ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৪৪। । প্রজন্মের পালাবদল: সময়কাল, বৈশিষ্ট্য ও পরিবর্তনের ইতিহাস
উৎসর্গ
সময়ের স্রোতে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সব প্রজন্মের মানুষের প্রতি

প্রজন্ম সম্পর্কে জানার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। ইদানিং দেশে-বিদেশে ‘Gen Z’ প্রজন্মের কথা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা। আবার এদের নাম শুনলে অনেকে বলেন-‘এখান থেকে পালা’। কারণ এরা নাকি করে দেয়, ‘সব ঝালাপালা’। বুঝুন এবার ‘Gen Z’র ঠ্যালা। এখন ভালই চলছে এ প্রজন্মের নানান খেলা। কিন্তু অনেক পাঠকই এই ‘Gen Z’ বা অন্যান্য প্রজন্ম সম্পর্কে তেমন ওয়াকিবহাল নন। তাই অনেকে আমার কাছ থেকে জানতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের সকলের জন্য আজকের এ কলাম।
বর্তমানে কেউ কেউ একই পরিবারে চার থেকে পাঁচটি প্রজন্ম একসঙ্গে বসবাস করছেন। একই কর্মক্ষেত্রেও বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষ কাজ করছেন। ফলে যোগাযোগের ধরন, কাজের পদ্ধতি, প্রযুক্তি ব্যবহারের অভ্যাস এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পার্থক্য তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। এই পার্থক্যকে দ্বন্দ্ব হিসেবে না দেখে, সময়ের স্বাভাবিক পরিবর্তন হিসেবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ। এদের মধ্যে একজন দিনের শুরু করেন পত্রিকা পড়ে, আরেকজন টেলিভিশনের খবর দেখে, তৃতীয়জন স্মার্টফোনে অফিস করেন, আর সবচেয়ে ছোটটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে পড়াশোনা করে। একই পরিবারে থেকেও তাদের চিন্তাভাবনা, জীবনযাপন, কাজের ধরন, এমনকি পৃথিবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও ভিন্ন। কারণ, তারা ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মের মানুষ।
সমাজবিজ্ঞানীরা মানুষের জন্মসাল, বেড়ে ওঠার সামাজিক পরিবেশ, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং বিশ্ব ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর ভিত্তিতে মানুষকে বিভিন্ন প্রজন্মে ভাগ করেছেন। প্রতিটি প্রজন্মই তার সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তোলে।
সবচেয়ে পুরোনো আলোচিত প্রজন্মগুলোর একটি হলো Progressive Generation, যাদের জন্ম আনুমানিক ১৮৪৩ থেকে ১৮৫৯ সালের মধ্যে। শিল্পবিপ্লব, রেলপথের বিস্তার এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশের সময় তারা বেড়ে ওঠেন। শিক্ষা, বিজ্ঞান, শিল্পায়ন এবং সামাজিক সংস্কারের প্রতি তাদের আগ্রহ ছিল প্রবল। আধুনিক বিশ্বের অনেক ভিত্তি এই প্রজন্মের হাত ধরেই তৈরি হয়।
এরপর আসে Missionary Generation (১৮৬০–১৮৮২)। এই প্রজন্ম শিক্ষা বিস্তার, সামাজিক সংস্কার, নৈতিকতা এবং মানবকল্যাণকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিল। বিভিন্ন দেশে নাগরিক অধিকার, শিক্ষা সংস্কার এবং সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে তাদের বড় ভূমিকা ছিল।
এর পরের প্রজন্ম Lost Generation (১৮৮৩–১৯০০)। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা এই প্রজন্মকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। যুদ্ধ তাদের স্বপ্ন, বিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা বদলে দেয়। ফলে সাহিত্য, শিল্প ও দর্শনে নতুন চিন্তার জন্ম হয়। অনেকেই এই প্রজন্মকে হতাশা ও আত্মঅনুসন্ধানের প্রজন্ম বলে অভিহিত করেন।
Greatest Generation-এর জন্ম ১৯০১ থেকে ১৯২৭ সালের মধ্যে। মহামন্দা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো কঠিন সময় অতিক্রম করে তারা জীবনের মূল্য শিখেছিলেন। কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম এবং দায়িত্ববোধ ছিল এই প্রজন্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য। ইতিহাসবিদদের অনেকেই তাদের মানবসভ্যতার অন্যতম সহনশীল প্রজন্ম হিসেবে বিবেচনা করেন।
এরপর আসে Silent Generation (১৯২৮–১৯৪৫)। যুদ্ধ-পরবর্তী অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক সংকট এবং সামাজিক পরিবর্তনের মধ্যে বেড়ে ওঠায় তারা তুলনামূলকভাবে শান্ত, ধৈর্যশীল এবং নিয়মানুবর্তী হয়ে ওঠেন। পরিবারের প্রতি দায়িত্ব, সঞ্চয় এবং স্থিতিশীল জীবনের প্রতি তাদের আকর্ষণ ছিল প্রবল। মুখের কথার মূল্য, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং কর্মনিষ্ঠা এই প্রজন্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
১৯৪৬ থেকে ১৯৬৪ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া মানুষদের বলা হয় Baby Boomers। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বজুড়ে জন্মহার বেড়ে যাওয়ায় এই নামের উৎপত্তি। তারা দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন এবং কর্মজীবনে নিষ্ঠা ও নেতৃত্বকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিজের বাড়ি এবং নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাই ছিল তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
এরপর আসে Generation X (১৯৬৫–১৯৮০)। এরা একদিকে অ্যানালগ যুগ, অন্যদিকে ডিজিটাল বিপ্লব—দুই সময়ই প্রত্যক্ষ করেছেন। চিঠি, রেডিও ও ক্যাসেট থেকে শুরু করে কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও স্মার্টফোন—সবকিছুর পরিবর্তন তারা নিজের চোখে দেখেছেন। তাই তারা সহজেই নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারেন, আবার পুরোনো মূল্যবোধকেও সম্মান করেন। কাজ ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখার প্রবণতা এই প্রজন্মের অন্যতম শক্তি।
Millennials বা Generation Y (১৯৮১–১৯৯৬) হলো ইন্টারনেট ও বিশ্বায়নের প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রজন্ম। কম্পিউটার, মোবাইল ফোন এবং অনলাইন যোগাযোগের দ্রুত বিকাশ তাদের জীবনকে বদলে দিয়েছে। তারা কেবল চাকরিকে নয়, জীবনের মান, ভ্রমণ, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং নতুন অভিজ্ঞতাকেও সমান গুরুত্ব দেন। উদ্যোক্তা হওয়া, প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যবসা গড়ে তোলা এবং দূর থেকে কাজ করার সংস্কৃতি এই প্রজন্মের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় হয়।
Generation Z (১৯৯৭–২০১২) হলো প্রথম প্রকৃত ডিজিটাল প্রজন্ম। জন্মের পর থেকেই তারা ইন্টারনেট, স্মার্টফোন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে পরিচিত। দ্রুত তথ্য গ্রহণ, ভিডিওভিত্তিক শিক্ষা, অনলাইন আয় এবং বৈশ্বিক যোগাযোগ তাদের কাছে স্বাভাবিক বিষয়। একই সঙ্গে পরিবেশ, মানবাধিকার, বৈচিত্র্য এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তারা আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন। এ কারণে তাদের অনেক সময় "Digital Natives" বা "ডিজিটাল যুগের সন্তান" বলা হয়। ২০২৬ সালে তাদের বয়স আনুমানিক ১৪ থেকে ২৯ বছর।
তারা দীর্ঘ লেখা পড়ার চেয়ে ছোট ভিডিও, ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট ও দ্রুত তথ্য গ্রহণে বেশি অভ্যস্ত। তবে এর ফলে মনোযোগ ধরে রাখার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। Gen Z প্রচলিত নিয়ম ও কর্তৃত্বকে সহজে মেনে নেয় না। তারা জানতে চায়—কেন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, কেন কোনো ব্যবস্থা পরিবর্তন হচ্ছে না। তারা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, নিজের পরিচয়, মত প্রকাশের অধিকার এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়।
আগের প্রজন্ম যেখানে সভা, মিছিল ও প্রচলিত সংগঠনের ওপর নির্ভর করত, Gen Z সেখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে দ্রুত মানুষকে সংগঠিত করতে পারে। একটি পোস্ট, ভিডিও বা হ্যাশট্যাগ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
Baby Boomers যেখানে স্থায়িত্ব ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যকে গুরুত্ব দিয়েছেন, Gen X বাস্তববাদী ও স্বাধীন হয়েছে, Millennials প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে—Gen Z সেখানে পরিবর্তনকে দ্রুত দাবি করে। তাদের কাছে "একদিন ভবিষ্যৎ আসবে" নয়, বরং "পরিবর্তন এখনই দরকার"—এই মনোভাব বেশি।
বাংলাদেশেও Gen Z তরুণরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, শিক্ষা, ব্যবসা, সংস্কৃতি ও সামাজিক আন্দোলনে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া শিশুদের বলা হয় Generation Alpha। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট ডিভাইস, ভার্চুয়াল শিক্ষা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি তাদের শৈশবের অংশ। ভবিষ্যতে এই প্রজন্মের শিক্ষা, কর্মজীবন এবং সামাজিক সম্পর্ক আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অনেক দেশে শিক্ষিত তরুণদের সামনে কর্মসংস্থানের সংকট, বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেক তরুণ মনে করছে, পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো তাদের সমস্যা সমাধান করতে পারছে না। তারা স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নতুন নেতৃত্ব দাবি করছে।
সবশেষে এসেছে Generation Beta। ২০২৫ সাল থেকে জন্ম নেওয়া এই প্রজন্ম এখনো একেবারেই শিশু। এখন চলছে এই প্রজন্মের যুগ। ধারণা করা হচ্ছে, তারা এমন এক পৃথিবীতে বড় হবে যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবট, স্বয়ংচালিত যানবাহন, স্মার্ট সিটি, উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং স্বয়ংক্রিয় কর্মব্যবস্থা দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠবে। তবে এ প্রজন্ম সম্পর্কে এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় আসেনি; তাদের বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা এখনও চলছে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় বর্তমানে প্রশাসন, রাজনীতি, শিক্ষা ও ব্যবসার বড় অংশ পরিচালনা করছেন বেবি বুমার ও জেন এক্স প্রজন্মের মানুষ। অন্যদিকে দেশের কর্মশক্তির বড় অংশ মিলেনিয়াল ও জেনারেশন জেড। আগামী দুই দশকে আলফা ও বিটা প্রজন্মই দেশের প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং নেতৃত্বের নতুন রূপ নির্ধারণ করবে।
ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি, কোনো প্রজন্মই অন্য প্রজন্মের চেয়ে ভালো বা খারাপ নয়। প্রত্যেক প্রজন্মই তার সময়ের বাস্তবতার প্রতিফলন। কেউ যুদ্ধের পৃথিবী দেখেছে, কেউ শিল্পবিপ্লব, কেউ কম্পিউটারের আগমন, কেউ ইন্টারনেটের বিস্ফোরণ, আর কেউ জন্মের পর থেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে জীবনের অংশ হিসেবে পাচ্ছে। সময় বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়, সমাজ বদলায়—আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায় মানুষের প্রজন্মও। এই বৈচিত্র্যকে বোঝা এবং সম্মান করাই আগামী পৃথিবীতে সুন্দর সহাবস্থানের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ৩১ জুলাই ২০২৬