ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৩৫ ।। ব্রিটেনে ব্রেক্সিট ছিল একটি ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্ত
।। ব্রিটেনে ব্রেক্সিট ছিল একটি ঐতিহাসিক ভুল সিদ্ধান্ত ।।
উৎসর্গ
ব্রেক্সিটের বিপক্ষে ভোট দেওয়া যুক্তরাজ্যের সেই ৪৮ শতাংশ নাগরিকের প্রতি, যাদের আশঙ্কার অনেকটাই আজ বাস্তবে পরিণত হয়েছে।

ইতিহাসের কিছু সিদ্ধান্ত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের মুহূর্তে যা অনেকের কাছে বিজয় বলে মনে হয়, কয়েক বছর পর সেটিই জাতির জন্য দীর্ঘস্থায়ী বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোট ছিল তেমনই একটি সিদ্ধান্ত। আজ, এক দশক পর ব্রিটেনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক মন্থরতা এবং সামাজিক বিভাজনের দিকে তাকালে প্রশ্ন জাগে—ব্রেক্সিট কি সত্যিই ব্রিটেনকে শক্তিশালী করেছে, নাকি এটি ছিল একটি ঐতিহাসিক ভুল?
আমি ও আমার পরিবার তখন ব্রেক্সিটের বিপক্ষে ভোট দিয়েছিলাম। শুধু ভোটই দিইনি, একজন সাংবাদিক ও কলামিস্ট হিসেবে ব্রেক্সিটের বিরুদ্ধে লিখেছিলাম। তখন অনেক স্বদেশি জ্ঞানীগুনী তথাকথিত পন্ডিতগন এ নিয়ে আমার সাথে তর্ক করে বলেছিলেন, ব্রেক্সিট হলে নাকি ব্রিটেন আরও অনেক উন্নত হবে। জিনিষপত্রের দাম নাকি অনেক কমবে। ইউরোপের মানুষ ব্রিটেনে সহজে আসতে পারবে না, ফলে অনেক চাকরীর সৃষ্টি হবে। এখন দেখছি, জীবনযাত্রার মান তিন গুন বেড়ে গেছে দশ বছর পর। একটা বিষয় ভেবে পাই না, আমরা সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে ব্রিটেনে আসতে পারলে, ইউরোপের মানুষ ব্রিটেনে আসলে দোষ হবে কেন? এটা তো এক ধরনের ‘একলা খাওয়ার মনোবৃত্তি’। তখনই আমার বিশ্বাস ছিল, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসা ব্রিটেনের জন্য লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি ডেকে আনবে। কিন্তু তখন ৫২ শতাংশ ভোটার ব্রেক্সিটের পক্ষে এবং ৪৮ শতাংশ বিপক্ষে ভোট দেন। গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়, কিন্তু সব সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্ত যে দূরদর্শী বা সঠিক হয় না, ব্রেক্সিট তার অন্যতম বড় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, জনতার আবেগ অনেক সময় বাস্তবতাকে আড়াল করে দেয়। এ কারণেই রাজনৈতিক দার্শনিক জন লকের নামে একটি বহুল উদ্ধৃত উক্তি প্রচলিত রয়েছে—“জনমত জনও নয়, মতও নয়।” উক্তিটির ঐতিহাসিক উৎস নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এর অন্তর্নিহিত বক্তব্য হলো, জনমত সব সময় প্রজ্ঞার প্রতিফলন নয়। অনেক সময় তথ্যের ঘাটতি, আবেগ, ভয় কিংবা বিভ্রান্তিকর প্রচারণা জনগণকে এমন সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়, যার মূল্য পরে পুরো জাতিকে দিতে হয়।
ব্রেক্সিটের পক্ষে তখন ব্রিটেনবাসীর সবচেয়ে বড় যুক্তি ছিল—ব্রিটেন তার সীমান্ত, আইন এবং অর্থনীতির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবে। জনগণকে বলা হয়েছিল, ইউরোপীয় ইউনিয়নের জটিল আমলাতন্ত্র থেকে বেরিয়ে এলে দেশ আরও সমৃদ্ধ হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরেছে।
গত এক দশকে ব্রিটেনে একের পর এক প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তিত হয়েছেন। ডেভিড ক্যামেরন থেকে থেরেসা মে, বরিস জনসন, লিজ ট্রাস, ঋষি সুনাক এবং কিয়ার স্টারমার—প্রত্যেককেই কোনো না কোনোভাবে ব্রেক্সিটের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করতে হয়েছে। একটি পরিণত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এত অল্প সময়ে নেতৃত্বের এমন অস্থিরতা স্বাভাবিক নয়। এটি ব্রিটিশ রাজনীতির গভীর সংকটের প্রতিফলন।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও ব্রেক্সিট প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছিল ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় বাজার। ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ফলে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের অনেক সুবিধা সীমিত হয়ে যায় এবং নতুন কাগজপত্র, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক জটিলতা ব্যবসার জন্য বাড়তি ব্যয় সৃষ্টি করে। বহু প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ কমিয়েছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সরিয়ে নিয়েছে।
গবেষণাগুলো দেখায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ব্রিটেনের রপ্তানি ও আমদানি উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষি, খাদ্য এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা খাত। যে ব্যবসাগুলো একসময় সহজেই ইউরোপের ৪৫ কোটিরও বেশি ভোক্তার বাজারে প্রবেশ করতে পারত, তারা এখন নানা বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।
ব্রেক্সিটের সমর্থকেরা অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে অভিবাসন প্রশ্নে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। বরং স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, পরিবহন এবং আতিথেয়তা খাতে শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। ইউরোপীয় কর্মীদের একটি বড় অংশ চলে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান দক্ষ জনবল সংকটে পড়েছে। জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা (NHS) পর্যন্ত এর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়।
ব্রেক্সিটের আরেকটি বড় ক্ষতি হয়েছে ব্রিটেনের আন্তর্জাতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম শক্তিশালী সদস্য হিসেবে ব্রিটেন একসময় ইউরোপের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। এখন সেই অবস্থান আর নেই। অনেক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আলোচনায় ব্রিটেনকে এককভাবে লড়তে হচ্ছে, যেখানে আগে তার পাশে ছিল একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জোট।
অবশ্য ব্রিটেনের বর্তমান সমস্যার জন্য শুধু ব্রেক্সিটকে দায়ী করা যাবে না। কোভিড-১৯ মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাও বড় ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন থেকেই যায়—এসব সংকট মোকাবিলায় ব্রিটেন কি ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে থাকলে আরও শক্তিশালী অবস্থানে থাকতে পারত না? বহু অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারক মনে করেন, উত্তরটি ইতিবাচক।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো জনমতের পরিবর্তন। সাম্প্রতিক জরিপগুলো দেখায়, এখন ব্রিটিশদের একটি বড় অংশ মনে করেন ব্রেক্সিট ভুল ছিল। অনেকেই আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে পুনরায় যোগদানের পক্ষে মত দিচ্ছেন। লন্ডনের রাস্তায় ‘রি-জয়েন’ মিছিল সেই পরিবর্তিত বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
ব্রেক্সিটের পেছনে কাজ করেছিল জাতীয়তাবাদী আবেগ, অভিবাসন-ভীতি এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অতীত গৌরবের স্মৃতি। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা কেবল আবেগ দিয়ে হয় না; হয় বাস্তবতা, অর্থনীতি এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল দিয়ে। ব্রেক্সিটের সময় যে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, বাস্তবতার সঙ্গে তার অনেকটাই সাংঘর্ষিক প্রমাণিত হয়েছে।
দশ বছর পর দাঁড়িয়ে বলা যায়, ব্রেক্সিট ব্রিটেনকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে বিভক্ত করেছে, অর্থনীতিকে গতিশীল করার পরিবর্তে মন্থর করেছে এবং রাজনীতিকে স্থিতিশীল করার পরিবর্তে আরও অস্থির করেছে। ভুল সিদ্ধান্তের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তার মূল্য বহু বছর ধরে দিতে হয়। ব্রেক্সিটের মূল্য আজও ব্রিটেন পরিশোধ করছে। তাই আমি রাষ্ট্রচিন্তাবিদ জন লকের মতোই মনে করি, ‘‘জনমত সব সময় জনও নয়, মতও নয়’। কারণ জনগন সব সময় ঠিক কাজটি করে না। বেশিরভাগ সময়ই আম জনতা আবেগে চলে।
ইতিহাস হয়তো একদিন ব্রেক্সিটকে ব্রিটিশ গণতন্ত্রের সবচেয়ে বিতর্কিত গণভোট হিসেবে স্মরণ করবে। এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে গৃহীত হয়েছিল, কিন্তু যার ফলাফল নিয়ে আজ সেই সংখ্যাগরিষ্ঠেরই একটি বড় অংশ প্রশ্ন তুলছে। আর সেই কারণেই, এক দশক পর ফিরে তাকালে আমার কাছে ব্রেক্সিট শুধু একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি জনমত, নেতৃত্ব এবং রাষ্ট্রীয় দূরদর্শিতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, গল্পকার, বিশ্লেষক
লন্ডন, ২৫ জুন ২০২৬।