তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

ইইউর সঙ্গে অবাধ চলাচল ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা নিয়ে ‘খোলামেলা আলোচনা’ চান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী

ইইউর সঙ্গে অবাধ চলাচল ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা নিয়ে ‘খোলামেলা আলোচনা’ চান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৫ অক্টোবর :

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে সাজানোর অংশ হিসেবে ইউরোপীয় নাগরিকদের ব্রিটেনে অবাধে যাতায়াত, বসবাস ও কাজের সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা চান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। তাঁর মতে, ব্রেক্সিটের আগে ও পরের অভিবাসন পরিস্থিতি একইভাবে বিচার না করে বাস্তব তথ্য ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সানডে টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বার্নহ্যাম বলেন, বিষয়টি নিয়ে আবেগনির্ভর বিতর্কের পরিবর্তে তথ্যভিত্তিক ও প্রমাণনির্ভর আলোচনা হওয়া উচিত। তবে তিনি এখনই ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবাধ চলাচলব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার পক্ষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি।

প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য ব্রিটেনের অভিবাসননীতি এবং ব্রেক্সিট-পরবর্তী ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ব্রেক্সিটের আগের অভিবাসন কি ভিন্ন ছিল?

২০১৬ সালের গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ব্রিটিশ জনগণের একটি বড় অংশ ভোট দিয়েছিল। সেই প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং দেশের সীমান্তের ওপর ব্রিটিশ সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা।

ইইউর সদস্য থাকাকালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নাগরিকেরা তুলনামূলক সহজে ব্রিটেনে এসে বসবাস, পড়াশোনা ও কাজ করতে পারতেন। একইভাবে ব্রিটিশ নাগরিকেরাও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাস ও কাজের সুযোগ পেতেন।

বার্নহ্যামের যুক্তি, ওই সময়ে ইউরোপ থেকে আসা অনেক মানুষ কয়েক বছর ব্রিটেনে কাজ করে নিজ দেশে ফিরে যেতেন। ফলে তাঁদের অভিবাসনের ধরন বর্তমান পরিস্থিতির তুলনায় আলাদা ছিল।

তিনি স্বীকার করেছেন, অবাধ চলাচলব্যবস্থার সঙ্গে উল্লেখযোগ্য সমস্যা ও চ্যালেঞ্জও যুক্ত ছিল। তবে তাঁর মতে, তখনকার অভিবাসনের একটি অংশ ছিল সাময়িক। অন্যদিকে, বর্তমানে অভিবাসনের ধরন ও ভারসাম্যে পরিবর্তন এসেছে। তাই অতীতের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান বাস্তবতা পাশাপাশি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

একক বাজারে প্রবেশের প্রশ্ন

ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য কয়েকটি বিকল্প বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ইইউর একক বাজারে পুনরায় প্রবেশ, কাস্টমস ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে পূর্ণ সদস্যপদ ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা।

একক বাজারে প্রবেশ করলে ইউরোপের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ হতে পারে। তবে এর সঙ্গে অবাধ চলাচলসহ ইইউর কিছু নিয়ম ও বাধ্যবাধকতা মেনে চলার প্রশ্নও জড়িত।

অন্যদিকে, কাস্টমস ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হলে পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে কিছু বাণিজ্যিক বাধা কমতে পারে। তবে এটি একক বাজারের সদস্যপদের সমতুল্য নয় এবং এর মাধ্যমে মানুষের অবাধ চলাচলের অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিরে আসে না।

পূর্ণ সদস্যপদ ফিরে পেতে হলে ব্রিটেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আরও ব্যাপক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আইনি সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।

বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, এসব বিকল্পের সুবিধা-অসুবিধা পর্যালোচনা করে ব্রিটিশ জনগণের সামনে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বিভিন্ন পথ তুলে ধরতে চান।

সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কী বললেন প্রধানমন্ত্রী?

অবাধ চলাচল ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করলেও বার্নহ্যাম ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের সব ক্ষেত্রে পরিবর্তনের পক্ষে নন। তিনি বলেছেন, ব্রিটেনের শেনজেন সীমান্তমুক্ত অঞ্চলে যোগ দেওয়া কিংবা নিজস্ব মুদ্রা পাউন্ড স্টার্লিং বাদ দিয়ে ইউরো গ্রহণের সুপারিশ করার কথা তিনি কল্পনা করতে পারেন না।

শেনজেন ব্যবস্থার আওতায় অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে সাধারণত নিয়মিত অভ্যন্তরীণ সীমান্ত পরীক্ষা ছাড়াই যাতায়াত করা যায়। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়া এবং শেনজেন অঞ্চলে যোগ দেওয়া দুটি পৃথক বিষয়।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, তিনি ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে চান, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ব্রিটেনকে ইউরোপীয় একীকরণের প্রতিটি ব্যবস্থায় যোগ দিতে হবে।

নভেম্বরের সম্মেলনে কী হতে পারে?

আগামী ২০ নভেম্বর ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর। ওই সম্মেলনকে সামনে রেখে ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ ইউরোপনীতি নিয়ে বিভিন্ন বিকল্প তুলে ধরার পরিকল্পনা করেছেন তিনি।

বৈঠকে বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা, পরিবেশবিষয়ক নীতি, তরুণদের বিনিময় কর্মসূচি এবং অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।

তবে নভেম্বরের সম্মেলনেই অবাধ চলাচল ফিরিয়ে আনার বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তি হবে—এমন কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বরং এটি ব্রিটেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক নিয়ে বৃহত্তর আলোচনার একটি অংশ।

এদিকে, ইইউর সঙ্গে সম্পর্কের মৌলিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে লেবার পার্টির ২০২৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারও গুরুত্বপূর্ণ বাধা। ওই ইশতেহারে অবাধ চলাচল ফিরিয়ে আনা, একক বাজারে যোগ দেওয়া এবং কাস্টমস ইউনিয়নে পুনরায় প্রবেশের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি। ফলে সরকারের অবস্থানে বড় পরিবর্তন আনতে হলে ভবিষ্যৎ নির্বাচনী অঙ্গীকার ও রাজনৈতিক ম্যান্ডেটের প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।

বিরোধীদের তীব্র আপত্তি

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করেছে রিফর্ম ইউকে ও কনজারভেটিভ পার্টির নেতারা। রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ অভিযোগ করেছেন, অবাধ চলাচল ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দেওয়া মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।

অন্যদিকে, কনজারভেটিভদের ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস ফিলপের বক্তব্য, অবাধ চলাচল ফিরিয়ে আনা হলে ইউরোপ থেকে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হবে। তাঁর মতে, ব্রিটিশ জনগণ ২০১৬ সালের গণভোটে অবাধ চলাচল বন্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন।

সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বিকল্পগুলো তথ্য ও বাস্তবতার ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং গণভোটের রায়—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ব্রিটেনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্কের পরিবর্তন ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জীবনেও পরোক্ষ প্রভাব ফেলতে পারে। বাণিজ্য, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, ভ্রমণ এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ব্যবসায়িক যোগাযোগের সুযোগ এর সঙ্গে সম্পর্কিত।

তবে অবাধ চলাচল ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আলোচনা চলছে বলেই বাংলাদেশি নাগরিকদের ব্রিটেনে বসবাস বা কাজের নিয়মে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আসবে—এমন ধারণা করা ঠিক হবে না। ব্রিটিশ নাগরিকত্ব, স্থায়ী বসবাসের অনুমতি, ভিসা কিংবা অভিবাসন-সংক্রান্ত বর্তমান অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তিত হবে না।

ভবিষ্যতে ব্রিটেন ও ইইউর মধ্যে কোনো চুক্তি হলে তার শর্ত, কার্যকর হওয়ার সময় এবং সংশ্লিষ্ট আইনি পরিবর্তনের ওপরই প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে।

সব মিলিয়ে, অ্যান্ডি বার্নহ্যামের বক্তব্য ব্রেক্সিটের প্রায় এক দশক পর ব্রিটেনের ইউরোপনীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার পথ খুলে দিয়েছে। তবে অবাধ চলাচল ফিরবে কি না, ব্রিটেন একক বাজারে ফিরবে কি না কিংবা পূর্ণ সদস্যপদ নিয়ে আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। আগামী ২০ নভেম্বরের ব্রাসেলস সম্মেলন এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান আরও স্পষ্ট করতে পারে।