ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

শিক্ষার্থী বেশি, বিশ্বমানে নেই বাংলাদেশ: কলা ও মানবিক শিক্ষায় আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে শূন্য অর্জন

শিক্ষার্থী বেশি, বিশ্বমানে নেই বাংলাদেশ: কলা ও মানবিক শিক্ষায় আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে শূন্য অর্জন

বাংলাদেশ প্রতিনিধি, ১ আগস্ট:  দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কলা, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হলেও আন্তর্জাতিক মানের মূল্যায়নে এ খাতের অবস্থান এখনো হতাশাজনক। যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কিউএস (QS) প্রকাশিত ২০২৬ সালের বিষয়ভিত্তিক র‍্যাংকিংয়ে বিশ্বের ৫৫২টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থান পেলেও বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কলা ও মানবিক বিষয়ে জায়গা করে নিতে পারেনি।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৪২ শতাংশই কলা ও মানবিক অনুষদে অধ্যয়ন করছেন। সংখ্যার হিসেবে এ শিক্ষার্থী ১৯ লাখেরও বেশি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী এ ধারার বিষয়ে পড়ছেন। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় অংশজুড়েই রয়েছে কলা ও মানবিক শিক্ষা, কিন্তু আন্তর্জাতিক একাডেমিক মানদণ্ডে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।

শুধু ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এখন কলা ও সামাজিক বিজ্ঞানের বিস্তার ঘটেছে। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট আসনের উল্লেখযোগ্য অংশ সামাজিক বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বাংলা, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান কিংবা অন্যান্য মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী সংখ্যাও বিজ্ঞান বিভাগের সমপর্যায়ে পৌঁছেছে।

অথচ কিউএসের সর্বশেষ বিষয়ভিত্তিক র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় স্থান না পেলেও এশিয়ার ১৩১টি বিশ্ববিদ্যালয় তালিকাভুক্ত হয়েছে। চীনের ২৬টি, জাপানের ১৪টি, মালয়েশিয়ার ১০টি, হংকংয়ের আটটি, ভারতের পাঁচটি এবং সিঙ্গাপুরের দুটি বিশ্ববিদ্যালয় এ তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। বৈশ্বিক তালিকার শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, আর এশিয়ার শীর্ষে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর।

শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষার্থী বেশি থাকলেও গবেষণা, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ও একাডেমিক উৎকর্ষে দীর্ঘদিনের দুর্বলতার কারণেই বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। গবেষণায় পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব, আন্তর্জাতিক মানের পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশনার সীমাবদ্ধতা, পাঠ্যক্রম আধুনিকায়নে ধীরগতি এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্কে সীমিত অংশগ্রহণ এ সংকটকে আরও গভীর করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুস সালাম বলেন, আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে গবেষণার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। কিন্তু দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণাবান্ধব পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় বরাদ্দের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে বিজ্ঞানের তুলনায় কলা ও মানবিক বিষয়ে গবেষণাকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।

তার মতে, মানসম্মত গবেষণার পাশাপাশি বিশ্বমানের জার্নালে প্রকাশনা বাড়ানো এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে পাঠ্যক্রমের সংযোগ জোরদার করাও জরুরি। অন্যথায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করেও কর্মসংস্থানে পিছিয়ে থাকবে।

ইউজিসির তথ্য বলছে, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা ও মানবিক বিষয়ের শিক্ষার্থীর অনুপাত সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও কয়েক হাজার শিক্ষার্থী এ অনুষদে অধ্যয়ন করলেও আন্তর্জাতিক বিষয়ভিত্তিক র‍্যাংকিংয়ে তাদের উপস্থিতি নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মো. আবুল কালাম সরকারের মতে, কিউএসের মূল্যায়নে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি অনেক শিক্ষক নিয়মিত গবেষণা-প্রোফাইল ও প্রকাশনার তথ্য হালনাগাদ করেন না। আবার বাংলা, পালি, উর্দু কিংবা ফার্সির মতো বিষয়ে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার সুযোগও সীমিত, যা র‍্যাংকিংয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বেলাল হোসেনও মনে করেন, বিজ্ঞান ও মানবিক গবেষণার মূল্যায়নের পদ্ধতি এক নয়। কলা অনুষদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা আন্তর্জাতিক জার্নালের পরিবর্তে বই আকারে প্রকাশিত হয়, যা কিউএসের মূল্যায়নে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।

একই ধরনের মত দিয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, মানবিক ও সমাজবিজ্ঞানের গবেষণার বড় অংশই স্থানীয় বাস্তবতা ও বাংলাদেশকেন্দ্রিক হওয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে উদ্ধৃত হওয়ার সুযোগ তুলনামূলক কম। তবে এটিকে গবেষণার মানের দুর্বলতা হিসেবে দেখা উচিত নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে এগিয়ে যেতে হলে গবেষণায় সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা সম্প্রসারণ, বিশ্বমানের জার্নালে প্রকাশনা বৃদ্ধি, শিক্ষক-গবেষকদের প্রোফাইল হালনাগাদ এবং আধুনিক ও কর্মমুখী পাঠ্যক্রম চালু করার বিকল্প নেই। অন্যথায় শিক্ষার্থীর সংখ্যায় এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশের কলা ও মানবিক শিক্ষা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই আড়ালেই থেকে যাবে।