের সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
দাসপ্রথা নিয়ে এই নতুন আইনি উদ্যোগ তাই শুধু অতীতের ইতিহাসের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক আইন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ইতিহাস, ক্যারিবীয় দেশগুলোর বর্তমান সামাজিক-অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং ঐতিহাসিক অন্যায়ের প্রতিকার নিয়ে বিশ্বজুড়ে চলমান বিতর্ক।