ময়মনসিংহে গুজবের বলী পোশাকশ্রমিক দিপু, পিটিয়ে হত্যা ও মরদেহে আগুন

ময়মনসিংহে গুজবের বলী পোশাকশ্রমিক দিপু, পিটিয়ে হত্যা ও মরদেহে আগুন

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২০ ডিসেম্বর :  ময়মনসিংহের ভালুকায় এক হৃদয়বিদারক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন পোশাক কারখানার শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাস (২৭)। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তাঁকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করার পর উত্তেজিত জনতার হাতে তুলে দেন কারখানার ফ্লোর ইনচার্জ। পরে পিটিয়ে হত্যা করে তাঁর মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনায় পরিবার, সহকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

আজ শনিবার দুপুরে র‍্যাব–১৪ ময়মনসিংহ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব জানায়, সিসিটিভি ফুটেজ ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে পৃথক অভিযানে এখন পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‍্যাব এবং তিনজনকে পুলিশ।

র‍্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার সাতজন হলো—পাইওনিয়ার্স নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেডের ফ্লোর ইনচার্জ মো. আলমগীর হোসেন (৩৮), কোয়ালিটি ইনচার্জ মো. মিরাজ হোসেন আকন (৪৬), এবং শ্রমিক মো. তারেক হোসেন (১৯), মো. লিমন সরকার (২২), মো. মানিক মিয়া (২০), এরশাদ আলী (৩৯) ও নিঝুম উদ্দিন (২০)। পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার তিনজন হলেন ভালুকার আজমল হাসান (২৬), শাহিন মিয়া (১৯) এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাজমুল (২১)।

র‍্যাব জানায়, ঘটনার সূত্রপাত হয় গত বৃহস্পতিবার বিকেল চারটার দিকে। কারখানার ভেতরে কাজ করার সময় দিপু চন্দ্র দাসকে ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়। ফ্লোর ইনচার্জ তাঁকে চাকরি থেকে ইস্তফা দিতে বাধ্য করেন এবং পুলিশে সোপর্দ না করে উত্তেজিত জনতার হাতে তুলে দেন। র‍্যাব–১৪–এর অধিনায়ক নয়মুল হাসান বলেন, “পুলিশের কাছে হস্তান্তর না করে কেন তাঁকে জনতার হাতে তুলে দেওয়া হলো এবং কেন তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি—এই গুরুতর অবহেলার কারণেই সংশ্লিষ্ট কারখানার দুই কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”

র‍্যাব জানায়, ধর্ম অবমাননার অভিযোগটি অত্যন্ত অস্পষ্ট। কী বলা হয়েছিল—এ বিষয়ে কেউই সুনির্দিষ্ট কিছু বলতে পারেনি। ব্যক্তিগত শত্রুতা ছিল কি না, কিংবা ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, দিপুকে কারখানা থেকে বের করে এনে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভাজকের একটি গাছে বিবস্ত্র অবস্থায় ঝুলিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটি এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে। নিহত দিপুর ছোট ভাই অপু চন্দ্র দাস শুক্রবার ভালুকা থানায় হত্যা মামলা করেন।

র‍্যাব হেফাজতে থাকা ফ্লোর ইনচার্জ আলমগীর হোসেন দাবি করেন, কারখানার বাইরে একটি চায়ের দোকানে দিপু মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–কে নিয়ে কটূক্তি করেছেন—এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। শ্রমিকেরা তাঁকে বরখাস্তের দাবি জানান এবং কারখানার বাইরেও লোকজন জড়ো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কথা বলে দিপুকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে এরপর তাঁকে জনতার হাত থেকে রক্ষা করা যায়নি।

এদিকে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার তিনজনকে আজ আদালতে হাজির করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে পাঁচ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন।

নিহত দিপু চন্দ্র দাস প্রায় দুই বছর ধরে কোয়ালিটি সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছিলেন। তিন বছর আগে বিয়ে করা দিপুর দেড় বছর বয়সী একটি শিশুসন্তান রয়েছে। উপার্জনক্ষম একমাত্র সদস্যকে হারিয়ে পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। গতকাল ময়নাতদন্ত শেষে রাতে তাঁর সৎকার সম্পন্ন হয়।

দিপুর ভাই অপু চন্দ্র দাস বলেন, “আমার ভাই কী অপরাধ করেছে, আমরা জানি না। যদি কোনো অপরাধ করেও থাকে, তার বিচার আইনের মাধ্যমে হতে পারত। কিন্তু মিথ্যা অপবাদ দিয়ে যেভাবে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, তার বিচার চাই। একই সঙ্গে আমার ভাইয়ের স্ত্রী ও সন্তান কীভাবে বাঁচবে, সেটিও রাষ্ট্রকে দেখতে হবে।”

নিহত দিপু চন্দ্র দাস প্রায় তিন বছর আগে বিয়ে করেন। তার দেড় বছর বয়সী একটি শিশুসন্তান আছে। উপার্জনক্ষম দিপুকে হারিয়ে অথই সাগরে পড়েছে পরিবারটি। গতকাল শুক্রবার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের পর রাত ১০টার দিকে সৎকার করা হয়।

এই নির্মম হত্যাকাণ্ড আবারও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে—আইনের শাসন, শ্রমিকের নিরাপত্তা এবং গুজব ও উন্মাদনার নামে সহিংসতার ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে।