“যেখানে সময়ের শব্দে উঠে আসে সত্য”
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৭০।। মাদ্রাসা ও সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতন: প্রতিরোধে সরকার ও অভিভাবকদের করণীয়
উৎসর্গ:
প্রতিটি শিশুর নিরাপদ শৈশব, মর্যাদা ও নির্যাতনমুক্ত শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিশুর জ্ঞান অর্জন, নৈতিক বিকাশ ও নিরাপদে বেড়ে ওঠার জায়গা। আর ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে অভিভাবকদের প্রত্যাশা আরও গভীর। তাঁরা সন্তানকে সেখানে পাঠান ধর্মীয় জ্ঞান, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ শেখানোর আশায়। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানের ভেতরেই যদি শিশু যৌন নির্যাতন, শারীরিক নিপীড়ন কিংবা ভয়ভীতির শিকার হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে—শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁরা কি যথাযথভাবে সেই দায়িত্ব পালন করছেন?
বাংলাদেশে মাদ্রাসায় বা সাধারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনা দেখিয়েছে, কিছু প্রতিষ্ঠানে শিশুদের অসহায়ত্ব ও অভিভাবকদের আস্থার সুযোগ নিয়ে নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। তবে মনে রাখতে হবে, অপরাধের দায় কোনো ধর্ম, ধর্মীয় শিক্ষা বা একটি গোটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবস্থার ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। দায় অপরাধীর, আর দায় এড়াতে পারে না সেই প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ, যারা অভিযোগ জানার পরও ব্যবস্থা নেয় না কিংবা শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়।
পরিসংখ্যান যে সতর্কবার্তা দিচ্ছে
দৈনিক ইত্তেফাকে ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জাস্টিস, মিডিয়া অ্যান্ড বাংলাদেশ ফোরামের (জেএমবিএফ) তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতনের ৭২টি ঘটনায় ১০৯ জন শিশু ভুক্তভোগী হয়েছে। একই সময়ে দেশজুড়ে ছেলেশিশুদের ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ১৩১টি ঘটনায় ১৭১ জন ভুক্তভোগীর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১৬১ জন ধর্ষণের এবং ১০ জন ধর্ষণচেষ্টার শিকার বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এগুলো নথিভুক্ত ঘটনার হিসাব; প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কারণ ভয়, সামাজিক লজ্জা, পরিবারের সম্মানহানির আশঙ্কা কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রভাবের কারণে অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না। বিশেষ করে আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকা ছোট শিশুরা নির্যাতনের কথা জানাতে ভয় পেতে পারে। কেউ কেউ বুঝতেই পারে না যে তার সঙ্গে অন্যায় হচ্ছে।
প্রতিবেদনে রাজধানীর বনশ্রীতে দশ বছর বয়সী শিশু আবদুল্লাহর মৃত্যুর ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। তার মা যৌন নির্যাতন ও আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতির অভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এমন ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত যেমন জরুরি, তেমনি অভিযোগ প্রমাণের আগে কাউকে অপরাধী ঘোষণা না করে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করাও প্রয়োজন।
সরকারকে যেসব পদক্ষেপ নেয়া দরকার
শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু অপরাধীকে গ্রেপ্তার করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অপরাধের সুযোগ কমানো, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা তৈরি এবং প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করা—সবই সরকারের দায়িত্ব। সরকার আরেও কিছু পদক্ষেপ নিতে পারে। যেমন:
প্রথমত, যত্রতত্র মাদ্রাসা বা স্কুল প্রতিষ্ঠা বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনীয় অনুমোদন, উপযুক্ত ভবন, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা ছাড়া কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার অনুমতি দেওয়া উচিত নয়। দেশের সব মাদ্রাসার নিবন্ধন, শিক্ষার্থীসংখ্যা, শিক্ষক-কর্মচারীর পরিচয়, আবাসিক ব্যবস্থা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা যাচাই করতে হবে। অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা চালু করতে হবে। কোনো শিক্ষক বা কর্মচারী শিশুকে একান্তে কোথায়, কী পরিস্থিতিতে এবং কীভাবে পড়াবেন, আবাসিক শিক্ষার্থীদের দেখাশোনার নিয়ম কী হবে, অভিযোগ কোথায় জানানো যাবে—এসব বিষয়ে লিখিত নীতিমালা থাকতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট শিশু সুরক্ষা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কর্তৃপক্ষের বাইরে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। শুধু কাগজপত্র পরীক্ষা করলেই চলবে না। পরিদর্শকদের দেখতে হবে, শিশুরা নিরাপদে আছে কি না, আবাসিক কক্ষ ও শৌচাগারের পরিবেশ কেমন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর তদারকির ব্যবস্থা আছে কি না এবং অভিযোগ জানানোর সুযোগ রয়েছে কি না। অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশোধনের সময়সীমা দিতে হবে এবং পরে তা বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, যাচাই করতে হবে।
চতুর্থত, অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রথম কাজ হবে শিশুকে নিরাপদ রাখা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির কাছ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে আলাদা করা। এরপর শিশুর চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা, পুলিশকে অবহিত করা এবং প্রয়োজনীয় আলামত সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়া, শিশুকে ভয় দেখানো কিংবা পরিবারকে আপস করতে চাপ দেওয়ার ঘটনা ঘটলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে হবে। শিশুর পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখতে হবে।
পঞ্চমত, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত এবং দক্ষ করতে হবে। শিশু নির্যাতনের অভিযোগে চিকিৎসা পরীক্ষা, ফরেনসিক আলামত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য সুস্পষ্ট কার্যপদ্ধতি থাকা জরুরি। পুলিশ, চিকিৎসক, তদন্ত কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তদন্তে অযৌক্তিক বিলম্ব হচ্ছে কি না, তা তদারকি করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনসম্মত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বিচার হয় প্রমাণের ভিত্তিতে।
ষষ্ঠত, শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগে যাচাই এবং প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। পরিচয় ও প্রয়োজনীয় পূর্ব-ইতিহাস যাচাই, শিশু সুরক্ষা বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত আচরণবিধি অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ধর্মীয় জ্ঞান বা শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলেই শিশুদের সঙ্গে কাজ করার উপযুক্ততা প্রমাণিত হয় না; শিশুদের সঙ্গে নিরাপদ ও দায়িত্বশীল আচরণের সক্ষমতাও জরুরি।
সপ্তমত, সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে ইসলামী শিক্ষার সমন্বয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। প্রচলিত স্কুলে মানসম্মত ইসলামী শিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে, যাতে শিশুরা সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষাও গ্রহণ করতে পারে। এর ফলে স্বতন্ত্র মাদ্রাসার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ধরনের পরিবর্তন বাস্তবায়নের আগে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মতামত নিতে হবে এবং শিক্ষার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা একীভূত করার সিদ্ধান্ত যেন শিশুদের শিক্ষাজীবন বিপন্ন না করে।
অষ্টমত, জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কতটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা হলো, কতটি অনিয়ম পাওয়া গেল, কতটি অভিযোগ তদন্তাধীন এবং শিশু সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। শিশুর পরিচয় প্রকাশ না করে পরিসংখ্যান জানালে জনগণ পরিস্থিতি বুঝতে পারবে এবং কর্তৃপক্ষের কাজের অগ্রগতিও মূল্যায়ন করতে পারবে।
নবমত: প্রতিটি স্কুলে মনোচিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তার নিয়োগ করতে হবে, যারা প্রতি মাসে অন্তত একবার ছাত্রছাত্রীদের শারিরীক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতে হবে বাধ্যতামূলকভাবে।
এসব পদক্ষেপ শুধু কাগজে-কলমে থাকলে চলবে না। প্রতিটি কাজের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
অভিভাবকদের করণীয়
শিশুর নিরাপত্তার প্রথম দায়িত্ব পরিবারের। তবে অভিভাবকদের একার পক্ষে সব ঝুঁকি ঠেকানো সম্ভব নয়। তাই প্রতিষ্ঠান বাছাই, সন্তানের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বিপদের লক্ষণ শনাক্ত করার বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে।
প্রথমত, সন্তানকে কোথায় পাঠাচ্ছেন, তা যাচাই করুন। প্রতিষ্ঠানটি নিবন্ধিত কি না, শিক্ষক কারা, আবাসিক ব্যবস্থাপনা কেমন, শিশু অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে কি না এবং অভিযোগ জানালে কর্তৃপক্ষ কীভাবে ব্যবস্থা নেয়—এসব জেনে নিন। শুধু পরিচিত ব্যক্তি বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সুনামের ওপর নির্ভর না করে বাস্তব পরিস্থিতি দেখুন। শুধু থাকা খাওয়া ফ্রি বলে যেকোন ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশুদের পড়তে দেয়া উচিত নয়।
দ্বিতীয়ত, সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলুন। শুধু পড়াশোনা বা পরীক্ষার ফল নয়, তার দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা, ভয়, অস্বস্তি এবং শিক্ষকদের আচরণ সম্পর্কেও জানতে চান। এমন পরিবেশ তৈরি করুন, যাতে শিশু বুঝতে পারে—যে কোনো সমস্যার কথা মা-বাবাকে বলা যায় এবং সত্য বলার জন্য তাকে বকাঝকা করা হবে না।
তৃতীয়ত, ভালো স্পর্শ ও খারাপ স্পর্শ সম্পর্কে বয়স উপযোগী শিক্ষা দিন। শিশুকে বোঝাতে হবে, শরীরের ব্যক্তিগত অংশ সম্পর্কে তার অধিকার আছে। কেউ যদি অস্বস্তিকরভাবে স্পর্শ করে, গোপন রাখতে বলে, ভয় দেখায় বা কোনো আচরণে অস্বস্তি তৈরি করে, তাহলে সে যেন বিশ্বস্ত বড় কাউকে জানায়। অপরাধী পরিচিত, সম্মানিত কিংবা ধর্মীয় শিক্ষক হলেও অন্যায় আচরণ অন্যায়ই।
চতুর্থত, আচরণগত পরিবর্তনকে গুরুত্ব দিন। শিশু হঠাৎ ভয় পেতে শুরু করলে, নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানে যেতে না চাইলে, ঘুম বা খাওয়ার সমস্যা দেখা দিলে কিংবা অস্বাভাবিকভাবে চুপচাপ বা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লে কারণ জানার চেষ্টা করুন। এসব লক্ষণ মানেই নির্যাতন ঘটেছে, এমন নয়; তবে অবহেলা না করে শিশুর সঙ্গে সংবেদনশীলভাবে কথা বলা প্রয়োজন।
পঞ্চমত, অভিযোগ শুনলে শিশুকে দোষ দেবেন না। শান্তভাবে তার কথা শুনুন, বিশ্বাস ও নিরাপত্তার আশ্বাস দিন এবং বারবার প্রশ্ন করে বা একই ঘটনা বলতে বাধ্য করে তাকে মানসিক চাপে ফেলবেন না। অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে একা গিয়ে মুখোমুখি সংঘাতে জড়ানোর বদলে শিশুকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে পুলিশ বা উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
বাংলাদেশে তাৎক্ষণিক বিপদের ক্ষেত্রে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ যোগাযোগ করা যায়। শিশু সহায়তার জন্য ১০৯৮ নম্বরেও যোগাযোগ করা যায়। অভিযোগ জানানোর সময় শিশুর বয়স, ঘটনার স্থান, সময়, অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় জানা থাকলে তা এবং শিশুর বর্তমান নিরাপত্তার বিষয়টি জানান। চিকিৎসা প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের সহায়তা নিন। কোনো বার্তা, নথি বা অন্য প্রাসঙ্গিক তথ্য থাকলে তা সংরক্ষণ করুন; তবে শিশুর পরিচয় বা ঘটনার বিবরণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেবেন না।
শিশুর জন্য প্রথম প্রয়োজন নিরাপদ শিক্ষাব্যবস্থা
শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলা মানে ধর্মীয় শিক্ষার বিরোধিতা করা নয়। বরং ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার যে মানবিক মূল্যবোধের কথা বলা হয়, তার সঙ্গে শিশুদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একইভাবে, সব মাদ্রাসাকে অপরাধের কেন্দ্র হিসেবে দেখা যেমন অন্যায়, তেমনি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে কোনো অপরাধকে আড়াল করার সুযোগ দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।
সমস্যার সমাধান কেবল বক্তৃতা, বিবৃতি কিংবা বিচ্ছিন্ন গ্রেপ্তারে আসবে না। প্রয়োজন নিবন্ধন ও তদারকি, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, কার্যকর অভিযোগব্যবস্থা, দ্রুত তদন্ত, ন্যায়বিচার এবং অভিভাবকদের সচেতনতা। পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে ইসলামী শিক্ষার সমন্বয় নিয়ে বাস্তবসম্মত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনা জরুরি।
সবচেয়ে বড় কথা, শিশুকে ভয় দেখিয়ে নয়, নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করে শিক্ষা দিতে হবে। যে প্রতিষ্ঠান শিশুকে নিরাপদ রাখতে পারে না, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আর যে অপরাধী শিশুর অসহায়ত্বের সুযোগ নেয়, তার পরিচয় বা অবস্থান যা-ই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে।
শিশুর নিরাপত্তা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়—এটি তার অধিকার। সেই অধিকার রক্ষায় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অভিভাবক—কাউকেই দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ দেওয়া যায় না।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬