তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল
স্পনসর ভিসায় নির্যাতনের শিকার বাংলাদেশিদের জন্য নতুন সুযোগ
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৪ অক্টোবর:
ব্রিটেনে স্পনসর ভিসায় এসে নিয়োগকর্তার নির্যাতন, আর্থিক শোষণ কিংবা জোরপূর্বক শ্রমের শিকার হওয়া বিদেশি কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তন এনেছে সরকার। নতুন নিয়মে আধুনিক দাসত্বের শিকার হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পাওয়া স্কিলড ওয়ার্কার ভিসাধারীরা তাঁদের নির্দিষ্ট স্পনসর নিয়োগকর্তার বাইরে অন্য প্রতিষ্ঠানে বৈধভাবে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে চাকরি হারালে ভিসা বাতিল হয়ে যাওয়ার ভয়ে নির্যাতনমূলক কর্মপরিবেশে আটকে থাকার ঝুঁকি কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া এই পরিবর্তনের বিষয়ে ৯ অক্টোবর ঘোষণা দেয় যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নতুন ব্যবস্থায় যোগ্য হিসেবে স্বীকৃত কর্মীরা তাঁদের বিদ্যমান ভিসার অবশিষ্ট মেয়াদে অন্য নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করতে পারবেন। তাঁরা চাইলে স্বনিয়োজিত কাজও করতে পারবেন। তবে পেশাদার খেলোয়াড় বা ক্রীড়া প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে কেয়ার সেক্টরসহ বিভিন্ন পেশায় স্পনসর ভিসা নিয়ে যুক্তরাজ্যে আসা কর্মীদের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কিছু অসাধু নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে কর্মীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায়, প্রতিশ্রুত কাজ না দেওয়া, বেতন আটকে রাখা, ভিসা বাতিলের ভয় দেখানো কিংবা অন্যায় শর্তে কাজ করানোর অভিযোগ রয়েছে।
নতুন নিয়মের ফলে নির্যাতনের শিকার কর্মীদের জন্য নিয়োগকর্তার ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর একটি আইনি পথ তৈরি হয়েছে। তবে প্রত্যেক কর্মী স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই সুবিধা পাবেন না। নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে।
কী পরিবর্তন এনেছে ব্রিটিশ সরকার?
সাধারণত স্কিলড ওয়ার্কার ভিসায় যুক্তরাজ্যে কাজ করার অনুমতি নির্দিষ্ট স্পনসর, চাকরি ও ভিসার শর্তের সঙ্গে যুক্ত থাকে। কর্মী অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যেতে চাইলে সাধারণত নতুন অনুমোদিত স্পনসর এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নতুন চাকরির জন্য ভিসা পরিবর্তনের আবেদন করতে হয়।
এই নির্ভরশীলতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসাধু নিয়োগকর্তার জন্য কর্মীকে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ তৈরি করে। কর্মীকে বলা হতে পারে, চাকরি ছেড়ে দিলে তাঁর ভিসা বাতিল হয়ে যাবে, তিনি আর যুক্তরাজ্যে থাকতে পারবেন না কিংবা দেশে ফেরত যেতে বাধ্য হবেন।
এমন পরিস্থিতিতে কর্মী অভিযোগ করতে ভয় পান। চাকরি ছেড়ে দিলে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া, বাসস্থান হারানো এবং পরিবারের কাছে পাঠানোর অর্থের ব্যবস্থা করতে না পারার আশঙ্কাও থাকে।
নতুন নিয়মে আধুনিক দাসত্বের শিকার হিসেবে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় স্বীকৃতি পাওয়া যোগ্য স্কিলড ওয়ার্কারদের বিদ্যমান ভিসার অবশিষ্ট সময়ের জন্য কাজের শর্ত শিথিল করা যেতে পারে। এর ফলে তাঁরা নির্দিষ্ট স্পনসর থেকে মুক্ত হয়ে অন্য নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করতে পারবেন।
অর্থাৎ, নির্যাতনকারী নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেই যে কর্মীকে সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাজ্য ছেড়ে চলে যেতে হবে, এমন নয়।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখতে হবে: নতুন নিয়মটি নির্যাতনের শিকার হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত; কেবল নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ বা চাকরির অসন্তোষ থাকলেই এটি প্রযোজ্য হবে না।
কী ধরনের নির্যাতন বা শোষণের শিকার হলে সাহায্য চাইবেন?
সব ধরনের কর্মক্ষেত্রের সমস্যা আধুনিক দাসত্ব হিসেবে বিবেচিত হয় না। তবে গুরুতর শ্রম-শোষণ, জোরপূর্বক শ্রম, হুমকি, প্রতারণা কিংবা কর্মীকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো পরিস্থিতি থাকলে বিষয়টি বিশেষজ্ঞ সংস্থার কাছে জানানো উচিত।
বাংলাদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে যেসব পরিস্থিতি সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন, তার মধ্যে রয়েছে—
১. চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রতারণা
বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় কোনো এজেন্ট বা নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ভালো বেতন, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও নিয়মিত কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল অর্থ নিয়েছে। যুক্তরাজ্যে আসার পর দেখা গেল, প্রতিশ্রুত চাকরি নেই, কাজ দেওয়া হচ্ছে না কিংবা বেতন থেকে অন্যায়ভাবে অর্থ কেটে নেওয়া হচ্ছে।
২. ভিসা সচল রাখার নামে টাকা আদায়
নিয়োগকর্তা কর্মীকে বলছেন, প্রতি মাসে অতিরিক্ত টাকা দিতে হবে, অন্যথায় স্পনসরশিপ বন্ধ করে দেওয়া হবে। বিনিময়ে কোনো প্রকৃত কাজ দেওয়া হচ্ছে না, অথবা কর্মীকে অস্বাভাবিক আর্থিক চাপে রাখা হচ্ছে।
৩. বেতন আটকে রাখা বা গুরুতর আর্থিক শোষণ
কাজ করিয়েও বেতন না দেওয়া, প্রতিশ্রুত পারিশ্রমিকের তুলনায় অত্যন্ত কম টাকা দেওয়া কিংবা ভয় দেখিয়ে বেতনের বড় অংশ আদায় করার মতো ঘটনা ঘটলে প্রমাণসহ অভিযোগ করা উচিত।
৪. ভিসা বাতিলের ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ
কর্মীকে বলা হচ্ছে, নিয়োগকর্তার অন্যায় নির্দেশ না মানলে তাঁর ভিসা বাতিল করে দেওয়া হবে, তাঁকে গ্রেপ্তার করানো হবে কিংবা দেশে ফেরত পাঠানো হবে।
৫. জোর করে কাজ করানো বা স্বাধীনতা সীমিত করা
হুমকি, ভয়ভীতি, প্রতারণা কিংবা অন্য কোনো নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কর্মীকে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। কর্মী চাকরি ছাড়তে বা নিজের পরিস্থিতি সম্পর্কে বাইরের কাউকে জানাতে ভয় পাচ্ছেন।
এসব ঘটনার কোনোটি ঘটলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে আধুনিক দাসত্ব প্রমাণিত হয় না। তবে পরিস্থিতি গুরুতর হলে বিশেষজ্ঞ সংস্থার পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। অভিযোগের জন্য সব ধরনের প্রমাণ আগে থেকেই হাতে থাকা বাধ্যতামূলক নয়।
বাংলাদেশিরা কোথায় অভিযোগ করবেন?
যুক্তরাজ্যে নির্যাতন বা শ্রম-শোষণের শিকার কর্মীদের জন্য একাধিক সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা সংস্থা রয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী নিচের সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
১. মডার্ন স্লেভারি অ্যান্ড এক্সপ্লয়টেশন হেল্পলাইন
সম্ভাব্য আধুনিক দাসত্ব, জোরপূর্বক শ্রম, মানব পাচার কিংবা গুরুতর শ্রম-শোষণের বিষয়ে পরামর্শ পেতে যোগাযোগ করা যায়:
ফোন: 08000 121 700
এই হেল্পলাইনটি দাতব্য সংস্থা Unseen পরিচালনা করে। সম্ভাব্য ভুক্তভোগী, তাঁদের পরিচিতজন কিংবা সাধারণ মানুষ পরিস্থিতি সম্পর্কে পরামর্শ চাইতে পারেন।
হেল্পলাইনের ওয়েবসাইটে অনলাইনেও উদ্বেগের কথা জানানো যায়।
ওয়েবসাইট: https://www.modernslaveryhelpline.org/
বর্তমানে হেল্পলাইনটি সাময়িকভাবে প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকার কথা জানিয়েছে। সময়সূচি পরিবর্তিত হতে পারে। তাৎক্ষণিক বিপদে থাকলে হেল্পলাইনের অপেক্ষা না করে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করতে হবে।
২. দ্য স্যালভেশন আর্মি
আধুনিক দাসত্বের সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থায় পাঠানোর ক্ষেত্রে স্যালভেশন আর্মি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ফোন: 0800 808 3733
সংস্থাটি পরিস্থিতি বুঝে উপযুক্ত সহায়তা ও পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে নির্দেশনা দিতে পারে। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে সম্ভাব্য প্রাপ্তবয়স্ক ভুক্তভোগীদের জন্য ন্যাশনাল রেফারেল মেকানিজমে (NRM) রেফারেলের পথ সম্পর্কেও তারা সহায়তা করতে পারে।
ওয়েবসাইট: https://www.salvationarmy.org.uk/
৩. ওয়ার্ক রাইটস সেন্টার
ওয়ার্ক রাইটস সেন্টার অভিবাসী কর্মীদের কর্মসংস্থান ও অভিবাসনসংক্রান্ত অধিকার নিয়ে কাজ করে। স্কিলড ওয়ার্কার ভিসায় শোষণের শিকার হলে নতুন নিয়মের যোগ্যতা, এনআরএম প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে তাদের প্রকাশিত নির্দেশিকা কাজে আসতে পারে।
বিশেষ করে যাঁরা বুঝতে পারছেন না তাঁদের পরিস্থিতি আধুনিক দাসত্বের আওতায় পড়তে পারে কি না, কিংবা কীভাবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রক্রিয়া শুরু করবেন, তাঁদের জন্য এটি একটি প্রাসঙ্গিক তথ্যসূত্র।
ওয়েবসাইট: https://www.workrightscentre.org/immigration-rights/skilled-worker-victims-of-modern-slavery/
তবে প্রত্যেক সংস্থা প্রত্যেক ব্যক্তিকে সরাসরি আইনি প্রতিনিধিত্ব দিতে পারে না। যোগাযোগের সময় নিজের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে কী ধরনের সহায়তা পাওয়া যাবে, তা জেনে নেওয়া উচিত।
৪. পুলিশ
কোনো কর্মী তাৎক্ষণিক বিপদে থাকলে, শারীরিক হামলার শিকার হলে, আটকে রাখা হলে কিংবা গুরুতর অপরাধের আশঙ্কা থাকলে জরুরি নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করা উচিত।
জরুরি নয়, এমন অপরাধের বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ১০১ নম্বর ব্যবহার করা যায়।
তবে সব ধরনের চাকরিসংক্রান্ত বিরোধের জন্য পুলিশের কাছে যাওয়া প্রয়োজন হয় না। পরিস্থিতির ধরন অনুযায়ী শ্রম অধিকারবিষয়ক সংস্থা, আধুনিক দাসত্বের সহায়তা সংস্থা বা আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
৫. গ্যাংমাস্টার্স অ্যান্ড লেবার অ্যাবিউজ অথরিটি
গ্যাংমাস্টার্স অ্যান্ড লেবার অ্যাবিউজ অথরিটি (GLAA) নির্দিষ্ট শ্রমখাতে শ্রমিকদের শোষণ ও অবৈধ শ্রম সরবরাহসংক্রান্ত বিষয় নিয়ে কাজ করে।
ফোন: 0800 432 0804
কর্মী সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদার বা নিয়োগকর্তার মাধ্যমে গুরুতর শ্রম-শোষণের শিকার হলে তাঁদের কাছে তথ্য দেওয়া যেতে পারে। তবে সব ধরনের কর্মসংস্থানসংক্রান্ত অভিযোগ GLAA-এর এখতিয়ারে পড়ে না।
ওয়েবসাইট: https://www.gla.gov.uk/
নতুন নিয়মের সুবিধা পেতে কী করতে হবে?
নতুন সুবিধাটি পেতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কর্মীকে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আধুনিক দাসত্বের শিকার হিসেবে শনাক্ত ও স্বীকৃত হতে হবে।
এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ন্যাশনাল রেফারেল মেকানিজম (NRM)। এটি যুক্তরাজ্যে আধুনিক দাসত্ব ও মানব পাচারের সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের শনাক্তকরণ, মূল্যায়ন এবং সহায়তার জন্য ব্যবহৃত সরকারি ব্যবস্থা।
একজন সম্ভাব্য ভুক্তভোগী সাধারণত নিজে সরাসরি এনআরএমে রেফারেল জমা দিতে পারেন না। তাঁকে একজন অনুমোদিত ফার্স্ট রেসপন্ডার সংস্থার মাধ্যমে রেফার হতে হয়।
ফার্স্ট রেসপন্ডারের মধ্যে পুলিশ, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অনুমোদিত কিছু দাতব্য সংস্থা থাকতে পারে।
একজন কর্মী নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন:
প্রথম ধাপ: নিরাপদ জায়গা থেকে সাহায্য চান।
নিয়োগকর্তা যদি হুমকি দেন বা কর্মীর নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে প্রথমে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রয়োজন হলে পুলিশ বা আধুনিক দাসত্ববিষয়ক হেল্পলাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপ: নিজের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করুন।
কী ধরনের কাজের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কী ঘটেছে, কত টাকা নেওয়া হয়েছে, কী ধরনের হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং কর্মী কেন চাকরি ছাড়তে ভয় পাচ্ছেন—এসব তথ্য যতটা সম্ভব স্পষ্টভাবে জানাতে হবে।
তৃতীয় ধাপ: এনআরএমে রেফারেলের বিষয়ে কথা বলুন।
সংশ্লিষ্ট ফার্স্ট রেসপন্ডারকে জিজ্ঞাসা করুন, আপনার পরিস্থিতি এনআরএমে রেফার করার উপযুক্ত কি না। যোগ্য হলে রেফারেলের পর আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।
চতুর্থ ধাপ: চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিষয়টি বুঝুন।
এনআরএমে রেফার হওয়া এবং আধুনিক দাসত্বের শিকার হিসেবে চূড়ান্ত স্বীকৃতি পাওয়া এক বিষয় নয়। নতুন নিয়মে বিশেষ সুবিধা পেতে সাধারণত ইতিবাচক Conclusive Grounds সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
পঞ্চম ধাপ: ভিসা ও কাজের অনুমতি সম্পর্কে নিশ্চিত হন।
শুধু অভিযোগ করেছেন বা এনআরএমে রেফার হয়েছেন বলে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করা যাবে—এমন নয়। নতুন নিয়মের শর্ত পূরণ হয়েছে কি না এবং কাজের অনুমতির পরিবর্তন কার্যকর হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে।
এনআরএম সম্পর্কে সরকারি নির্দেশিকা পাওয়া যাবে এখানে:
https://www.gov.uk/government/publications/human-trafficking-victims-referral-and-assessment-forms
আগে থেকেই স্বীকৃতি পেয়েছেন? তাঁদের কী করণীয়?
নতুন নিয়মটি ৮ অক্টোবর ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে। তবে যাঁরা এর আগেই আধুনিক দাসত্বের শিকার হিসেবে ইতিবাচক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পেয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া কিছুটা আলাদা হতে পারে।
ওয়ার্ক রাইটস সেন্টারের প্রকাশিত নির্দেশিকা অনুযায়ী:
- যাঁরা ৮ অক্টোবরের পরে ইতিবাচক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাবেন, তাঁদের ক্ষেত্রে UK Visas and Immigration (UKVI) থেকে বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে।
- যাঁরা ৮ অক্টোবরের আগে ইতিবাচক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পেয়েছেন এবং সেটি তাঁদের বর্তমান স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার মেয়াদকালে দেওয়া হয়েছিল, তাঁরা
nrm@modernslavery.gov.ukঠিকানায় ইমেইল করে নিজেদের NRM রেফারেন্স নম্বর জানাতে পারেন। - যাঁরা পরে নতুন স্পনসর নিয়ে নতুন স্কিলড ওয়ার্কার ভিসা পেয়েছেন, তাঁরা এই নির্দিষ্ট সুবিধার আওতায় পড়বেন না বলে নির্দেশিকায় উল্লেখ রয়েছে।
এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ যোগ্যতা নির্ধারণে সিদ্ধান্ত পাওয়ার তারিখ এবং বর্তমান ভিসার ইতিহাস প্রাসঙ্গিক হতে পারে। নিজের ক্ষেত্রে কীভাবে নিয়মটি কার্যকর হবে, তা নিশ্চিত না করে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করা উচিত নয়।
ভিসা বাতিলের ভয় দেখালে কী করবেন?
কোনো স্পনসর নিয়োগকর্তা কর্মীকে শোষণ করে থাকলে এবং একই সঙ্গে ভিসা বাতিলের ভয় দেখালে বিষয়টি গুরুতরভাবে নেওয়া উচিত।
তবে কয়েকটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে।
প্রথমত, স্পনসর প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল হওয়া এবং কর্মীর ভিসা সঙ্গে সঙ্গে বাতিল হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়।
দ্বিতীয়ত, নিয়োগকর্তা স্পনসরশিপ প্রত্যাহার করলে বা চাকরি শেষ হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্মীর অভিবাসন-অনুমতি নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী কর্মীকে নতুন স্পনসর খোঁজা বা অন্য কোনো উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সময় দেওয়া হতে পারে।
তৃতীয়ত, নতুন নিয়মে যোগ্য হিসেবে স্বীকৃত আধুনিক দাসত্বের ভুক্তভোগীদের জন্য নির্দিষ্ট স্পনসরের বাইরে কাজের সুযোগ রয়েছে। তবে এটি সবার জন্য প্রযোজ্য সাধারণ নিয়ম নয়।
চতুর্থত, নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেই আইএলআর বা স্থায়ী বসবাসের অনুমতি নিশ্চিত হয়ে যায় না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১২ অক্টোবর ২০২৬-এ পার্লামেন্টকে জানিয়েছে, স্পনসর লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল হওয়া মাত্রই কর্মীর অভিবাসন-অনুমতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে যায় না। কর্মীকে তাঁর ভিসার শর্ত অনুযায়ী কাজ করার অনুমতি দেওয়া থাকতে পারে, যতক্ষণ না তাঁর অনুমতির মেয়াদ শেষ হয় বা অন্য কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।
তাই কর্মীর উচিত নিজের ভিসার অবস্থা সরাসরি যাচাই করা এবং প্রয়োজন হলে স্বীকৃত অভিবাসন পরামর্শদাতা বা আইনজীবীর সাহায্য নেওয়া।
কী কী প্রমাণ সংরক্ষণ করবেন?
নির্যাতন বা শোষণের শিকার কর্মীদের কাছে সব সময় পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ থাকে না। তবু নিরাপদে রাখা সম্ভব হলে নিচের নথিগুলো ভবিষ্যতে সহায়ক হতে পারে:
- চাকরির চুক্তিপত্র ও নিয়োগের প্রস্তাব;
- স্পনসরশিপ বা ভিসাসংক্রান্ত নথি;
- বেতন স্লিপ ও ব্যাংক লেনদেনের রেকর্ড;
- নিয়োগকর্তা বা এজেন্টের পাঠানো বার্তা, ইমেইল ও হুমকির প্রমাণ;
- বাংলাদেশে নিয়োগের জন্য টাকা দেওয়ার রসিদ বা লেনদেনের প্রমাণ;
- কাজের সময়সূচি এবং প্রকৃত কাজের বিবরণ;
- ঘটনার তারিখসহ সংক্ষিপ্ত ব্যক্তিগত বিবরণ।
কোনো নথি সংগ্রহ করতে গিয়ে নিজের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলবেন না। নিয়োগকর্তা ফোন বা ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণ করলে নিরাপদ উপায়ে সহায়তা চাইতে হবে।
বিনা খরচে আইনি সহায়তা পাওয়া যাবে কি?
আধুনিক দাসত্বের শিকার ব্যক্তিদের জন্য নির্দিষ্ট বিষয়ে আইনি সহায়তা বা লিগ্যাল এইড পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে যোগ্যতা নির্ভর করে মামলার ধরন, ব্যক্তির পরিস্থিতি এবং প্রযোজ্য নিয়মের ওপর।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে লিগ্যাল এইডের যোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট আইনজীবী খুঁজতে সরকারি নির্দেশিকা ব্যবহার করা যায়:
https://www.gov.uk/check-legal-aid
অভিবাসন বিষয়ে সহায়তা নেওয়ার সময় পরামর্শদাতা অনুমোদিত কি না, তা যাচাই করা জরুরি। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেখে কারও হাতে পাসপোর্ট, মূল নথি বা বিপুল অর্থ তুলে দেওয়া উচিত নয়।
নতুন নিয়ম কি আইএলআর পাওয়ার পথ সহজ করবে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
নতুন নিয়মটি মূলত যোগ্য ভুক্তভোগীদের কাজের শর্ত শিথিল করে নির্যাতনকারী স্পনসর থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেয়। এটি আলাদা কোনো স্থায়ী বসবাসের অনুমতি নয়।
কর্মী নতুন নিয়োগকর্তার অধীনে কাজ করতে পারলেও তাঁর বর্তমান ভিসার মেয়াদ এবং অন্য অভিবাসন-শর্ত প্রযোজ্য থাকবে। ভবিষ্যতে আইএলআরের আবেদন করতে হলে সংশ্লিষ্ট সময়ের কার্যকর নিয়ম ও যোগ্যতার শর্ত পূরণ করতে হবে। আইএলআরের জন্য স্পনসরসংক্রান্ত শর্তও প্রাসঙ্গিক থাকতে পারে।
তাই এই পরিবর্তনকে যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা
বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে আসা কোনো কর্মী যদি নিয়োগকর্তার শোষণের শিকার হন, তাহলে তাঁকে নীরবে সবকিছু সহ্য করতে হবে—এমন নয়। সাহায্য চাওয়ার পথ রয়েছে। তবে নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি।
যাঁরা নির্যাতন বা গুরুতর শোষণের শিকার, তাঁরা প্রথমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আধুনিক দাসত্ববিষয়ক হেল্পলাইন, স্যালভেশন আর্মি, উপযুক্ত ফার্স্ট রেসপন্ডার কিংবা স্বীকৃত আইনি পরামর্শদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
বিশেষ করে কেয়ার সেক্টরের কর্মীদের মনে রাখতে হবে, স্পনসর ভিসায় আসার কারণে তাঁরা শ্রম আইনের সুরক্ষার বাইরে নন। তাঁদেরও প্রযোজ্য কর্মসংস্থান আইনের অধীনে অধিকার রয়েছে।
নতুন নিয়মের মূল বার্তা হলো—আধুনিক দাসত্বের শিকার হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পাওয়া যোগ্য স্কিলড ওয়ার্কারদের আর শুধু নির্দিষ্ট স্পনসরের ওপর নির্ভর করে থাকতে হবে না। তাঁরা তাঁদের বিদ্যমান ভিসার অবশিষ্ট মেয়াদে অন্য বৈধ কাজের সুযোগ পেতে পারেন।
তবে সুবিধাটি পেতে নিজের যোগ্যতা, এনআরএমের সিদ্ধান্ত এবং কাজের অনুমতির অবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।