কলিকালের কলধ্বনি।। ৫২।। চিরন্তন লড়াকু এক সংগ্রামীর চিরবিদায়: খালেদা জিয়ার রাজনীতি ও জীবন
।। কলিকালের কলধ্বনি-৫২।।
।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর।।

উৎসর্গ
বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, আপসহীন নেত্রী এবং চিরন্তন সংগ্রামী বেগম খালেদা জিয়ার স্মৃতিতে।
যিনি দেশপ্রেম, সাহসিকতা ও নেতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আমাদের মনে বেঁচে থাকবেন।
বছরের শেষ প্রান্তে এসে সকাল ৬টায় বাংলাদেশ রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। চলে গেলেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। খবরটি যতই অফিসিয়াল হোক, হৃদয়ে সেটা একটা শূন্যতার সৃষ্টি করেছে—একটি আপসহীন নেত্রীর, এক সংগ্রামী নারীর, এক যুগের রাজনীতির বিদায়।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে। ১৯৬০ সালে জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহিত হন, স্বামীর হত্যার পর রাজনৈতিক দায়িত্বগ্রহণ করেন। ১৯৮২ সালে বিএনপিতে সাধারণ সদস্যপদ গ্রহণ, ১০ বছরের কম সময়ের মধ্যে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়া—এগুলো শুধু রাজনৈতিক অর্জন নয়, এটি এক নারীর দৃঢ়তার গল্প।

বেগম জিয়া তাঁর জীবনের প্রথম রাজনৈতিক জনসভা করেছিলেন সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে। তখন তাঁর বয়স হয়তো ছিল ৩৭/৩৮ বছর । আমি আমার সেই তরুণ বয়সে প্রথম তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দেখেছিলাম সেই জনসভায়। তখন অনুভব করেছিলাম, একজন মানুষ, যাঁর আপসহীন মনোবল ও দৃঢ়তা দিয়ে তিনি শুধু দলের নেতা নয়, দেশের প্রতিরক্ষা ও গণতন্ত্রের প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়েছেন। এখনও স্পষ্ট মনে পড়ে, সেদিন ছিল খুবই গরম। তাঁর সামনে , ডানে, বামে বেশ কিছু বড় বড় লম্বা স্টান্ড ফ্যান রাখা হয়েছিল। তবুও তিনি গরমে বারবার নিজে নিজেকে ফুঁ দিচ্ছিলেন। পরনে ছিল সাদা শাড়ি। প্রথম জনসভায় তাঁর কন্ঠ শুনে খুবই চিকন কন্ঠ মনে হয়েছিল। অবশ্য পরে তাঁর কন্ঠ অনেক ভরাট হয়ে ওঠে। তিনি আজীবন খুবই স্বল্পভাষী মানুষ ছিলেন। সেদিনও কম কথায় বক্তব্য শেষ করেছিলেন। এখনও মনে পড়ে, স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর যখন সমাহিত করতে নিয়ে যাওয়া হয় তখন খাটিয়া ধরে তাঁর কাঁদবার দৃশ্য। তখন বিটিভিতে দেখেছিলাম। একজন সাধারণ গৃহবধু থেকে দুই সন্তানকে বড় করতে করতে তিনি হয়ে উঠেছিলেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। এটা সাধারণ কোন ব্যাপার নয় বাংলাদেশের তখনকার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে।

খালেদা জিয়ার জীবন ছিল সংগ্রামের, কিন্তু তাতে থেমে থাকেননি। ১৯৮৭ সালে শুরু হওয়া ‘এরশাদ হটাও’ আন্দোলন থেকে ১৯৯১ সালের নির্বাচন—সবই তার রাজনৈতিক দৃঢ়তার সাক্ষ্য। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন, সার্কের চেয়ারপারসন হিসেবে দুইবার দায়িত্ব নেওয়া, পাঁচটি জাতীয় নির্বাচনে ২৩টি আসনে জয়ী হওয়া—এই সংখ্যা শুধু রেকর্ড নয়, এটি প্রতিফলন তার সংগ্রাম, নেতৃত্ব এবং জনগণের সঙ্গে তার অটুট সম্পর্কের।
২০০৭ সালের এক–এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে তার ও পরিবারের ওপর প্রয়োগ করা হয়েছিল রাজনৈতিক চাপে। বিদেশে পাঠানোর নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তিনি দৃঢ় থাকেন। বলেছিলেন, “দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নাই, এটাই আমার ঠিকানা। এই দেশের মাটি-মানুষই আমার সবকিছু।” এই কথাগুলো শুধু ভাষা নয়, এটি তার জীবনের সারসংক্ষেপ—দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ এবং আপসহীনতা।

খালেদা জিয়া শুধু একজন নেত্রী ছিলেন না; তিনি একজন প্রতীকি চরিত্র, যিনি দেশের রাজনীতি, নারীর ক্ষমতায়ন এবং দলের ঐক্যের জন্য সব সময় সংগ্রাম করেছেন। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রয়েছে। মৃত্যুর খবরে আন্তর্জাতিক স্তরেও শোকের ছাপ দেখা গেছে। জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইরান, ভারত, পাকিস্তান ও চীন—সবাই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান স্মরণ করেছে।

বছরের পর বছর রাজনীতি, আন্দোলন ও দায়িত্বের বোঝা বহন করার পরেও খালেদা জিয়ার চরিত্রের মধ্যে ছিল মানবিক স্পর্শ। পরিবারের প্রতি যত্ন, দলের প্রতি দায়বদ্ধতা, দেশের জন্য সংগ্রাম—এগুলো মিলিয়ে গড়ে উঠেছিল এক অসাধারণ নেতা।
আজ আমরা শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে হারাইনি; হারালাম দেশের রাজনীতির এক যুগ, সাহস, আপসহীনতা ও সংগ্রামের এক প্রতীক। তাঁর রূহের শান্তি কামনা করি। কিন্তু তার জীবন, আদর্শ, নেতৃত্ব ও সংগ্রামের চেতনা বাংলাদেশে চিরকাল উদ্ভাসিত থাকবে।
খালেদা জিয়ার জীবন এক শিক্ষা, এক অনুপ্রেরণা—যে শিক্ষা বলে, নেতৃত্ব মানে ক্ষমতা নয়, দায়বদ্ধতা; জয় মানে সংখ্যার খেলা নয়, জনগণের সঙ্গে অবিচল সম্পর্ক। আর সেই শিক্ষা, এই স্মৃতি, আমাদের রাজনীতিতে চিরজাগরুক হয়ে থাকবে।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক ও সাবেক অধ্যাপক
৩০ ডিসেম্বর ২০২৫