বাংলাদেশ সংবাদ

হিমালয়ের কারণে বাংলাদেশসহ ৮ দেশের জন্য একই সতর্কবার্তা

হিমালয়ের কারণে বাংলাদেশসহ ৮ দেশের জন্য একই সতর্কবার্তা

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২০ সেপ্টেম্বর :

হিমালয়ের বরফে পরিবর্তন এখন আর শুধু পাহাড়ি এলাকার সমস্যা নয়। হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়া, বরফ ও পাথরধস, হিমবাহের হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত—সব মিলিয়ে বাংলাদেশসহ হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের আট দেশের জন্য একই ধরনের সতর্কবার্তা তৈরি হয়েছে।

হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের আট দেশ হলো—আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, চীন, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও পাকিস্তান। এই অঞ্চলের ১০টি প্রধান নদী ব্যবস্থা প্রায় ২০০ কোটি মানুষের পানি, কৃষি, খাদ্য ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত।

গত ২৬ আগস্ট নেপালের উত্তর-মধ্যাঞ্চলের লাংটাং লিরুং পর্বতে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে বরফ-পাথরের বিশাল স্রোত ভোতে কোশি–ত্রিশূলী উপত্যকা দিয়ে নেমে আসে। সীমান্ত পেরিয়ে এর প্রভাব পড়ে চীনের তিব্বতেও। আইসিমোডের ভাষায়, এটি দেখিয়ে দিয়েছে হিমালয়ের কোনো একটি উচ্চভূমিতে বড় ধরনের ধস কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যে সীমান্ত অতিক্রম করে ভয়াবহ বন্যায় রূপ নিতে পারে।

এই বিপর্যয়ের পর নেপাল, বাংলাদেশ, ভুটান, চীন, ভারত ও পাকিস্তানসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বিশেষজ্ঞরা ১৫ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর কাঠমান্ডুতে বৈঠক করেছেন। সেখানে হিমবাহ, বরফ, তুষার ও পারমাফ্রস্টের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ এবং আঞ্চলিক আগাম সতর্কতা জোরদারের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।

বরফ কমছে, ঝুঁকি বাড়ছে

আইসিমোডের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিন্দুকুশ-হিমালয়ের হিমবাহগুলোর বরফ হারানোর গতি ২০০০ সালের পর দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলের হিমবাহের মোট আয়তন প্রায় ১২ শতাংশ কমেছে এবং বরফের মজুত কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ।

২০২৬ সালের আরেক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হিমালয় অঞ্চলের তুষার আচ্ছাদন দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ কমে গেছে। এটি টানা চতুর্থ বছর স্বাভাবিকের নিচে তুষার থাকার ঘটনা। এর ফলে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের পানির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এর অর্থ, হিমালয়ের সামনে শুধু বরফ গলার সমস্যা নেই; বরফ গলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানি, বন্যা, খরা ও খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকিও বদলে যাচ্ছে।

নেপালে আকস্মিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি

নেপালের পাহাড়ি জনপদে ঝুঁকিটি সবচেয়ে সরাসরি। হিমবাহের বরফ ও পাথর ধসে নদী আটকে যেতে পারে। পরে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যে বিপুল পানি নিচের দিকে নেমে আসতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে ভূমিধস, পাথরধস এবং নদীর গতিপথের আকস্মিক পরিবর্তন। ফলে গ্রাম, শহর, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প একসঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

ভারত ও সিকিমের সামনে বড় ঝুঁকি

ভারতের সিকিম, অরুণাচল, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ ও জম্মু-কাশ্মীরের মতো পাহাড়ি এলাকাতেও একই ঝুঁকি রয়েছে। ২০২৩ সালে সিকিমে সাউথ লোনাক হিমবাহ হ্রদ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। এ ধরনের হিমবাহ হ্রদ আরও তৈরি হলে সেগুলো পর্যবেক্ষণ না করা গেলে ভবিষ্যতে আকস্মিক বিপর্যয় ঘটতে পারে।

আইসিমোড সতর্ক করেছে, স্বাভাবিকের তুলনায় কম মৌসুমি বৃষ্টি হলেও বিপদ কমে না। দীর্ঘ শুষ্ক সময়ের পর অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস ও হিমবাহ-সম্পর্কিত বিপর্যয় একসঙ্গে ঘটতে পারে।

পাকিস্তান ও কাশ্মীরেও একই আশঙ্কা

পাকিস্তানের গিলগিট-বালতিস্তানসহ উত্তরাঞ্চল এবং কাশ্মীরের পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহ, তুষার ও আকস্মিক বৃষ্টির পরিবর্তন বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। অতিরিক্ত পানি একদিকে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস ঘটাতে পারে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহের বরফের মজুত কমে গেলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট বাড়তে পারে।

অর্থাৎ পাহাড়ি দেশগুলোর সামনে একই সঙ্গে দুটি বিপদ—হঠাৎ অতিরিক্ত পানি এবং ভবিষ্যতে পানির ঘাটতি।

বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা কেন?

বাংলাদেশে কোনো হিমবাহ নেই। কিন্তু বাংলাদেশের অবস্থান হিমালয়-উৎসারিত নদীগুলোর নিম্ন অববাহিকায়। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনাসহ বড় নদীগুলোর পানিপ্রবাহ বাংলাদেশের জীবন, কৃষি ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

তাই উজানে অস্বাভাবিক পানি প্রবাহ, পাহাড়ি ঢল বা অতিবৃষ্টির ঘটনা ঘটলে তার প্রভাব বাংলাদেশের নদীগুলোতেও পড়তে পারে। উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা ও নদীভাঙন বাড়তে পারে, ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ফসল ও অবকাঠামো।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—হিমালয়ের কোনো একটি বরফধস হলেই বাংলাদেশে সরাসরি ভয়াবহ বন্যা হবে, এমন সরল বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশের বন্যার মাত্রা নির্ভর করে উজানের পানি, স্থানীয় বৃষ্টি, মৌসুমি পরিস্থিতি, নদীর ধারণক্ষমতা এবং একই সময়ে অন্যান্য নদী অববাহিকার অবস্থার ওপর।

তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য আরও বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। হিমবাহ দ্রুত গললে প্রথমদিকে নদীতে পানির পরিমাণ বাড়তে পারে; কিন্তু বরফের মজুত ক্রমাগত কমে গেলে ভবিষ্যতে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় প্রভাব

হিমালয়ের পানি শুধু পানীয় জলের উৎস নয়; কৃষি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। পানি প্রবাহে বড় পরিবর্তন হলে নেপাল, ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে।

অতিরিক্ত পানি ফসল নষ্ট করতে পারে, নদীভাঙনে কৃষিজমি হারাতে পারে। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে সেচের খরচ ও পানির ওপর চাপ বাড়তে পারে।

আইসিমোডের ২০২৬ সালের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে একই সময়ে খরা, তাপপ্রবাহ,

পানির চাপ এবং আকস্মিক ভারী বৃষ্টির ঝুঁকি বাড়ছে। তাই শুধু বন্যার প্রস্তুতি নয়, একই সঙ্গে পানির সংকটের প্রস্তুতিও প্রয়োজন।

একই সতর্কবার্তা আট দেশের জন্য

আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, চীন, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল ও পাকিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থান আলাদা হলেও হিন্দুকুশ-হিমালয়ের পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে তারা একই বৃহৎ ব্যবস্থার অংশ। আইসিমোডের আঞ্চলিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কাঠামোও এই আট দেশকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করছে।

তাই একটি দেশের পাহাড়ে বিপদ তৈরি হলে শুধু সেই দেশের মধ্যে সতর্কতা জারি করে ঝুঁকি সামলানো সবসময় সম্ভব নয়। হিমবাহের পরিবর্তন, নদীর পানিপ্রবাহ, ভারী বৃষ্টি, ভূমিধস ও হিমবাহ হ্রদের অবস্থা—এসব তথ্য দ্রুত সীমান্ত পেরিয়ে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে পৌঁছানো জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগাম সতর্কতা, যৌথ পর্যবেক্ষণ এবং তথ্য আদান-প্রদান এখন এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান প্রয়োজন। আইসিমোডও হিমবাহ, তুষার ও পারমাফ্রস্ট পর্যবেক্ষণের জন্য সমন্বিত আঞ্চলিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছে।

হিমালয়ের বরফ গলছে পাহাড়ের চূড়ায়, কিন্তু এর প্রভাব আট দেশের কোটি কোটি মানুষের ঘর, মাঠ, নদী ও পানির উৎসে পৌঁছাতে পারে। নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় সেই বাস্তবতাই আবার সামনে এনেছে।

সতর্কবার্তাটি তাই একটাই—হিমালয়ের বিপদ কোনো দেশের সীমান্তে থেমে থাকে না।