‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

ইউরোপের ৭ দেশের গুরুত্বপূর্ণ খবর: সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, ঐতিহাসিক নির্বাচনী পালাবদল, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ঝড়ের তাণ্ডব

ইউরোপের ৭ দেশের  গুরুত্বপূর্ণ খবর:  সরকারবিরোধী বিক্ষোভ, ঐতিহাসিক নির্বাচনী পালাবদল, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও ঝড়ের তাণ্ডব

ইউরোপ প্রতিনিধি, ২৭ অক্টোবর:

ইউরোপের রাজনীতি ও জনজীবনে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটছে। কোথাও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় হাজারো মানুষ রাস্তায় নেমেছেন, কোথাও ছাত্র আন্দোলনের হাত ধরে দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির পরাজয় ঘটেছে। আবার ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল ও আলবেনিয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট, দুর্নীতি এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই যুক্তরাজ্যসহ উত্তর ইউরোপের কয়েকটি দেশে আঘাত হানা ঝড়ে প্রাণহানি, বিদ্যুৎ বিপর্যয় ও যোগাযোগব্যবস্থায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।

২৭ অক্টোবরের সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ইউরোপের সাতটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ খবর তুলে ধরা হলো। প্রতিটি খবরের সঙ্গে থাকছে প্রাসঙ্গিক ছবির অনুসন্ধান, যাতে পাঠকেরা ঘটনাগুলোর দৃশ্যও দেখতে পারেন।

চেক প্রজাতন্ত্র: গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বিক্ষোভ, পিছু হটছে না সরকার

চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের অর্থায়নব্যবস্থা পরিবর্তনের সরকারি পরিকল্পনার বিরুদ্ধে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। রোববার, ২৫ অক্টোবর, ঐতিহাসিক ওল্ড টাউন স্কয়ারে আয়োজিত সমাবেশে বিক্ষোভকারীরা সরকারের প্রস্তাব প্রত্যাহার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষার দাবি জানান।

বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে চেক টেলিভিশন ও চেক রেডিওর অর্থায়নব্যবস্থা। বর্তমানে পরিবারভিত্তিক সম্প্রচার ফি থেকে প্রতিষ্ঠান দুটির অর্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসে। সরকার এই ফি বাতিল করে রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকে অর্থায়নের প্রস্তাব করেছে।

সমালোচকদের আশঙ্কা, অর্থায়ন সরাসরি সরকারের বাজেটের ওপর নির্ভরশীল হলে সম্প্রচারমাধ্যম দুটি রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে। প্রস্তাবটি কার্যকর হলে তাদের অর্থায়ন প্রায় ১৫ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই বাবিশের নেতৃত্বাধীন সরকার এবং কট্টর ডানপন্থী এসপিডি দলের সমর্থনে বিলটি এগোচ্ছে। গত শুক্রবার নির্ধারিত কার্যসূচির বাইরে বিলটির প্রাথমিক পাঠ উত্থাপন করা হয়। শনিবার ভোর ৪টা ৩৬ মিনিটে ভোটের পর বিলটি পরবর্তী আলোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট কমিটিতে পাঠানো হয়।

বিক্ষোভের পরও সরকার বিলটি প্রত্যাহার করতে রাজি হয়নি। ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী বাবিশ জানান, সরকার প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করবে না। তবে এর বিভিন্ন ধারা নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে। বিকল্প হিসেবে স্বেচ্ছামূলক লাইসেন্স ফি প্রদানের ব্যবস্থাও বিবেচনায় রয়েছে বলে তিনি জানান।

অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলো বিলটির সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করার পরিকল্পনা করছে। গণমাধ্যমকর্মীরা ৩ নভেম্বর ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছেন।

পরবর্তী পরিস্থিতি: বিলটির চূড়ান্ত পরিণতি নির্ভর করছে পার্লামেন্টের পরবর্তী আলোচনা, সম্ভাব্য সংশোধন এবং গণমাধ্যমকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিবাদের ওপর। আপাতত সরকার ও বিরোধীদের অবস্থানে বড় ধরনের সমঝোতার ইঙ্গিত নেই।

সার্বিয়া: ছাত্র আন্দোলনের কাছে পরাজয় স্বীকার ভুচিচের, নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা

সার্বিয়ার রাজনীতিতে বড় ধরনের পালাবদল ঘটেছে। প্রায় ১৪ বছর ধরে দেশটির রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী আলেক্সান্দার ভুচিচের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটকে পরাজিত করেছে ছাত্রসমর্থিত ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’।

২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত আগাম সংসদ নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে ছাত্র আন্দোলন-সমর্থিত প্রার্থীরা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে যান। এরপর ভুচিচ নিজেই পরাজয় স্বীকার করেন।

সার্বিয়ার সরকারি নির্বাচনী কমিশনের ২৬ অক্টোবর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৮ হাজার ১৩৫টি ভোটকেন্দ্রের হিসাবের ভিত্তিতে স্টুডেন্ট লিস্ট পেয়েছে ৫২ দশমিক ৬৫ শতাংশ ভোট। ভুচিচের নেতৃত্বাধীন ‘ইউনাইটেড সার্বিয়া’ পেয়েছে ৩৯ দশমিক ২২ শতাংশ ভোট।

অন্যদিকে, রয়টার্সের প্রতিবেদনে প্রায় ৯৯ শতাংশ ভোট গণনার ভিত্তিতে ছাত্রসমর্থিত জোটের ২৫০ আসনের সংসদে ১৩৯টি আসন পাওয়ার তথ্য জানানো হয়েছে। ভুচিচের জোট পেতে পারে ৯৭টি আসন।

এই আন্দোলনের সূত্রপাত ২০২৪ সালে নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর। দুর্ঘটনার পর দুর্নীতি, সরকারি জবাবদিহি ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করেন। প্রায় দুই বছর ধরে চলা এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।

নির্বাচনী বিজয় উদ্‌যাপনে বেলগ্রেডসহ বিভিন্ন এলাকায় সমর্থকেরা রাস্তায় নেমে আসেন। তবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আনন্দের পাশাপাশি নতুন সরকার কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে, তা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে।

ছাত্র আন্দোলন দুর্নীতি দমন, শিক্ষা খাতের সংস্কার ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু আন্দোলনটি কোনো একক নেতার নেতৃত্বে পরিচালিত না হওয়ায় নতুন সরকারে নেতৃত্ব বণ্টন ও নীতিনির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক, রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতা, কসোভো প্রশ্ন এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নতুন নেতৃত্বের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

পরবর্তী পরিস্থিতি: নির্বাচনী ফলাফল প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালেও নতুন সরকার গঠন এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সংসদের অধিবেশন ও সরকার গঠনের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে রয়েছে সার্বিয়া।

ফ্রান্স: জীবনযাত্রার ব্যয় ও শিক্ষা সংকট নিয়ে বিক্ষোভ, গ্রেপ্তার প্রায় এক হাজার

ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংকট এবং সামাজিক বৈষম্যের প্রতিবাদে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবার, ২৪ অক্টোবর, রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামেন।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে প্যারিসে ছিলেন প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার। তবে শ্রমিক ইউনিয়ন সিজিটি দাবি করেছে, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ।

আন্দোলনটি প্রথমে স্কুলে শিক্ষক ও কর্মীসংকট এবং শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ হিসেবে শুরু হয়েছিল। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয়, আবাসন সমস্যা, দারিদ্র্য এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ।

বিক্ষোভের একটি অংশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও প্যারিসসহ কয়েকটি শহরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। মুখোশধারী কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ও আতশবাজি ছুড়লে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, শব্দবোমা ও জলকামান ব্যবহার করে।

দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজের বক্তব্য অনুযায়ী, বিক্ষোভের ঘটনায় প্রায় এক হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল।

আন্দোলনকারীদের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংখ্যা বাড়ানো, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নত করা, শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

ফ্রান্সের রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য পরিস্থিতি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে শিক্ষা, আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে তরুণদের অসন্তোষ সরকারের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।

পরবর্তী পরিস্থিতি: বিক্ষোভের পর সরকার নিরাপত্তা জোরদার করেছে। তবে আন্দোলনকারীদের মূল দাবিগুলোর বিষয়ে বড় ধরনের সমাধান ঘোষিত হয়েছে—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি শান্ত হলেও সামাজিক অসন্তোষের অবসান হয়েছে বলে মনে করার কারণ নেই।

ইতালি: জীবনযাত্রার ব্যয়, মজুরি ও সরকারি সেবা নিয়ে বিক্ষোভ

ইতালির বিভিন্ন শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং যুদ্ধসংক্রান্ত নীতির প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে।

মিলান, রোম, তুরিন, নেপলস, বোলোনিয়া ও ফ্লোরেন্সে অনুষ্ঠিত সমাবেশে শ্রমিক, শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন। তাঁদের দাবির মধ্যে রয়েছে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান কমানো, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং সরকারি স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি।

শনিবারের বিক্ষোভে কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। ইতালীয় পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আটটি শহরের বিক্ষোভে ৩৭১ জনকে সাময়িকভাবে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁদের মধ্যে ১১০ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। নয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও জানানো হয়।

ইতালিতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, নিম্ন আয়ের মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা এবং সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে অসন্তোষ দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ। সাম্প্রতিক বিক্ষোভে এসব প্রশ্নের সঙ্গে যুদ্ধ ও প্রতিরক্ষা ব্যয়সংক্রান্ত বিতর্কও যুক্ত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বৈঠক করেছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

পরবর্তী পরিস্থিতি: আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে প্রতি শনিবার বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা জানানো হয়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে সরকারকে জনঅসন্তোষ মোকাবিলায় আরও চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।

স্পেন: পেনশন সুরক্ষা ও আবাসন সংকট নিয়ে বাড়ছে অসন্তোষ

স্পেনে পেনশনব্যবস্থা সুরক্ষা, জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবসরভাতা বৃদ্ধি এবং সাশ্রয়ী আবাসনের দাবিতে প্রতিবাদ হয়েছে।

রাজধানী মাদ্রিদে পেনশনভোগী ও তাঁদের সমর্থকেরা শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নেন। তাঁদের দাবি, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেনশন বাড়াতে হবে এবং নিম্ন পেনশনের পরিমাণ এমন পর্যায়ে নিতে হবে, যাতে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা ন্যূনতম জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করতে পারেন।

আন্দোলনকারীরা নারী ও পুরুষের পেনশনের ব্যবধান কমানো এবং সরকারি পেনশনব্যবস্থাকে বেসরকারীকরণের চাপ থেকে সুরক্ষিত রাখার দাবিও জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, স্পেনের বিভিন্ন শহরে আবাসন সংকট বিশেষ করে তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাড়িভাড়া ও বাড়ির মূল্য আয়ের তুলনায় বেশি হওয়ায় অনেকের পক্ষে স্বতন্ত্রভাবে বসবাস করা কঠিন হচ্ছে।

এদিকে শিক্ষা খাতেও অসন্তোষ রয়েছে। শিক্ষকদের কর্মপরিবেশ, বেতন ও সরকারি শিক্ষায় বিনিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ হয়েছে।

পরবর্তী পরিস্থিতি: পেনশন ও আবাসন নিয়ে বিতর্ক স্পেনের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকছে। তবে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পর সব দাবির বিষয়ে সরকার নতুন কোনো সমাধান ঘোষণা করেছে—এমন নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

পর্তুগাল: আবাসন সংকটে বিপাকে তরুণেরা, সাশ্রয়ী বাড়ির দাবিতে প্রতিবাদ

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে সাশ্রয়ী আবাসনের দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে। বাড়িভাড়া ও বাড়ির দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠেছে।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বেতন ও আয় বাড়ার তুলনায় আবাসন ব্যয় দ্রুত বেড়েছে। ফলে অনেক পরিবারকে আয়ের বড় অংশ বাড়িভাড়ায় ব্যয় করতে হচ্ছে। তরুণদের একটি অংশের পক্ষে স্বাধীনভাবে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস করা কিংবা বাড়ি কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এর আগে লিসবন ও পোর্তোতে আবাসন সংকটের প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থানে তাঁবু স্থাপন করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলনকারীরা। পরে পুলিশ কয়েকটি অবস্থানস্থল সরিয়ে দেয় এবং ওই অভিযানে ৫৫ জনকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়।

পর্তুগালের আবাসন সমস্যার পেছনে বাড়ির চাহিদা, সরবরাহের সীমাবদ্ধতা, পর্যটনকেন্দ্রিক ভাড়াবাজার এবং স্থানীয় মানুষের আয়ের সঙ্গে বাড়ির দামের অসামঞ্জস্যসহ বিভিন্ন কারণ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

আন্দোলনকারীরা সরকারের কাছে সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ, বাড়িভাড়ার চাপ কমানো এবং নিম্ন আয়ের পরিবারের জন্য কার্যকর সহায়তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।

পরবর্তী পরিস্থিতি: আবাসন সংকট নিয়ে নাগরিকদের ক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। তবে বিক্ষোভের পর সরকার কতটা নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে, সে বিষয়ে সর্বশেষ নিশ্চিত তথ্য সীমিত।

আলবেনিয়া: দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল তিরানা, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ

আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় দুর্নীতি ও সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে। শনিবারের সমাবেশে শিক্ষার্থী, শিল্পী, বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমর্থক এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা অংশ নেন।

বিক্ষোভকারীরা সরকারের জবাবদিহি, দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। একপর্যায়ে কয়েকটি সরকারি ভবন লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা ঘটে। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।

সাম্প্রতিক আন্দোলনে পুলিশ ও বিক্ষোভকারী উভয় পক্ষের মানুষ আহত হয়েছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে আহতের সংখ্যা তিন শতাধিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে হতাহতের চূড়ান্ত হিসাব ও প্রতিটি ঘটনার বিস্তারিত স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আলবেনিয়ায় দুর্নীতি, সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের বিষয়। সাম্প্রতিক বিক্ষোভে শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করেছে।

পরবর্তী পরিস্থিতি: রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। তবে দুর্নীতি ও জবাবদিহির দাবিতে আন্দোলন পুরোপুরি থেমে গেছে—এমন তথ্য নেই।

যুক্তরাজ্য ও উত্তর ইউরোপ: ঝড়ে দুইজনের মৃত্যু, হাজারো বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই

যুক্তরাজ্যসহ উত্তর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অস্টেন ও বোয়েলো নামের দুটি ঝড়ের আঘাতে প্রাণহানি, বিদ্যুৎ বিপর্যয় এবং পরিবহনব্যবস্থায় ব্যাপক বিঘ্ন ঘটেছে।

২৬ অক্টোবর প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যে ঝড়ের কারণে গাছ পড়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। স্কটল্যান্ডের ডামফ্রিজ অ্যান্ড গ্যালোওয়ে এলাকায় ৬০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি এবং উত্তর লন্ডনের ফিঞ্চলিতে বিশের কোঠায় থাকা আরেক ব্যক্তি গাছ পড়ে প্রাণ হারান।

ঝড়ের তীব্রতায় স্কটল্যান্ডের আরগাইল অ্যান্ড বুট এলাকায় ঘণ্টায় প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হয়। গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়ে সড়ক ও রেল যোগাযোগে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। স্কটল্যান্ডের কয়েকটি এলাকায় বন্যার পানিতে রাস্তাঘাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের এনার্জি নেটওয়ার্কস অ্যাসোসিয়েশনের ২৬ অক্টোবর সকালের তথ্য অনুযায়ী, তখনো প্রায় ৯০ হাজার গ্রাহকের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল। সপ্তাহান্তে প্রায় সাত লাখ গ্রাহকের বিদ্যুৎ পুনরায় চালু করতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ করতে হয়েছে।

ফ্রান্সে ঝড়ের সর্বোচ্চ প্রভাবে প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। ২৫ অক্টোবর দুপুরেও প্রায় ৫৯ হাজার বাড়িতে বিদ্যুৎ ছিল না। জার্মানির ফ্রাইবুর্গ ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ১০ হাজার বাড়ির বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়।

ঝড়ের কারণে আমস্টারডাম শিফল বিমানবন্দরসহ উত্তর ইউরোপের বিভিন্ন বিমানবন্দরে শত শত ফ্লাইট বাতিল বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামেও ঝড়ের প্রভাব পড়ে।

নতুন আবহাওয়া সতর্কতা

২৬ অক্টোবর যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর নতুন করে ঝোড়ো বাতাসের সতর্কতা জারি করে। পশ্চিম উপকূলের কয়েকটি এলাকায় সোমবার সন্ধ্যা থেকে মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত এবং স্কটল্যান্ডের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মঙ্গলবার দিনের বিভিন্ন সময়ে শক্তিশালী বাতাসের আশঙ্কা জানানো হয়।

উন্মুক্ত উপকূলীয় এলাকায় ঘণ্টায় প্রায় ১০৫ কিলোমিটার পর্যন্ত দমকা হাওয়া এবং স্কটল্যান্ডের উত্তরে আরও শক্তিশালী বাতাসের সম্ভাবনার কথা বলা হয়। এতে যাতায়াতে বিঘ্ন, সড়ক বন্ধ এবং নতুন করে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

পরবর্তী পরিস্থিতি: ঝড়ের প্রধান ধাক্কা কিছুটা কমলেও বিদ্যুৎ পুনরুদ্ধার ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার কাজ চলছিল। ২৭ অক্টোবরের জন্য নতুন করে বড় ধরনের প্রাণহানি বা বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের নিশ্চিত হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই আগের দিনের পরিসংখ্যানকে বর্তমান মুহূর্তের চূড়ান্ত হিসাব হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

ইউরোপের সামগ্রিক পরিস্থিতি: জনঅসন্তোষ, রাজনৈতিক পরিবর্তন ও দুর্যোগের চাপ

২৭ অক্টোবর পর্যন্ত পাওয়া তথ্য থেকে ইউরোপের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে তিনটি বড় প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

প্রথমত, রাজনৈতিক জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চেক প্রজাতন্ত্রে গণমাধ্যমের অর্থায়ন নিয়ে বিক্ষোভ এবং সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলনের নির্বাচনী সাফল্য এর গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

দ্বিতীয়ত, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ফ্রান্সে শিক্ষা ও মূল্যস্ফীতি, ইতালিতে মজুরি ও সরকারি পরিষেবা, স্পেনে পেনশন এবং পর্তুগালে আবাসন সংকট বিক্ষোভের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে উঠেছে। আলবেনিয়ায় দুর্নীতি ও জবাবদিহির প্রশ্ন আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে।

তৃতীয়ত, প্রাকৃতিক দুর্যোগ জনজীবন ও অর্থনীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিতে ঝড়ের কারণে বিদ্যুৎ ও পরিবহনব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও সময় দিতে হচ্ছে।

তবে এসব ঘটনাকে ইউরোপের সব দেশের অভিন্ন সংকট হিসেবে দেখা যাবে না। প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা আলাদা। কোনো কোনো দেশে বিক্ষোভ মূলত নির্দিষ্ট নীতির বিরুদ্ধে, আবার কোথাও তা দীর্ঘদিনের অসন্তোষের প্রকাশ।

সব মিলিয়ে ইউরোপের সরকারগুলোর সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো নাগরিকদের আস্থা পুনরুদ্ধার, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলা এবং দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা।