ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৩৪ ।। গর্জন ছিল দারুণ, ফল হলো করুণ
উৎসর্গ
সেইসব ইরানী বীরদের, যাঁরা পাঁচ হাজার বছের ধরে কোন অপশক্তির কাছে মাথা নত করেনি
।। গর্জন ছিল দারুণ, ফল হলো করুণ ।।

ইতিহাস মাঝে মাঝে এমন নির্মম রসিকতা করে, যা কোনো ব্যঙ্গ লেখকের পক্ষেও কল্পনা করা কঠিন। কয়েক মাস আগেও ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ভাষ্য ছিল—ইরানকে এমন শিক্ষা দেওয়া হবে, যা তারা বহু প্রজন্ম মনে রাখবে। আজ দেখা যাচ্ছে, শিক্ষা পেয়েছে অন্যরা; আর শিক্ষক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সেই ইরান, যাকে দুর্বল ও কোণঠাসা করে দেওয়ার ঘোষণা প্রতিদিন শোনা যাচ্ছিল।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বড় বড় ঘোষণা। তিনি দেয়াল তুলেছেন, বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছেন, যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আবার নতুন সংঘাতও সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু হরমুজ প্রণালির ঘটনাটি যেন তাঁকে একটি অস্বস্তিকর সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—বিশ্ব রাজনীতি সব সময় নির্বাচনী মঞ্চের বক্তৃতা মেনে চলে না।
ট্রাম্প বলেছিলেন, হরমুজ চিরদিনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে আজ জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করতে হচ্ছে। যে দেশটিকে শাস্তি দিতে যুদ্ধের পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই দেশই সমুদ্রপথের প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেতানিয়াহুর অবস্থাও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। বহু বছর ধরে তিনি পশ্চিমা বিশ্বকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে মধ্যপ্রাচ্যের সব সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু ইরান। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের একটি বড় অংশই ছিল ইরানকে বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল করে রাখা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখলে মনে হয়, যুদ্ধের ধুলোবালির ভেতর থেকে ইরান আগের চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক শক্তি হয়ে বেরিয়ে এসেছে।
একসময় মনে করা হয়েছিল, আধুনিক যুদ্ধ মানেই উন্নত যুদ্ধবিমান, বিমানবাহী রণতরী ও শত শত বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রভান্ডার। কিন্তু হরমুজের ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, কখনো কখনো কয়েক হাজার ডলারের ড্রোনও কোটি কোটি ডলারের সামরিক কৌশলকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিতে পারে। যেন এক বিশালাকৃতির হাতি হঠাৎ বুঝতে পারছে, একটি ছোট মৌমাছিও তার ঘুম নষ্ট করার ক্ষমতা রাখে।
সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে এমন এক বিশ্ব তৈরি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন দেশ নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থানকে অস্ত্রে পরিণত করার চিন্তা করবে। আজ হরমুজ, কাল মালাক্কা, পরশু অন্য কোনো প্রণালি। অর্থাৎ যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল একটি সংকট ঠেকানো, কিন্তু ফলাফল হতে পারে আরও বড় সংকটের জন্ম।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু সম্ভবত ভেবেছিলেন শক্তির প্রদর্শনই শেষ কথা। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির পুরোনো নিয়ম হলো—শক্তি গুরুত্বপূর্ণ, তবে ভৌগোলিক বাস্তবতা অনেক সময় তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। মানচিত্রের একটি সরু জলপথ কখনো কখনো শত শত যুদ্ধবিমান থেকেও বেশি ক্ষমতাবান হয়ে উঠতে পারে।
আজ বিশ্বের সামনে যে চিত্রটি ফুটে উঠছে, তা এক ধরনের রাজনৈতিক ব্যঙ্গচিত্রের মতো। একদিকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক জোট, অন্যদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত একটি দেশ। অথচ শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে বসে সবাইকে স্বীকার করতে হচ্ছে যে হরমুজের দরজার চাবি এখনো তেহরানের হাতেই।
রাজনীতিতে বিজয় সব সময় ট্যাংকের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। কখনো কখনো বিজয় মাপা হয় কে শর্ত নির্ধারণ করছে, কে দরজা খুলছে আর কে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অনুমতি চাইছে—তা দিয়ে।
হরমুজের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই পুরোনো সত্যটিকেই নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে। আর সেই স্মরণসভায় ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু হয়তো প্রধান অতিথি নন; বরং অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রধান উদাহরণ হয়ে উঠেছেন।

লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, গল্পকার ও বিশ্লেষক
লন্ডন, ২২ জুন ২০২৬