ঝাঁকে ঝাঁকে জাটকা, কারেন্ট জালে আটকা—হাসি ছড়িয়ে যিনি হয়ে উঠেছিলেন আপন
ভয়েস অব পিপল বিনোদন ডেস্ক ফিচার : বাংলা অভিনয়ের জগতে এমন কিছু শিল্পী আছেন, যাঁদের নাম সময়ের স্রোতে খানিকটা ঝাপসা হয়ে গেলেও মুখের হাসি আর অভিনয়ের উষ্ণতা আজও দর্শকের মনে আলাদা জায়গা করে আছে। জনপ্রিয় অভিনেতা সুজা খন্দকার তেমনই একজন শিল্পী। জন্মদিন এলেই তাঁকে ঘিরে স্মৃতির পাতায় ফিরে আসে সেই হাসিমাখা মুখ, রসিক সংলাপ আর সাবলীল অভিনয়ের কথা।
১৯৪১ সালের ২৮ জানুয়ারি পাবনা জেলায় জন্ম নেওয়া সুজা খন্দকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। অভিনয়জগতে পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা পেলেও পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন বাংলাদেশ বিমানের একজন কর্মকর্তা। সহকর্মী ও বন্ধুমহলে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘মজার মানুষ সুজা খন্দকার’ নামে।

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’-এ অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর সিনেমা যাত্রা শুরু। এরপর দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় চলচ্চিত্র। তাঁর অভিনীত ছবির তালিকায় রয়েছে—পায়ে চলার পথ, দেনা-পাওনা, সাধু শয়তান, সুজন সখি, সারেং বউ, তাসের ঘর, সখি তুমি কার, সুখের সংসার, এখনই সময়, পেনশন, তিনকন্যা, সাহেব, লালু সর্দার, বিক্ষোভ, তোমাকে চাই, দেনমোহর, মায়ের অধিকার, প্রিয় তুমি—সহ আরও অনেক ছবি।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি মঞ্চ, বেতার ও টেলিভিশন নাটকেও ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। টেলিভিশনের পর্দায় নানা মজার ও চরিত্রনির্ভর ভূমিকায় সহজ-সাবলীল অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি দর্শকদের মন জয় করেছেন। একসময় টেলিভিশন নাটকের আলোচিত ও তুমুল জনপ্রিয় চরিত্র ‘সাদেক আলী’ হয়ে ওঠেন সুজা খন্দকার। বিশেষ করে জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক ‘আজ রোববার’-এ তাঁর উপস্থিতি দর্শকের কাছে আজও স্মরণীয়।
টিভি বিজ্ঞাপনেও তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল চোখে পড়ার মতো। কারেন্ট জালে জাটকা ইলিশ মাছ ধরার বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপনে তাঁর বলা সংলাপ—‘ঝাঁকে ঝাঁকে জাটকা, কারেন্ট জালে আটকা’—একসময় ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। এই একটি সংলাপই তাঁকে নতুনভাবে পরিচিত করে তোলে সাধারণ মানুষের কাছে।
অভিনয়ের আরেকটি অনন্য দৃষ্টান্ত তিনি রেখেছেন শহীদুল্লাহ কায়সারের কালজয়ী উপন্যাস ‘সংশপ্তক’ অবলম্বনে নির্মিত একই নামের নাটকে ‘গগন ডাক্তার’ চরিত্রে। গভীর মানবিকতা আর আবেগে ভরপুর এই চরিত্রটি তিনি এমন প্রাঞ্জলভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন, যা আজও দর্শকের মনে দাগ কেটে আছে।
সব বয়সী দর্শকের কাছেই সুজা খন্দকার ছিলেন ভালো লাগার, ভালোবাসার মানুষ। তাঁর অভিনয়ে ছিল রসবোধ, কিন্তু সেই সঙ্গে ছিল জীবনঘনিষ্ঠতা ও মানবিক স্পর্শ।
১৯৯৭ সালের ২ মার্চ তিনি না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান। তবে তাঁর হাসি, সংলাপ আর অভিনয় আজও বেঁচে আছে দর্শকের স্মৃতিতে। জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করি এই প্রিয় অভিনেতাকে।