‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ৫৩ ।। একটি ঝরা মুক্তা
।। একটি ঝরা মুক্তা ।।
উৎসর্গ
পথের ধুলোয় ঝরে পড়া সেই সব মুক্তার প্রতি, যাদের মূল্য বোঝার মতো চোখ পৃথিবীর খুব কম মানুষেরই আছে।

একটি ঝরা মুক্তা
‘মা, ঢাকায় আমার ভালো লাগে না। বান্ধবীর কাছ থেকে পাওনা টাকা নিয়ে কাল ময়মনসিংহে নানির বাড়ি চলে যাব।’
এগারো বছরের মুক্তা আক্তারের কথাগুলো শুনে মা মোসা. নাজমা হয়তো ভেবেছিলেন, মেয়েটা আবার অভিমান করেছে। একটু পরেই সব ঠিক হয়ে যাবে। মেয়েকে বুকে টেনে আদর করবেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দেবেন। কিন্তু সেদিন আর মেয়েকে বুকে টেনে নেওয়া হয়নি।
১৫ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান আবাসিক এলাকার বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল মুক্তা। যাওয়ার আগে মাকে বলে গিয়েছিল তার ছোট্ট ইচ্ছের কথা।
রাত বাড়তে থাকে। নাজমা পরিচিতদের কাছে খোঁজ নেন, দরজার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করেন। প্রতিটি শব্দে তাঁর মনে হয়, এই বুঝি মুক্তা ফিরে এল। কিন্তু রাত পেরিয়ে সকাল হয়, মুক্তা ফেরে না।
দুই দিন পর খবর আসে, মুক্তা হাসপাতালে আছে। মা ও মামারা ছুটে যান শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। মায়ের বুকের মধ্যে তখন আশঙ্কার পাশাপাশি ক্ষীণ একটি আশা—মেয়েটা বেঁচে আছে, হয়তো কোথাও আঘাত পেয়েছে। মা গেলে নিশ্চয়ই কেঁদে বুকে ঝাঁপিয়ে পড়বে।
কিন্তু হাসপাতালের কোথাও মুক্তাকে পাওয়া যায় না।
শেষ পর্যন্ত মর্গে গিয়ে একটি ছবি দেখান নাজমা। মর্গের ইনচার্জ মো. জীবন হাসান ছবিটি দেখে জানান, মুক্তার মরদেহ সেখানে ছিল।
শ্যামলী বাসস্ট্যান্ডের কাছে একটি ট্রাকের চাপায় গুরুতর আহত হয়েছিল মুক্তা। পথচারীরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মুক্তা আর নেই!
তবু মায়ের মনে একটি আশা ছিল—শেষবারের মতো মেয়ের মুখটা দেখবেন। যে মুখে এত দিন হাসি দেখেছেন, সেই মুখে একবার হাত বুলিয়ে দেবেন। কপালে চুমু খেয়ে বলবেন, ‘মা, তুই আমাকে ছেড়ে চলে গেলি?’
কিন্তু সেই সুযোগটুকুও আর রইল না।

মুক্তার মা নাজমা বেগম
নাজমাকে জানানো হয়, মুক্তার মরদেহ ইতিমধ্যে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে দাফনও হয়ে গেছে। খবরটি শুনে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি।
একজন মা সন্তানকে হারিয়েছেন, হারিয়েছেন শেষবারের মতো তার মুখ দেখার সুযোগও। পরে তাঁকে দেখানো হয়েছে কবরের ছবি। যে মুখটি দেখার জন্য হাসপাতালের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটেছেন, সেই মুখের বদলে হাতে পেয়েছেন একটি কবরের ছবি!
মুক্তার বাবা মো. রাজীবও মেয়ের শোক সইতে পারছেন না। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব শেষ হয়ে গেছে তাঁর। যে মেয়েকে ঘিরে কত স্বপ্ন ছিল, সেই মেয়ের স্মৃতিই এখন তাঁর সম্বল।
ঘরের কোনো কোণে এখনো পড়ে আছে মুক্তার বইখাতা, জামাকাপড় কিংবা ব্যবহার করা কোনো ছোট্ট জিনিস। সেগুলো দেখলে নাজমার মনে হয়তো পড়ে, এই তো সেদিনও মেয়েটি ঘরে ছিল। বড় হয়ে শিক্ষক হবে বলেছিল। নিজের পায়ে দাঁড়াবে, মাকে সুখী করবে।
এখন আর কেউ মুক্তাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য তাড়া দেবে না। বান্ধবীর কাছ থেকে পাওনা টাকা আনার কথাও আর কেউ জিজ্ঞেস করবে না। শুধু মা-বাবার বুকের মধ্যে মেয়েটি বেঁচে থাকবে—একটি অসমাপ্ত স্বপ্ন হয়ে।
মুক্তার মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়নি তার পরিবারের দুর্ভোগ। নাজমার প্রশ্ন, বেওয়ারিশ মরদেহ সাত দিন রাখার নিয়ম থাকার পরও তাঁর মেয়েকে এত তাড়াতাড়ি দাফন করা হলো কেন? পরিবারকে খবর দেওয়া হলো না কেন? যে ট্রাকটি মেয়ের জীবন কেড়ে নিল, সেটিকে শনাক্ত করে চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা নিয়েও তিনি উদ্বিগ্ন। মোহাম্মদপুর থানার পুলিশ সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করে ট্রাকটি শনাক্তের চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছিল।
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রয়োজন। একটি শিশুর মৃত্যু যেন কাগজপত্রের ভিড়ে হারিয়ে না যায়, আর কোনো পরিবার যেন প্রিয়জনকে হারিয়ে শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ থেকেও বঞ্চিত না হয়।
মুক্তা একা নয়। বাংলাদেশের কত মা প্রতিদিন সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে ফেরার অপেক্ষায় থাকেন। কত বাবা কাজের ফাঁকে সন্তানের মুখ দেখার স্বপ্ন বুকে রাখেন। অথচ কোনো এক বেপরোয়া গাড়ির চাকায় মুহূর্তেই থেমে যায় সেই অপেক্ষা, ভেঙে যায় একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ।
সেদিন একটি ঘরে মা কাঁদেন, বাবা নির্বাক হয়ে বসে থাকেন। কিছুদিন পর খবরের কাগজে নতুন দুর্ঘটনার সংবাদ আসে। পুরোনো কান্নার ওপর জমে ওঠে নতুন কান্না।
আমরা আর কত মুক্তা ঝরে পড়তে দেব?
সড়ক নিরাপদ করা, আইন কার্যকর করা এবং দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এখনই জরুরি। আর কোনো মাকে যেন সন্তানের মুখের বদলে কবরের ছবি হাতে নিয়ে ফিরতে না হয়।
মুক্তা আর ফিরবে না। কিন্তু তার মতো আর কোনো শিশুর জীবন যেন এভাবে ঝরে না যায়।
একটি মুক্তা ঝরে গেছে। তার মায়ের কান্না যেন আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তোলে।
লন্ডন, ২৮ অক্টোবর ২০২৬