তথ্যনির্ভর ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদের জন্য—ভয়েস অব পিপল

যুক্তরাজ্যে আইএলআর ৫ বছরের বদলে ১৫ বছর হতে পারে, উদ্বেগে বাংলাদেশি কেয়ারকর্মীরা

যুক্তরাজ্যে আইএলআর ৫ বছরের বদলে ১৫ বছর হতে পারে, উদ্বেগে বাংলাদেশি কেয়ারকর্মীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, ২৭ সেপ্টেম্বর :

যুক্তরাজ্যে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা ইনডেফিনিট লিভ টু রেইন (আইএলআর) পাওয়ার নিয়মে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে সরকার ও লেবার পার্টির ভেতরে মতবিরোধ তীব্র হয়েছে। প্রস্তাবিত ‘আর্নড সেটেলমেন্ট’ ব্যবস্থায় সাধারণভাবে স্থায়ী বসবাসের জন্য পাঁচ বছরের পরিবর্তে ১০ বছর অপেক্ষার নিয়ম করা হতে পারে। আর ডিগ্রি-সমমানের নিচের দক্ষতার কিছু পেশায় কর্মরতদের জন্য অপেক্ষার সময় ১৫ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে বিদেশি কেয়ারকর্মীদের বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

বর্তমানে নির্দিষ্ট স্কিলড ওয়ার্কার রুটে যোগ্যতা পূরণ করা ব্যক্তিরা সাধারণত পাঁচ বছর পর আইএলআরের জন্য আবেদন করতে পারেন। সরকার ২০২৫ সালে যে নতুন কাঠামোর প্রস্তাব দিয়েছে, তাতে এই সময়সীমা সাধারণভাবে ১০ বছরে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আরএফকিউ লেভেল-৬-এর নিচের দক্ষতার কাজে থাকা কিছু স্কিলড ওয়ার্কার ও হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রুটের কর্মীদের জন্য ১৫ বছরের পথ রাখার বিষয়ে পরামর্শ চাওয়া হয়েছিল।

এ নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের অবস্থানের সঙ্গে আবাসন ও স্থানীয় সরকারবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনারের মতের পার্থক্য প্রকাশ্যে এসেছে। রেনার ইতোমধ্যে বলেছেন, যুক্তরাজ্যে থাকা বিদেশি কেয়ারকর্মীদের ক্ষেত্রে নিয়ম পরিবর্তন করে তাদের স্থায়ী বসবাসের সময়সীমা অনেক বাড়িয়ে দেওয়া একটি ‘বিঘ্ন সৃষ্টিকারী’ পরিবর্তন হবে।

বিশেষ করে যারা ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে এসে পাঁচ বছর পূর্তির পর স্থায়ী বসবাসের পরিকল্পনা করেছিলেন, তাদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকার যে পরামর্শ গ্রহণ করেছিল, সেখানে যুক্তরাজ্যে বর্তমানে অবস্থানরত কিন্তু এখনো সেটেলড স্ট্যাটাস না পাওয়া ব্যক্তিদের ওপরও নতুন ব্যবস্থা প্রয়োগের সম্ভাবনা রাখা হয়েছিল। সরকার জানিয়েছে, এ বিষয়ে প্রায় ২ লাখ মতামত পাওয়া গেছে এবং সেগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

কেয়ার খাতে বিদেশি কর্মীদের ভূমিকার কারণে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। Skills for Care-এর হিসাব অনুযায়ী, মার্চ ২০২২ থেকে মার্চ ২০২৪ পর্যন্ত বিদেশ থেকে যুক্তরাজ্যে এসে ইংল্যান্ডের স্বাধীন প্রাপ্তবয়স্ক সামাজিক সেবা খাতে আনুমানিক ১ লাখ ৮৫ হাজার মানুষ সরাসরি কেয়ারকর্মীর কাজ শুরু করেন। তবে এই সংখ্যা ভিসা ইস্যুর সরাসরি হিসাব নয়; একই ব্যক্তির চাকরি পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয় এই হিসাবের মধ্যে থাকতে পারে।

সরকারি তথ্যেও ওই সময়ের ব্যাপক আন্তর্জাতিক নিয়োগের চিত্র পাওয়া যায়। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হেলথ অ্যান্ড কেয়ার রুটে ৬ লাখ ১৬ হাজার ২৬৬টি ভিসা ইস্যু হয়েছিল, যার মধ্যে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৫৯৪টি ছিল মূল আবেদনকারীদের এবং ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৬৭২টি নির্ভরশীলদের ভিসা। একই সময়ে ‘কেয়ারিং পার্সোনাল সার্ভিসেস’ পেশায় ১ লাখ ৫৪ হাজার ৩৪২টি ভিসা দেওয়া হয়।

এই বিপুল নিয়োগের বড় অংশ এসেছিল দক্ষিণ এশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে। সরকারি অভিবাসন পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, হেলথ অ্যান্ড কেয়ার ওয়ার্কার ভিসায় কেয়ারকর্মী বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার নাগরিকদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।

তবে বাংলাদেশিদের জন্য আলাদা করে মোট কতজন এই প্রস্তাবিত আইএলআর পরিবর্তনের আওতায় পড়বেন—এমন নির্দিষ্ট সংখ্যা সরকারি সূত্রে এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে ‘হাজারো বাংলাদেশি নিশ্চিতভাবে ১৫ বছরের নিয়মে পড়ছেন’—এমন নির্দিষ্ট দাবি এখনই নিশ্চিতভাবে করা যাচ্ছে না।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কেয়ারকর্মীদের বিদেশ থেকে নতুন নিয়োগের পথ ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কেয়ারিং পার্সোনাল সার্ভিসেস পেশায় হেলথ অ্যান্ড কেয়ার ওয়ার্কার ভিসা ছিল ১ লাখ ৭ হাজার ৭৭২টি; ২০২৬ সালের জুনে ১২ মাসের হিসাবে তা কমে মাত্র ৩৪৪-এ নেমেছে। সরকারি ব্যাখ্যায়, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বিদেশ থেকে কেয়ারকর্মী নিয়োগ বন্ধ হওয়ার পর এই পতন ঘটে।

এদিকে ট্রেড ইউনিয়ন ইউনিসনসহ কেয়ার খাতের বিভিন্ন সংগঠন প্রস্তাবিত দীর্ঘতর সেটেলমেন্ট সময়ের বিরোধিতা করছে। তাদের যুক্তি, বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের পথ দীর্ঘ হলে অভিজ্ঞ কর্মীদের ধরে রাখা কঠিন হতে পারে এবং সামাজিক সেবা খাতে কর্মী সংকট আবার বাড়তে পারে। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে ইউনিসনের পক্ষ থেকে সামাজিক সেবা খাতে বিপুল সংখ্যক শূন্য পদ থাকার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

অন্যদিকে সরকারের অবস্থান হলো, স্থায়ীভাবে বসবাসের অধিকারকে শুধু নির্দিষ্ট সময় যুক্তরাজ্যে থাকার ওপর নির্ভরশীল না রেখে কাজ, আয়, কর প্রদান, ইংরেজি ভাষা, আইন মেনে চলা ও সমাজে অবদানের মতো বিষয় বিবেচনায় এনে ‘অর্জিত’ অধিকার হিসেবে গড়ে তোলা। ২০২৫ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ এ ধরনের একটি অবদানভিত্তিক সেটেলমেন্ট মডেলের প্রস্তাব দেন।

তবে এখনো চূড়ান্ত নিয়ম কার্যকর হয়নি। সরকারের পরামর্শ প্রক্রিয়া শেষ হলেও কোন প্রস্তাব কীভাবে এবং কার ওপর প্রয়োগ করা হবে, বিশেষ করে ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে থাকা কেয়ারকর্মীদের ক্ষেত্রে নতুন নিয়মের প্রভাব কী হবে—সেটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

তাই বর্তমানে যুক্তরাজ্যে থাকা বাংলাদেশি কেয়ারকর্মীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পাঁচ বছর পূর্ণ করলেই আগের নিয়মে আইএলআর পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা এখন আর আগের মতো ধরে নেওয়া যাচ্ছে না; আবার ১৫ বছর অপেক্ষা করতেই হবে—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও এখনো হয়নি।