কলিকালের কলধ্বনি ।। ৫৮ ।। নর্থ ইংল্যান্ডের আকাশে কি থেমে যাচ্ছে লাল–সবুজের ডানা?

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৫৮ ।।  নর্থ ইংল্যান্ডের আকাশে কি থেমে যাচ্ছে লাল–সবুজের ডানা?

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৫৮।।

।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।

নর্থ ইংল্যান্ডের আকাশে কি থেমে যাচ্ছে লাল–সবুজের ডানা ?

উৎসর্গ

ম্যানচেস্টারবাসী সকল বাংলাদেশি বিমান যাত্রীদের প্রতি

ম্যানচেস্টার–সিলেট সরাসরি ফ্লাইট স্থগিতের সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত নর্থ ইংল্যান্ডের বাংলাদেশী কমিউনিটিতে যে গভীর হতাশা, ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, তা কেবল একটি রুট বন্ধ হওয়ার প্রতিক্রিয়া নয়। এটি বহু বছরের আন্দোলন, প্রতীক্ষা এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রবাসীদের আবেগী সম্পর্কের ওপর এক নির্মম আঘাত।

এই ফ্লাইট চালু হওয়া ছিল নর্থ ইংল্যান্ডের বাংলাদেশীদের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের ফসল। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের মানুষের জন্য ম্যানচেস্টার–সিলেট রুট কোনো বিলাসিতা ছিল না—ছিল প্রয়োজন। অসুস্থ বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়ানো, শেষ বিদায়ের সময় জানাজায় পৌঁছানো, হঠাৎ জরুরি চিকিৎসা বা পারিবারিক বিপর্যয়ে দ্রুত দেশে যাওয়ার একমাত্র ভরসা ছিল এই সরাসরি ফ্লাইট। দীর্ঘ কর্মজীবনের ক্লান্তি নিয়ে প্রবাসীরা যখন দেশে ফেরেন, তখন এই রুট তাদের শারীরিক ও মানসিক চাপ অনেকটাই লাঘব করত।

কিন্তু গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে বুকিং সিস্টেমে এই ফ্লাইটটি আর দেখা যাচ্ছে না। আশ্চর্যের বিষয়, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি। ফলে হাজারো যাত্রী আজ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছেন—কেনা টিকিট, পরিকল্পিত সফর, পারিবারিক সিদ্ধান্ত—সবই ঝুলে আছে অজানার অন্ধকারে।

এই উদ্বেগ যে কেবল প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, সেটি স্পষ্ট হয়েছে যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনের নজিরবিহীন উদ্যোগে। গ্রেটার ম্যানচেস্টার ও নর্থ ওয়েস্ট অঞ্চলের আটজন সংসদ সদস্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে লিখিতভাবে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন। রচডেলের পল ওয়াহ, ম্যানচেস্টার রাশোলমের আফজাল খান, গর্টন অ্যান্ড ডেন্টনের অ্যান্ড্রু গুইন, ওল্ডহ্যাম ওয়েস্টের জিম ম্যাকমাহন, ওল্ডহ্যাম ইস্টের ডেবি আব্রাহামস, ওয়ারিংটন সাউথের সারাহ হল, স্টকপোর্টের নবেন্দু মিশ্র এবং ম্যানচেস্টার উইথিংটনের জেফ স্মিথ—এই আটজন এমপি একযোগে চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। চিঠিটি পাঠানো হয়েছে বিমানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাফিউল আজিমের কাছে, পাশাপাশি এর অনুলিপি দেওয়া হয়েছে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনারকেও।

চিঠিতে এমপিরা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন, ম্যানচেস্টার–সিলেট রুট যুক্তরাজ্যের অন্যতম বৃহৎ বাংলাদেশী কমিউনিটির জন্য একটি অত্যাবশ্যক যোগাযোগ মাধ্যম। অসুস্থ স্বজনের খোঁজ নেওয়া, মৃত্যুজনিত জরুরি সফর, চিকিৎসা ও পারিবারিক নানা প্রয়োজনে বিপুলসংখ্যক মানুষ এই সরাসরি ফ্লাইটের ওপর নির্ভরশীল। তাদের মতে, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া হঠাৎ করে এই রুট অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে ভয়, উদ্বেগ ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়েছে।

এখানেই প্রশ্ন ওঠে—যে ফ্লাইট একটি বৃহৎ কমিউনিটির জীবনযাত্রার সঙ্গে এত গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, সেটি কি কেবল আর্থিক হিসাবের খাতায় লাভ-লোকসানের অজুহাতে স্থগিত করা যায়? রাষ্ট্রের পতাকাবাহী বিমান কি শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, নাকি এটি রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্বেরও প্রতীক?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বহু বছর ধরে এই বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু যদি নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইটই ধরে রাখা না যায়, তবে সেই উন্নয়নের দাবি প্রবাসীদের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে। অবকাঠামোর উন্নয়ন তখন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন দেখা যায় না।

এই বাস্তবতায় নর্থ ইংল্যান্ডের বাংলাদেশীরা আজ ঐক্যবদ্ধ। বিমান বাংলাদেশের ম্যানচেস্টার–সিলেট ফ্লাইট পুনর্বহাল এবং সিলেট বিমানবন্দরে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল নিশ্চিত করার দাবিতে নর্থ বাংলা প্রেসক্লাব ইউকের উদ্যোগে বাংলাদেশী অ্যাসিস্ট্যান্ট হাইকমিশনের কাছে স্মারকলিপি প্রদান কোনো বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ নয়। এটি একটি কমিউনিটির সম্মিলিত আর্তি—রাষ্ট্র যেন তাদের কথা শোনে।

বাংলাদেশ সরকার ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রতি এটি কোনো বিরোধিতা নয়, এটি এক গভীর ভালোবাসা থেকে উঠে আসা আবেদন। প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্সের অঙ্ক নন, তারা এই দেশের সন্তান—যারা দূরে থেকেও দেশের জন্য ভাবেন, দেশের পতাকাকে সম্মানের চোখে দেখেন। ম্যানচেস্টার–সিলেট ফ্লাইট বন্ধ হলে কেবল একটি রুটই হারাবে না বাংলাদেশ; হারাবে প্রবাসীদের বিশ্বাস, ভরসা ও আবেগের একটি শক্ত বন্ধন।

এখনো সময় আছে। সিদ্ধান্ত বদলানো যায়। নর্থ ইংল্যান্ডের আকাশে লাল–সবুজের ডানাকে থামিয়ে দেবেন না। এই ফ্লাইট চালু রেখে প্রমাণ করুন—রাষ্ট্র তার মানুষকে ভুলে যায়নি। প্রবাসীদের চোখের জল নয়, তাদের স্বস্তি ও আশার কারণ হোক বাংলাদেশ সরকার।

লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২১ জানুয়ারি ২০২৬