কলিকালের কলধ্বনি ।। ৬২ ।। নীরব দর্শকের শহরে এক অটোরিকশাচালকের মৃত্যু, নাকি মানবতার মৃত্যু ?
কলিকালের কলধ্বনি ।। ৬২ ।।
নীরব দর্শকের শহরে এক অটোরিকশাচালকের মৃত্যু, নাকি মানবতার মৃত্যু ?
উৎসর্গ
বাংলাদেশের খেঁটে খাওয়া সব শ্রমজীবীর প্রতি

খোরশেদ আলমের (৪০) কোনো বড় পরিচয় ছিল না। তিনি কোনো রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তি ছিলেন না, কোনো অপরাধের ইতিহাসও নেই। তিনি ছিলেন একজন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক। প্রতিদিনের মতোই সেদিন রাতে রাস্তায় ছিলেন, জীবিকার প্রয়োজনে। কিন্তু সেই রাতেই, স্বাধীন বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী বলে পরিচিত, চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় গত ২২ জানুয়ারি রাত ১১টা ১০ থেকে ১১টা ৪০ মিনিটের মধ্যে আমিন জুট মিল–সংলগ্ন মিড্যা পাড়ার একটি গলিতে, প্রকাশ্য রাস্তায় তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো। আরও ভয়াবহ যে দৃশ্যটি—চারপাশে মানুষ ছিল। অনেক মানুষ। কেউ এগিয়ে আসেনি।
এই খবরটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিবরণ নয়। এটি আমাদের সমাজের একটি নির্মম সত্য ঘটনা। যেখানে তিনজন অমানুষ, একজন নিরীহ রিক্সাচালককে লাঠি দিয়ে আঘাত করে, মাটিতে ফেলে দেয়, নিস্তেজ না হওয়া পর্যন্ত মারতে থাকে—আর আশপাশের মানুষ দাঁড়িয়ে দেখে। ভিডিওতে দেখা যায়, খোরশেদের শরীর ধীরে ধীরে নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে যারা দাঁড়িয়ে ছিল, তারা কি বুঝতে পারেনি—একজন মানুষ মারা যাচ্ছে?
আমরা প্রায়ই বলি, “আইনের শাসন নেই”, “সমাজ নষ্ট হয়ে গেছে”, “মানুষ আগের মতো নেই”। কিন্তু এই ঘটনাটি আরও গভীর প্রশ্ন তোলে—আমরা নিজেরা কী হয়ে গেছি? নাকি সমষ্ঠিগতভাবে পুরো দেশের মানুষের বিবেক পঁচে গেছে?
খোরশেদের সঙ্গে হত্যাকারীদের কোনো পূর্বশত্রুতা ছিল না। কোনো বড় অপরাধও নয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মুখের দুর্গন্ধ নিয়ে কথা-কাটাকাটি। একটি তুচ্ছ, অবিশ্বাস্য রকমের তুচ্ছ বিষয় থেকে জন্ম নিল মৃত্যু। কিন্তু মৃত্যুর চেয়েও বড় ট্র্যাজেডি হলো—এই হত্যাকাণ্ডটি একা একা ঘটেনি। এটি ঘটেছে দর্শকের সামনে।
আমরা হয়তো ভাবি, “আমি গেলে কী হতো?”, “ওরা যদি আমাকেও মারত?”, “এটা পুলিশের কাজ”—এই যুক্তিগুলো খুব পরিচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সবাই যদি এভাবেই ভাবি, তাহলে মানুষ মরবে না তো কে বাঁচাবে?
বাংলাদেশে ‘গণপিটুনি’ শব্দটি এখন প্রায় স্বাভাবিক হয়ে গেছে। সংবাদে পড়ি, দেখি, শিউরে উঠি—তারপর ভুলে যাই। কিন্তু প্রতিটি গণপিটুনির পেছনে একটি বড় অপরাধ লুকিয়ে থাকে, যা আদালতে ওঠে না—নীরব দর্শকের অপরাধ। যারা হাত তোলে না, কিন্তু হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
খোরশেদ আলমের পরিবার আজ শোকে স্তব্ধ। হয়তো তাঁর সন্তান অপেক্ষা করছে—বাবা কখন ফিরবে? হয়তো স্ত্রীর মনে হচ্ছে, একটু দেরি হলেই বা কী—ফিরে তো আসার কথা ছিল। এই অপেক্ষার কোনো শেষ নেই। আর যারা দাঁড়িয়ে দেখেছিল, তারা হয়তো সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে ভাত খেয়েছে, ঘুমিয়েছে। কিন্তু তারা কি জানে, তারা একসঙ্গে একটি মানুষকে মরতে দিয়েছে?
আইন অবশ্যই তার কাজ করবে—কয়েকজন ধরা পড়বে, মামলা হবে। কিন্তু আইন কি আমাদের বিবেককে জাগাতে পারবে? যে সমাজে মানুষ মানুষের মৃত্যুকে ‘দেখার বিষয়’ হিসেবে নেয়, সেখানে শুধু আইন দিয়ে কী হবে?
আমরা যদি আজও না বুঝি যে নীরব থাকা মানেই পক্ষ নেওয়া—তাহলে আগামী খোরশেদ আলম হয়তো আরও কাছের কেউ হবে। হয়তো কোনো পরিচিত মুখ। হয়তো আমি, আপনি, কিংবা আমাদের সন্তান।
রাস্তায় কেউ মার খেলে এগিয়ে যাওয়া শুধু সাহসের বিষয় নয়, এটি নাগরিক দায়িত্ব। হয়তো একা গিয়ে মার ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু চিৎকার করা যায়, মানুষ ডাকা যায়, পুলিশে ফোন করা যায়। কিছু না করে দাঁড়িয়ে থাকা—এটাই সবচেয়ে সহজ পথ। আর সবচেয়ে ভয়ংকর পথও।
যে রাস্তায় মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে, মানবতা সেখানে ধীরে ধীরে মরে যায়। খোরশেদ আলম শুধু একজন অটোরিকশাচালক নন—তিনি আমাদের সমাজের বিবেকের পরীক্ষায় একটি ব্যর্থতার নাম। প্রশ্ন হলো, এই ব্যর্থতা থেকে আমরা কিছু শিখব কি না। নাকি পরের ভিডিওটির অপেক্ষায় থাকব?
লেখক: সম্পাদক, কলাম লেখক, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬