বিশেষ সম্পাদকীয়।। "এক প্রজন্মের প্রতীক: বেগম খালেদা জিয়ার অবসান"

বিশেষ সম্পাদকীয়।।  "এক প্রজন্মের প্রতীক: বেগম খালেদা জিয়ার অবসান"

আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া চলে গেছেন। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি চিরনিদ্রায় প্রবেশ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। এই প্রস্থান কেবল একজন নেত্রীর নয়, বরং একটি দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও গণতান্ত্রিক আদর্শের গল্পের সমাপ্তি।

বেগম খালেদা জিয়ার জীবন শুরু হয়েছিল সাধারণ, লাজুক ও সংযমী একজন গৃহবধূ হিসেবে। কিন্তু ইতিহাসের দরজা যখন খুলল, তখন তিনি তার ভেতরের নেত্রীকে প্রকাশ করলেন। স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার পর দলের হাল ধরার দায়িত্ব, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান, ১/১১-এর ষড়যন্ত্র মোকাবিলা—সবই তাকে দেশের রাজনীতিতে এক অনন্য মর্যাদা দিয়েছে। সে সময়ের রাজনৈতিক হিংসা ও ষড়যন্ত্রের মধ্যেও তিনি কখনো নত হননি, প্রতিটি সিদ্ধান্তই তার দৃঢ় মনোভাবের প্রমাণ।

১৯৯১ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর তিনি দেশের সরকার ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রপতি-নির্ভর থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে রূপান্তরিত করেন। তার আমলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, অবকাঠামো, পরিবেশ এবং নারীর ক্ষমতায়ন ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা ও উপবৃত্তি, যমুনা বহুমুখী সেতু, টেলিযোগাযোগ খাতে জনগণের নাগালের সেবা—সবই তার দূরদর্শিতা এবং দেশের উন্নয়নের প্রতি তার অঙ্গীকারকে প্রমাণ করে।

রাজনীতিতে নেমে তিনি কখনো ব্যক্তিগত শোক, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা কঠিন পরিস্থিতির সামনে আপোষ করেননি। ২০০৭–২০০৮ সালের এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার, বিদেশে যাওয়ার প্রলোভন এবং দীর্ঘ কারাবাস—সবই তাকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিল। কিন্তু দেশ ছাড়ার প্রলোভন অগ্রাহ্য করে তিনি দেশে থেকে রাজনীতির দায় নেন। মিথ্যা মামলা, গ্রেপ্তার ও মানসিক নিপীড়নের মধ্যেও তার আদর্শ এবং নীতি অটল ছিল। এই সাহস ও স্থিরতার জন্যই তিনি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গণতন্ত্রের এক অমূল্য প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন।

বেগম খালেদা জিয়া শুধু রাজনৈতিক নেত্রী নন, তিনি এক প্রজন্মের প্রতীক। তার জীবন দর্শন, ত্যাগ ও সংগ্রাম প্রমাণ করে যে গণতন্ত্র এবং ন্যায়ের জন্য লড়াই কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। তিনি নিজের জীবনকে জনগণ ও দেশের কল্যাণে উৎসর্গ করেছেন। যে নেত্রী দেশের মাটির প্রতি তার অঙ্গীকারকে কখনো ছাড়েননি, তার আদর্শ আজও আমাদের পথপ্রদর্শক।

আজ তিনি চলে গেলেও তার প্রতিটি পদক্ষেপ, সিদ্ধান্ত ও সংগ্রাম বাংলাদেশের ইতিহাসে অম্লান। তার বিদায় শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো দেশের জন্য একটি ক্ষতি। তবে তার জীবনকাহিনী ও ত্যাগ চিরকাল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। বেগম খালেদা জিয়া এখন শান্তিতে বিশ্রাম নিচ্ছেন; আমাদের দায়িত্ব তার স্বপ্নের বাংলাদেশের জন্য কাজ চালিয়ে যাওয়া।