কলিকালের কলধ্বনি ।। ৬৩ ।। লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের নির্বাচন: ফোন, ভোট আর কিছু না-বলা কথা

কলিকালের কলধ্বনি ।।  ৬৩ ।।  লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের নির্বাচন: ফোন, ভোট আর কিছু না-বলা কথা

কলিকালের কলধ্বনি ।। ৬৩ ।।


লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের নির্বাচন: ফোন, ভোট আর কিছু না-বলা কথা

উৎসর্গ


‘লন্ডন-বাংলা প্রেসক্লাব’-এর ৩৩৫ জন সদস্যকে

আগামীকাল রাত পোহালেই ব্রিটেনের বাংলা সাংবাদিকদের মর্যাদাপূর্ণ সংগঠন ‘লন্ডন-বাংলা প্রেসক্লাব’-এর দ্বিবার্ষিক সম্মেলন ও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রেসক্লাবের নির্বাচন এলেই একটা পরিচিত দৃশ্য চোখে পড়ে—ফোন বেজে ওঠে বেশি, পরিচিতির পরিধি হঠাৎ বড় হয়ে যায়, এবং পুরোনো সম্পর্কগুলো নতুন করে সক্রিয় হয়। নির্বাচন মানেই এমন—এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। তবে এবারের নির্বাচনের আগে কিছু বিষয় আলাদা করে বলা প্রয়োজন বলে মনে করছি।

গত কয়েক দিনে অনেক ফোন এসেছে—দিনে-রাতে, কখনো একাধিকবার। বাস্তবতা হলো, সব ফোন ধরা সম্ভব হয়নি। এতে কেউ কষ্ট পেলে দুঃখ প্রকাশ করাই স্বাভাবিক। তবে ফোন না ধরার পেছনে কোনো রহস্য নেই, নেই কোনো অবহেলা বা পক্ষপাত। জীবনের চেনা ব্যস্ততাই এর একমাত্র কারণ। লন্ডনের জীবন এমন—কখনো দৌড়ে ট্রেন ধরতে হয়, কখনো বাজার-সদাই, কখনো সন্তানদের জন্য সময় দিতে হয়, আবার কখনো পড়াশোনা বা লেখালেখির ভেতর ডুবে থাকতে হয়। ব্যস্ততার এই বহুরূপী বাস্তবতায় অনেক সময় ফোন ধরা পড়ে না। আর আমি সব সময় ফোনের কাছে থাকি না।

বিভিন্ন বিষয়ে গ্রন্থ লেখা ও গবেষণার জন্য পড়াশোনা ও লেখালেখিতে সময় ব্যয় করতে হয়। এ ছাড়া ফেসবুকে চোখ রাখার বা সময় নষ্ট করার ধৈর্যও আমার নেই। ঘন ঘন সেলফি তুলে পোস্ট করার প্রবণতাও নেই। এছাড়া ধরাবাঁধা বা একই গতানুগতিক বিষয়ে আলোচনা করে সময় নষ্ট করার মানসিকতাও নেই।

একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকার। ক্লাবের নির্বাচন এলেই অনেকে ধরে নেন—ফোন না ধরার মানেই অজ্ঞতা বা দূরত্ব। বাস্তবে তা নয়। দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা ও সামাজিক পরিসরে থাকার কারণে মানুষ, সম্পর্ক ও অবস্থান সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি হয়ে যায়। আমি আমার পরিবারের পর প্রেসক্লাবের সবাইকে আমার পরিবার বলেই মনে করি।

অনেকে হয়তো শুনে অবাক হবেন।  আমাকে ক্লাবের আড্ডায় পান না বলে বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। আড্ডায় না আসার বহুবিধ কারণ আছে—এখন তা না-ই বলি। পুরো ব্রিটেনে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি ক্লাব সদস্যই আমার প্রাণের মানুষ, চেনা হোক বা অচেনা। কারণ আমি আর কোনো সংগঠনের সদস্য নই। সব সময়ই এ ক্লাবের সদস্যদের সঙ্গে যুক্ত আছি এবং থাকতে ভালোবাসি। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে। আমার ঘরনী বাঙালি নন। মাঝে মাঝে তিনি রাগ করলে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘তুমি যে আমাকে এখন ধমক দিচ্ছো, আমি কিন্তু তোমার প্রেসক্লাবের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে লিখে সব সাংবাদিকের কাছে বিচার চাইছি।’ তবে দুই থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তার রাগ নেমে আসে। আর সবাইকে অভিযোগ করার সুযোগ পান না! রাগের সময় তিনি বলেন না—আমি তোমার ভাই, বড় বোন বা ভাতিজির কাছে বিচার দিচ্ছি, বলেন প্রেসক্লাবে বলতে যাচ্ছি। বিষয়টি আমার কাছে বেশ মজার লাগে। সুতরাং কে, কোথায়, কোন পদে, কার দলে দাঁড়ালেন এ সব কোন বিষয় না। সবাইকে আমি কাছের মানুষ মনে করি। নতুন করে আর বার বার ফোন করে জানান দেয়ার দরকার হয় না। ক্লাবের অফিসে নিয়মিত যাওয়া না হলেও খবর রাখা যায়, পর্যবেক্ষণ করা রাখা হয় প্রাণের টানে। 

তবে প্রতি নির্বাচনে একটি বিষয় আমাকে ভাবায়। অনেক পরিচিত মুখ প্রার্থী হন, কিন্তু পদে দাঁড়ানোর আগে কখনো জানতে চান না—এসব পদে আর কেউ আগ্রহী কি না, বা সিনিয়রদের মতামত কী। হয়তো অনেকে ভাবেন ইলেকশনে দাঁড়িয়ে যাবো। ক্লাবের জনৈক ডাকসাইটে প্রার্থী মজা করে বললেন, ‘এসব চুপি চুপি করতে হয়। সবাইকে বললে তো হয় না বস’। মজার ছলে তাহলে কি তিনি আসল কথাটাই বলে ফেললেন? মানে, আমিরা আর মামুরাই বছরের পর বছর ইলেকশন করেই যাবো, আর আমাদের মতো আপাদমস্তক লেখক-সাংবাদিকরা শুধু ভোট দিয়েই যাবো কেয়ামত পর্যন্ত?  আমার ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে দাঁড়ানোর ইচ্ছে বা সময়, আগ্রহ নেই আপাতত। এমনকি মোটা অঙ্কের ফি দিয়ে আগামী দুই বছর এত সময় দেবার মতো সময়ও হাতে থাকে না। তবে অতি ক্লোজদের পরামর্শ, আলাপ বা মতবিনিময়ের সংস্কৃতি থাকলে নির্বাচন আরও সমৃদ্ধ হতে পারত—এটাই আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধি।

আরেকটি বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো—ভোট চাওয়ার ধরন। ফোনে অনেক অনুরোধ আসে, যা স্বাভাবিক। তবে কখনো কখনো বিষয়টি অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে, বিশেষ করে যখন দেখা যায়—গত দুই বছরে যোগাযোগ ছিল না, অথচ নির্বাচনের সপ্তাহে সম্পর্ক হঠাৎ খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে যায়। ফোনে কল দেখে মনে হয় এটা বোধ হয় দেশের এমপি ইলেকশন চলছে! বেশ মজা পাই কিন্তু। এতে কারও দোষ দিচ্ছি না। তবে নির্বাচনের পরও যদি মাঝে মাঝে এই যোগাযোগ থাকে, সেটাই হবে সুস্থ সংস্কৃতি।

সবচেয়ে জটিল জায়গা তৈরি হয় তখনই, যখন একই পদে দু’জনই প্রিয় মানুষ হন। দু’জনকেই সম্মান করি, দু’জনের সঙ্গেই সম্পর্ক আছে। এই অবস্থায় ফোনে প্রতিশ্রুতি দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। কাউকে “শুধু আপনাকেই দেবো” বলা মানে অন্য একজনের প্রতি অবিচার করা, ইলেকশনের আগেই মন ভেঙে দেওয়া। তাই নীরব থাকা অনেক সময় সবচেয়ে নিরাপদ ও ন্যায্য অবস্থান হয়ে ওঠে।

এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে দোষারোপ করা নয়। নির্বাচন মানেই প্রচারণা, ফোন, অনুরোধ—সবই এর অংশ। আবার ব্যস্ততার কারণে ফোন না ধরা—সেটাও জীবনেরই অংশ। দুই দিক থেকেই বিষয়গুলো স্বাভাবিক। শুধু ভুল বোঝাবুঝির জায়গাগুলো পরিষ্কার করতে এই লেখা।

ভোটের দিন ইনশাল্লাহ দেখা হবে। যাকে ভোট দেওয়ার, তাকেই দেওয়া হবে—এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। ফোন ধরা না-পড়া দিয়ে সম্পর্ক বা সম্মান মাপার সুযোগ নেই। নির্বাচন শেষ হলে আমরা সবাই আবার একই ক্লাবের মানুষ—এই সত্যটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

নির্বাচন হোক সুন্দর, মর্যাদাপূর্ণ এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ—এই কামনা রইল।

লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬