আবারও বন্ধ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি: ইতিহাসের অদ্ভুত প্রত্যাবর্তনের অবসান
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ২৭ ফেব্রুয়ারি:
একসময় যে প্রতিষ্ঠানের হাত ধরে ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটেছিল, সেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আবারও বন্ধ হয়ে গেছে। প্রায় ১৭০ বছর আগে রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানো এই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে লন্ডনে বিলাসপণ্যের ব্যবসা শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা দেউলিয়াত্বে গড়িয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী পুনরুজ্জীবনেরও ইতি ঘটল।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, লন্ডনে বিলাসপণ্যের খুচরা বিক্রেতা হিসেবে পরিচালিত আধুনিক সংস্করণের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখন লিকুইডেশনে। ২০১০ সালে এক ব্রিটিশ-ভারতীয় উদ্যোক্তা ঐতিহাসিক নামটির স্বত্ব কিনে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করেছিলেন। কিন্তু ব্যবসায়িকভাবে টিকে থাকতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।

দেউলিয়াত্ব ও দেনার বোঝা
ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য সানডে টাইমস জানিয়েছে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি লিমিটেড ২০২৫ সালের অক্টোবরে লিকুইডেটর নিয়োগ দেয়। তাদের ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে নিবন্ধিত মূল প্রতিষ্ঠানের কাছে ৬ লাখ পাউন্ডের বেশি দেনা ছিল। কর বাবদ বকেয়া প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার পাউন্ড এবং কর্মীদের পাওনা ছিল ১ লাখ ৬৩ হাজার পাউন্ডের বেশি।
লন্ডনের মেফেয়ারের ৯৭ নিউ বন্ড স্ট্রিটে অবস্থিত তাদের বিলাসবহুল দোকানটি এখন খালি পড়ে আছে। ওয়েবসাইটও অচল। সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও পাওনাদাররা আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে।
উপনিবেশ থেকে ‘বিলাসব্র্যান্ড’
১৬০০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথ প্রথম-এর রাজকীয় সনদে প্রতিষ্ঠিত হয় ইংলিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। শুরুতে এটি ছিল একটি যৌথ-শেয়ারভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, যার লক্ষ্য ছিল ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে মসলা ও পণ্যের বাণিজ্য।
১৬১২-১৩ সালে ভারতের সুরাটে প্রথম কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে তারা কেপ অব গুড হোপের পূর্বাঞ্চলে ব্রিটিশ বাণিজ্যে একচেটিয়া অধিকার পায়।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ-এর পর বাংলায় শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কোম্পানিটি কার্যত একটি বাণিজ্যিক শক্তি থেকে সামরিক-রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ নেয়। কর আদায়, বিচার ব্যবস্থা পরিচালনা, এমনকি প্রায় আড়াই লাখ সদস্যের ব্যক্তিগত সেনাবাহিনী গড়ে তুলে তারা এক পর্যায়ে তৎকালীন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর চেয়েও বড় বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করত।
শোষণ, দুর্ভিক্ষ ও বিদ্রোহ
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্তরাধিকার মূলত বিতর্কিত ও নেতিবাচক। নগদ ফসল চাষে বাধ্য করা, রপ্তানিনির্ভর নীতি ও অর্থনৈতিক শোষণের ফলে ভারত ও বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। বিশেষ করে ১৭৭০ সালের বাংলার মহাদুর্ভিক্ষ ইতিহাসে এক করুণ অধ্যায় হয়ে আছে।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে। ১৮৫৮ সালে ব্রিটিশ ক্রাউন সরাসরি ভারতের শাসনভার গ্রহণ করে। অবশেষে ১৮৭৪ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে কোম্পানিটি বিলুপ্ত করে।
নামের পুনরুজ্জীবন, ভাবমূর্তির রূপান্তরের চেষ্টা
২০১০ সালে উদ্যোক্তা সঞ্জীব মেহতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামের স্বত্ব কিনে তা বিলাসব্র্যান্ড হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করেন। মেফেয়ারে প্রায় দুই হাজার বর্গফুটের দোকানে উচ্চমানের চা, চকলেট, মসলা ও উপহারসামগ্রী বিক্রি হতো।
২০১৭ সালে দ্য গার্ডিয়ান-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মেহতা বলেছিলেন, একজন ভারতীয়ের হাতে কোম্পানিটির মালিকানা নেতিবাচক ইতিহাসকে ইতিবাচকে রূপান্তর করেছে। তার ভাষায়, ঐতিহাসিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আগ্রাসনের প্রতীক হলেও আধুনিক সংস্করণটি সহমর্মিতার বার্তা বহন করতে চেয়েছিল।
কিন্তু সেই ভাবমূর্তি-পরিবর্তনের প্রচেষ্টা টেকেনি। অর্থনৈতিক বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত ঐতিহাসিক নামটিকেও রক্ষা করতে পারেনি।
ইতিহাসের দ্বৈত উত্তরাধিকার
একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান কীভাবে সাম্রাজ্য নির্মাতা হয়ে উঠতে পারে— ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইতিহাস তারই দৃষ্টান্ত। এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য, আধুনিক কর্পোরেট কাঠামো এবং উপনিবেশ বিস্তারের নতুন ধারা তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই অগ্রগতির মূল্য ছিল বিপুল মানবিক দুর্ভোগ, শোষণ ও রাজনৈতিক দমন।
দ্বিতীয়বারের মতো বন্ধ হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নামঘেরা পুনরুজ্জীবনের অধ্যায়ও শেষ হলো। ইতিহাসের ভার বহন করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা যে সহজ নয়— এই ঘটনাই তার আরেকটি প্রমাণ।