“যেখানে সময়ের শব্দে উঠে আসে সত্য”
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৬৮।। লালনের ‘অচিন পাখির সন্ধানে’ ঘরছাড়া মোমিন সাধু বনাম একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট
উৎসর্গ:
স্রষ্টার সন্ধানে যাঁরা পথ চলেন, তাঁদের প্রতি—যেন আত্মার মুক্তি খুঁজতে গিয়ে পরিবার ও স্রষ্টার মূল বাণী কখনো ভুলে যান না।

সম্প্রতি বাংলাদেশের দৈনিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে চোখ আটকে গেল। পড়লাম ভাল করে। ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখির’ খোঁজে ঘরছাড়া মোমিন শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে কুমিল্লার আব্দুল মোমিনের জীবনবদলের কাহিনি। সরকারি তিতুমীর কলেজে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স পড়া শেষ করে তাঁর স্বপ্ন ছিল বিসিএস ক্যাডার হওয়া। কিন্তু লালন সাঁইয়ের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’ পঙ্ক্তিটি তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে ২০১৮ সালে পরিবার ও প্রচলিত জীবনের স্বপ্ন ছেড়ে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় চলে যান তিনি। পরে পরিচিত হন ‘মোমিন সাধু’ নামে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর আকাঙ্ক্ষা সত্যের সন্ধান, জ্ঞান অর্জন এবং মিথ্যা, হিংসা, অহংকার ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত থাকা। পৃথিবীর সব মানুষকে একই পরিবারের সদস্য হিসেবে দেখার কথাও বলেছেন তিনি।
তাঁর এসব আকাঙ্ক্ষায় আত্মশুদ্ধি ও মানবপ্রেমের ইতিবাচক দিক রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, স্রষ্টার নৈকট্য লাভের জন্য কি ঘর-সংসার ছেড়ে যাওয়া অপরিহার্য? মা-বাবা, পরিবার ও সামাজিক দায়িত্ব থেকে দূরে থাকাই কি একজন সত্যসন্ধানীর আদর্শ? তাই এখানে শুধূ একজন মোমিন সাধুর মতো ধারণা পোষণ করে ঘর ছেড়েছেন বা ঘর ছাড়তে মনস্ত করেছেন তাদের মতো চিন্তা চেতনার সকলের উদ্দেশ্যে আজকের এ আলোচনা। আমরা এখানে বিশ্লেষণ করে দেখতে সচেষ্ট হবো আসলে আমাদের সৃষ্টিকর্তা এসব বিষয়ে কি বলেছেন। আসুন কলামের গভীরে প্রবেশ করা যাক। আশা করছি, চিন্তাশীল প্রকৃত মোমিনগন এতে নিঃসন্দেহে ভাবনার খোরাক পাবেন।

দেহ খাঁচা, আত্মা পাখি—কিন্তু জীবন কি শুধু আত্মার?
লালনের ‘অচিন পাখি’ মানুষের জীবন, মৃত্যু ও আত্মপরিচয় নিয়ে গভীর ভাবনার জন্ম দেয়। কিন্তু মরমি গানের রূপক আর স্রষ্টার প্রত্যাদেশ এক বিষয় নয়।
কেউ প্রচলিত জীবনের প্রতিযোগিতা ছেড়ে সরল জীবন বেছে নিতে পারেন, জ্ঞানচর্চা করতে পারেন কিংবা মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারেন। তবে আত্মিক উন্নতির জন্য অন্যের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব ত্যাগ করতেই হবে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে ধর্মীয় নির্দেশনা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ আল্লাহর বান্দা, মা-বাবার সন্তান, পরিবারের সদস্য এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল ব্যক্তি। নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার পাশাপাশি অন্যের অধিকার রক্ষা করাও তার কর্তব্য।
কোরআন কি সংসার ত্যাগ করতে বলেছে?
পবিত্র কোরআনের সূরা আল-কাসাসের ৭৭ নম্বর আয়াতে আখিরাতের কল্যাণ অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে, তবে দুনিয়ার বৈধ প্রাপ্য অংশ ভুলে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের প্রতি কল্যাণ করার নির্দেশও রয়েছে।
এ আয়াতের শিক্ষা হলো, আখিরাতের প্রস্তুতি নিতে হবে, কিন্তু দুনিয়ার দায়িত্ব অস্বীকার করে নয়। ইসলাম বৈধ উপার্জন, পরিবার প্রতিপালন কিংবা সামাজিক দায়িত্বকে আত্মশুদ্ধির পরিপন্থী মনে করে না।
সংসারে থেকেও মানুষ মিথ্যা, লোভ, হিংসা ও অহংকার থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করতে পারেন। আবার সংসার থেকে দূরে থাকলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আত্মিক উৎকর্ষ অর্জন করেন না। মানুষের প্রকৃত পরিচয় নির্ধারিত হয় তার বিশ্বাস, কাজ ও নৈতিকতার মাধ্যমে।
মা-বাবা ও স্ত্রী-সন্তানের অধিকার কি আত্মসাধনার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ?
সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোমিন সাধু তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে সবার বড়। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল, তিনি ভালো চাকরি করে সংসারের হাল ধরবেন। কিন্তু তাঁর ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্ত মা-বাবা মেনে নিতে পারেননি। পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগও প্রায় বিচ্ছিন্ন।
তাঁর ব্যক্তিগত পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত না জেনে চূড়ান্ত বিচার করা ঠিক হবে না। তবে প্রশ্ন হলো, আত্মিক সাধনার জন্য মা-বাবার অধিকার উপেক্ষা করা কি গ্রহণযোগ্য?
সূরা আল-ইসরা ১৭:২৩–২৪ আয়াতে আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি মা-বাবার প্রতি সদাচরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করতে এবং তাঁদের জন্য দোয়া করতে বলা হয়েছে।
অবশ্য মা-বাবা বা স্ত্রী সন্তানের প্রত্যাশা পূরণ করা মানেই তাঁদের প্রতিটি ইচ্ছা মেনে নেওয়া নয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিজের পেশা ও জীবনপথ বেছে নিতে পারেন। কিন্তু সেই স্বাধীনতা প্রয়োগের সময় মা-বাবার প্রয়োজন ও ন্যায্য অধিকার উপেক্ষা করা উচিত নয়।
আত্মশুদ্ধির পথ এমন হওয়া উচিত, যাতে নিজের মুক্তির সন্ধানে অন্যের ন্যায্য অধিকার বিপন্ন না হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কি সংসার ছেড়ে নির্জনে সাধনা করেছেন?
ইসলামে প্রকৃত মুমিনের আদর্শ বুঝতে হলে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন দেখতে হবে, কোন মরমী কবি বা সুফি দরবেশের জীবন নয়। তিনি আল্লাহর ইবাদত করেছেন, আবার পরিবার ও সমাজের প্রতিও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি সংসারবিমুখ জীবনকে আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেননি।
সহিহ বুখারির ৫১৯৯ নম্বর হাদিসে আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা.)-কে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইবাদতের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষার শিক্ষা দেন। তিনি বোঝান, শরীরের যেমন অধিকার আছে, তেমনি স্ত্রীরও অধিকার রয়েছে।
সালমান ফারসি (রা.) ও আবু দারদা (রা.)-এর ঘটনাতেও একই শিক্ষা রয়েছে। সালমান (রা.) বলেন, আল্লাহর, নিজের শরীরের এবং পরিবারের অধিকার রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন করেন। ঘটনাটি সহিহ বুখারিতে বর্ণিত।
এ থেকে বোঝা যায়, অতিরিক্ত ইবাদতের নামে শরীরকে অযথা কষ্ট দেওয়া কিংবা পরিবারের অধিকার অবহেলা করা ইসলামের আদর্শ নয়। প্রকৃত মুমিন ব্যক্তিগত ইবাদতের পাশাপাশি অন্যের অধিকার রক্ষায়ও সচেতন থাকেন।
স্ত্রী-সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব কি দুনিয়াবি বন্ধন?
আধ্যাত্মিকতার নামে কখনো সংসারকে সত্য অনুসন্ধানের বাধা হিসেবে দেখা হয়। অথচ ইসলামে পরিবারকে গুরুত্বপূর্ণ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
সূরা আর-রুমের ২১ নম্বর আয়াতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে প্রশান্তি, ভালোবাসা ও দয়ার কথা বলা হয়েছে। সূরা আত-তাহরিমের ৬ নম্বর আয়াতে নিজেদের পাশাপাশি পরিবারকেও রক্ষা করার নির্দেশ রয়েছে।
একজন বাবা সন্তানের ভরণপোষণের জন্য পরিশ্রম করেন, একজন মা সন্তানের যত্ন নেন, একজন সন্তান বৃদ্ধ মা-বাবার পাশে দাঁড়ান। এসব দায়িত্ব আন্তরিকতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে পালন করাও নৈতিক ও ধর্মীয় জীবনের অংশ হতে পারে।
পরিবার আত্মিক উন্নতির বাধা নয়; বরং ধৈর্য, ক্ষমা, ত্যাগ ও ভালোবাসার চর্চার মধ্য দিয়ে মানুষ নিজের চরিত্র গড়ে তুলতে পারে।
সত্যের সন্ধান কি শুধু আখড়ায়, মাজারে কিংবা নির্জনে?

মোমিন সাধু মিথ্যা, গিবত, হিংসা, অহংকার ও রাগ থেকে মুক্ত হতে চান। এসব আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ইসলামের নৈতিক শিক্ষার মিল রয়েছে।
কিন্তু এসব গুণ অর্জনের জন্য পরিবার ও সমাজ থেকে দূরে চলে যাওয়া কি অপরিহার্য?
মানুষের নৈতিকতার পরীক্ষা হয় অন্য মানুষের সঙ্গে বসবাসের মধ্যেই। কেউ অপমান করলে ক্ষমা করা, অন্যায় সুযোগ পেয়েও তা গ্রহণ না করা, দুর্বলের অধিকার রক্ষা করা এবং নিজের স্বার্থের বিপরীতে হলেও সত্য বলা—এসব আত্মশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ দিক।
সূরা আন-নিসার ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহর ইবাদতের পাশাপাশি মা-বাবা, আত্মীয়স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত ও প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্জনতা আত্মসমালোচনা ও ইবাদতের সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু নির্জনতাই সত্য লাভের একমাত্র পথ নয়। মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালন এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকার মধ্যেও আত্মশুদ্ধি সম্ভব।

সব মানুষ এক পরিবারের সদস্য—এই দর্শন কতটা গ্রহণযোগ্য?
মোমিন সাধুর একটি ইতিবাচক আকাঙ্ক্ষা হলো, তিনি পৃথিবীর সব মানুষকে একই পরিবারের সদস্য হিসেবে দেখতে চান। ধর্ম, জাতি ও গোত্রের বিভেদ পেরিয়ে ভালোবাসা প্রতিষ্ঠার কথা বলেছেন।
সূরা আল-হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, মানবজাতিকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করা হয়েছে, যাতে মানুষ পরস্পরকে চিনতে পারে। আল্লাহর কাছে মর্যাদার মানদণ্ড হিসেবে তাকওয়াকে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তো ইচ্ছে করলে সবাইকে এক ধর্মের করে সৃষ্টি করতে পারতেন। কিন্তু তিনি মানুষের স্বাধীনতা দিয়েছেন। তাই ভিন্ন দেশ, ভিন্ন ধর্ম ইত্যাদি তো থাকবেই। একটি বাগানে যদি শুধু গোলাপ বা রজনীগন্ধা নামে একটা মাত্র ফুল থাকে তাহলে তো কোন বৈচিত্র থাকে না। বাগান হতে হয় বিভিন্ন নামের ও রঙের ফুলে। পৃথিবীটাও তাই। সেজন্য পৃথিবীতে নানা বংশ, ধর্ম, বর্ণ, জাতি, গোষ্ঠী ইত্যাদি থাকবেই।
সুতরাং বংশ, জাতি কিংবা সামাজিক পরিচয়ের অহংকারের পরিবর্তে নৈতিকতা ও আল্লাহ-সচেতনতার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
তবে সব মানুষকে ভালোবাসা এবং সব ধর্মীয় বিশ্বাসকে একই বলে ঘোষণা করা এক বিষয় নয়। একজন মানুষ নিজের ধর্মীয় বিশ্বাসে অবিচল থেকেও অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি সম্মান, ন্যায়বিচার ও সহমর্মিতা দেখাতে পারেন। এটাই তো দুনিয়াতে মানুষের পরীক্ষা।
ধর্মকে ঘৃণা ও বিদ্বেষের হাতিয়ার বানানো যেমন অনুচিত, তেমনি ধর্মীয় পার্থক্যের কারণে অন্যকে অসৎ মনে করাও যুক্তিসংগত নয়।

বিসিএসের স্বপ্ন ছেড়ে সাধুজীবন—ব্যক্তিস্বাধীনতা বনাম সামাজিক দায়িত্ব
একজন মানুষ কি প্রচলিত পেশা ও পরিবারের প্রত্যাশার বাইরে নিজের পছন্দমতো জীবন বেছে নিতে পারেন? অবশ্যই পারেন। সবাইকে বিসিএস ক্যাডার, চিকিৎসক, প্রকৌশলী কিংবা ব্যবসায়ী হতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই।
তাই শুধু বিসিএসের স্বপ্ন ছেড়ে দিয়েছেন বলে মোমিনের সিদ্ধান্তকে ভুল বলা যায় না। তাঁর ব্যক্তিগত সাধনা কিংবা জীবনযাপন নিয়ে বিদ্রূপ করাও অনুচিত।
কিন্তু ব্যক্তিস্বাধীনতার পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্বের প্রশ্ন রয়েছে। নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নিজের ওপর নির্ভরশীল মানুষের ন্যায্য অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ।
চাকরি ছেড়ে দেওয়া আর দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া এক কথা নয়। প্রচলিত জীবনপথ পরিত্যাগ করেও দায়িত্বশীল থাকা সম্ভব। আবার সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েও দায়িত্বহীন হওয়া সম্ভব।
মোমিনের ক্ষেত্রে ঠিক কোন দায়িত্ব অপূর্ণ রয়েছে, তা প্রতিবেদনের তথ্য দিয়ে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তাই ব্যক্তিকে দোষারোপ না করে তাঁর জীবনকাহিনির মধ্য দিয়ে বৃহত্তর নৈতিক প্রশ্নটি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

স্রষ্টার কাছে যাওয়ার পথ: দায়িত্ব থেকে পলায়ন, নাকি দায়িত্বের মধ্যেই সাধনা?
ইসলামের দৃষ্টিতে আত্মশুদ্ধি মানে নিজের অহংকার, লোভ, হিংসা, মিথ্যা ও অন্যায় প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করা। সত্যের অনুসন্ধান মানে জ্ঞান অর্জন, নিজের ভুল সংশোধন এবং ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য উপলব্ধি করা।
কিন্তু এসব অর্জনের জন্য মা-বাবা, পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্ব ত্যাগ করতেই হবে—এমন ধারণা কোরআন ও সুন্নাহর সামগ্রিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ইসলাম দুনিয়ার প্রতি অন্ধ আসক্ত হতে বলে না; আবার সব দায়িত্ব অস্বীকার করতেও বলে না। বরং বৈধ উপায়ে জীবনযাপন, অন্যের অধিকার রক্ষা এবং আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণের মাধ্যমে আখিরাতের প্রস্তুতি নিতে শেখায়।
একজন মানুষ সংসারে থেকেও আল্লাহকে স্মরণ করতে পারেন, কর্মক্ষেত্রে সততা বজায় রাখতে পারেন, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন এবং অসহায় মানুষের পাশে থাকতে পারেন। এসব কাজও তাঁর নৈতিক ও আত্মিক জীবনের অংশ।
নিজের জীবনপথ বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা আছে; কিন্তু সেই পথকেই স্রষ্টার একমাত্র মনোনীত পথ বলে দাবি করার আগে যথাযথ ধর্মীয় ভিত্তি থাকা প্রয়োজন।
খাঁচার পাখির খোঁজে মানুষ যেন মানুষকে না ভোলে
লালন সাঁইয়ের ‘অচিন পাখি’ মানুষকে জীবন, মৃত্যু ও আত্মপরিচয় নিয়ে ভাবতে শেখায়। মোমিন সাধুর জীবনও সেই ভাবনার একটি উদাহরণ। তাঁর সত্যের অনুসন্ধান, আত্মশুদ্ধির আকাঙ্ক্ষা ও মানবপ্রেমকে অবজ্ঞা করার প্রয়োজন নেই।
তবে ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক উপলব্ধি আর স্রষ্টার নির্দেশ এক বিষয় নয়। ইসলামের শিক্ষা বুঝতে হলে একজন মোমিনকে (অবশ্যই মোমিন সাধুদের মতো মানুষকেও যারা নিজেকে মুসলিম দাবি করেন)) কোরআন ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শের দিকে তাকাতে হবে।
ইসলাম আল্লাহর ইবাদত, মা-বাবার প্রতি সদাচরণ, পরিবারের অধিকার রক্ষা এবং মানুষের সঙ্গে ন্যায় ও দয়ার আচরণ করতে শেখায়। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনও ইবাদত ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়।
তাই স্রষ্টার নৈকট্য লাভের জন্য ঘর-সংসার ছেড়ে যেতেই হবে—এমন সিদ্ধান্ত কোরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে প্রতিষ্ঠিত নয়। বরং মানুষের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাসম্ভব যথাযথভাবে পালন করাও ধর্মীয় কর্তব্যের অংশ।
সত্যের সন্ধানে মানুষ ঘর ছাড়তে পারে; কিন্তু সত্যের নামে মানুষের প্রতি দায়িত্ব অস্বীকার করাই যে স্রষ্টার ইচ্ছা—এ কথা বলার অধিকার কারও নেই।
আত্মার শুদ্ধি চাইলে মানুষের প্রতি মমতা বাড়ুক, অহংকার কমুক, অন্যায় থেকে দূরে থাকার শক্তি তৈরি হোক। সেই সাধনার মধ্য দিয়ে পরিবার, সমাজ ও মানবতার প্রতি দায়িত্ব পালনের মানসিকতাও গড়ে উঠুক। কারণ, একজন মানুষের নৈতিকতার বড় পরীক্ষা হলো—তিনি অন্য মানুষের অধিকার কতটা সম্মান করেন।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ২১ অক্টোবর, ২০২৬