‘‘গল্পকাররা বিশ্ব শাসন করে’’
নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ২৭।। পরীক্ষক যখন চা স্টলে
।। পরীক্ষক যখন চা স্টলে ।।
।। সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর ।।
উৎসর্গ
সকল সৎ, নিষ্ঠাবান ও বিবেকবান শিক্ষকের প্রতি, যাঁরা আজও একটি উত্তরপত্রকে একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ বলে বিশ্বাস করেন।

“স্যার, আর এক কাপ চা দেব?”
ফজলুল হকের প্রশ্নে মাথা নাড়েন ভদ্রলোক।
চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে তিনি আবার হাতে তুলে নেন লাল কলম। সামনে রাখা একটি খাতা উল্টে আরেকটি খাতা টেনে নেন। পাশ থেকে একজন বন্ধু হেসে বলেন,
— “এই উত্তরটার নম্বর একটু বেশি দেওয়া যায় না?”
আরেকজন খাতা হাতে নিয়ে বলেন,
— “এই ছেলেটা তো বেশ ভালো লিখেছে!”
শনিবার রাত সাড়ে ১১টা।
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের পাশের ছোট্ট সেই চায়ের দোকানটি তখন আর শুধু চায়ের দোকান নয়; অদৃশ্যভাবে সেটি যেন একটি পরীক্ষা কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
না, এখানে কোনো পরীক্ষার্থী নেই।
আছেন একজন পরীক্ষক।
সমাজ যাঁদের শ্রদ্ধা করে। যাঁদের বলা হয়—জাতির বিবেক।
সিলেট শহরের একটি স্বনামধন্য উইমেন্স কলেজের প্রভাষক ইকবাল লতিফ সোবহান। তাঁর সামনে এইচএসসি পরীক্ষার এক বস্তা উত্তরপত্র। চারপাশে বন্ধু-বান্ধব। গল্প চলছে, চা চলছে, আর চলতে থাকে লাল কলম।
চায়ের দোকানদার ফজলুল হক প্রথমে কিছুই অস্বাভাবিক মনে করেননি। কারণ এই মানুষগুলো তাঁর পরিচিত। প্রায়ই আসেন। শুক্রবার রাতেও এসেছিলেন। চা খেয়েছেন, আড্ডা দিয়েছেন। সেদিনও সঙ্গে ছিল খাতা।
তিনি ভেবেছিলেন, শিক্ষক মানুষ। নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ করছেন।
কিন্তু সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ কি সব জায়গায় করা যায়?
এই প্রশ্নটি তখনও তাঁর মনে আসেনি।
হঠাৎ রাতের নীরবতা ভেঙে কয়েকটি গাড়ি এসে থামে।
কয়েকজন মানুষ দ্রুত দোকানের ভেতরে ঢুকে পড়েন।
একজন শান্ত গলায় বলেন,
— “স্যার, একটু দাঁড়ান।”
চায়ের দোকানের হাসি থেমে যায়।
লাল কলম থেমে যায়।
চায়ের ধোঁয়াও যেন হঠাৎ ভারী হয়ে ওঠে।
খবর পেয়ে শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা সেখানে পৌঁছান।
টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা উত্তরপত্রগুলো গুনতে গুনতে তাঁদের মুখের অভিব্যক্তি বদলে যায়।
এক... দুই... দশ... একশো...
শেষ পর্যন্ত প্রায় চারশোটি উত্তরপত্র জব্দ করা হয়।
যে খাতাগুলোর প্রতিটি পাতায় লেখা ছিল একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, সেগুলো সেদিন চায়ের কাপের পাশেই পড়ে ছিল।
ইকবাল লতিফকে শিক্ষা বোর্ড নিজেদের হেফাজতে নেয়। পরে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে তাঁকে আবার নিজেদের হেফাজতে নিয়ে যায়।
পাশে থাকা তাঁর বন্ধু তনুজা লিনজা সমবেত মানুষদের উদ্দেশে বলতে থাকেন,
— “আমার কাছ থেকে তো কোনো খাতা নেয়নি। আমি কিছুই না। আমি শুধু বন্ধুর সঙ্গে ছিলাম।”
হয়তো তিনি শুধু বন্ধুর সঙ্গেই ছিলেন।
কিন্তু প্রশ্নটি সেখানেই শেষ হয় না।
একজন শিক্ষক যখন পরীক্ষক হন, তখন তিনি আর শুধু একজন বন্ধুর বন্ধু থাকেন না। তিনি হয়ে ওঠেন হাজারো শিক্ষার্থীর ভাগ্যের বিচারক।
লন্ডনের এক প্রান্তে বসে ঠিক এই খবরটিই পড়ছিলেন সাবেক অধ্যাপক রহমান সাহেব। পাশে তাঁর বন্ধু হারুন।
তরুণ বয়সে তিনিও বাংলাদেশের একটি কলেজে শিক্ষকতা করতেন। সেই সময় তিনিও ছিলেন বোর্ড পরীক্ষার একজন পরীক্ষক।
খবরটি পড়ে তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে আরেকটি রাত।
সেই রাতেও তিনি জেগে ছিলেন।
তবে চায়ের দোকানে নয়।
নিজের ঘরে।
টেবিলের এক পাশে উত্তরপত্র, অন্য পাশে পরীক্ষার নিয়মাবলি।
তিনি কলেজ থেকে ছুটি নিয়েছিলেন। কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল, পরীক্ষার খাতা দেখা মানে শুধু নম্বর দেওয়া নয়; একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা।
পনেরো দিনে সাড়ে তিনশোটি খাতা শেষ করেছিলেন তিনি।
দিনকে রাত করেছিলেন।
অনেক উত্তর দ্বিতীয়বার পড়েছিলেন।
কোনো মেধাবী শিক্ষার্থী যেন অবিচারের শিকার না হয়—এই ভয় তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াত।
আজ সেই মানুষটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বন্ধু হারুনকে বলেন,
— “আমরা খাতা দেখতাম দরজা বন্ধ করে, মন খুলে। এখন দেখি, কেউ কেউ খাতা দেখছেন দরজা খুলে, চায়ের দোকানে, আড্ডার ভেতর। এটা কি শুধু নিয়ম ভাঙা? নাকি এর চেয়েও বড় কিছু?”
একবার বোর্ডের সাড়ে তিনশোটি খাতা মূল্যায়ন শেষ করে ডাকযোগে পাঠানোর ঝুঁকি নেননি রহমান সাহেব। তাঁর ভয় ছিল, যদি খাতাগুলো ঠিকমতো না পৌঁছায়, তাহলে এতগুলো ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
তাই তিনি বন্ধু সবুরকে সঙ্গে নিয়ে সিলেট থেকে ট্রেনে কুলাউড়ায় প্রধান পরীক্ষকের স্কুলে চলে যান।
নিজ হাতে খাতাগুলো তুলে দেন প্রধান পরীক্ষকের কাছে।
খাতাগুলো দেখে প্রধান পরীক্ষক মৃদু হেসে বলেছিলেন,
— “রহমান সাহেব, আপনাদের মতো তরুণ শিক্ষকদের দেখলে মনটা ভরে যায়। কী সুন্দর করে সিট তৈরি করে এনেছেন! আপনাকে আমি ‘এ’ ক্যাটাগরির পরীক্ষক হিসেবে সুপারিশ করব।”
তিনি কথাও রেখেছিলেন।
এরপর প্রতি বছরই রহমান সাহেব বোর্ডের পরীক্ষক হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে রহমান সাহেব আবার বলেন,
— “মজার ব্যাপার কী জানেন? সেই প্রধান পরীক্ষকের নামও ছিল আপনার মতো—হারুণ উর রশীদ।”
তারপর আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,
— “আমি একজন কলেজ শিক্ষক ছিলাম। একবার বোর্ডের খাতা দেখার চিঠি পেয়ে এক সপ্তাহের জরুরি প্রশিক্ষণ অর্ধেক রেখে চলে এসেছিলাম। অথচ আজ এই ডিজিটাল যুগে এসে দেখি, আরেকজন কলেজ শিক্ষক প্রকাশ্যে বন্ধুদের নিয়ে চায়ের দোকানে বসে এইচএসসি পরীক্ষার খাতা দেখছেন! ভাবতেই পারি না। এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি বিবেকের প্রশ্ন।”
ধীরস্থির স্বভাবের হারুন সাহেব মাথা নাড়িয়ে বলেন,
— “একটি জাতি ধ্বংস হয় না শুধু অর্থনৈতিক সংকটে।
একটি জাতি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন তার সবচেয়ে সম্মানিত পেশাগুলোর ভেতর দায়িত্ববোধ ক্ষয়ে যেতে শুরু করে।
একজন চিকিৎসকের ভুলে একজন রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হন।
একজন বিচারকের ভুলে একজন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন।
কিন্তু একজন শিক্ষক কিংবা একজন সাংবাদিকের দায়িত্ববোধ হারিয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো একটি প্রজন্ম, পুরো একটি জাতি।”
সিলেটের সেই চায়ের দোকান আজও হয়তো খোলা আছে।
ফজলুল হক আজও চা বানান।
নতুন নতুন মানুষ আসে, গল্প করে, চলে যায়।
শুধু হয়তো সেই টেবিলটি নীরবে অপেক্ষা করে।
হয়তো কোনো একদিন আবার সেখানে একজন শিক্ষক বসবেন।
কিন্তু তাঁর সামনে থাকবে শুধু এক কাপ চা।
কোনো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নয়।
লন্ডন
৩ আগস্ট ২০২৬