‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’
৪৯% উত্তরদাতা EU-তে পুনরায় যোগ দেওয়ার পক্ষে, ব্রিটেনে আবারও Brexit বিতর্ক
ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৩ অক্টোবর :
ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে (EU) ফিরে যাওয়া উচিত কি না—এই প্রশ্ন আবারও দেশটির রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। নতুন এক বড় জনমত জরিপে ৪৯ শতাংশ উত্তরদাতা যুক্তরাজ্যের EU-তে পুনরায় যোগ দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। বিপরীতে ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ এ ধরনের প্রত্যাবর্তনের বিরোধিতা করেছেন।
যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ ইউরোপ-সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনার মধ্যেই এই জরিপ করেছে মেসিনা গ্রুপ বা TMG। ১২ থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১১ হাজার ৪৬১ জনের ওপর জরিপটি চালানো হয়। ২০১৬ সালের গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে নমুনাকে ভারসাম্যপূর্ণ করা হয়েছিল।

জরিপে EU-তে পুনরায় যোগ দেওয়াই ইউরোপের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের জন্য দেওয়া সাতটি বিকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সমর্থন পেয়েছে। তবে এটি একটি জনমত জরিপের ফলাফল; এর অর্থ এই নয় যে ব্রিটিশ সরকার EU-তে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বা সদস্যপদের জন্য আবেদন করতে যাচ্ছে।
EU-এর সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার অন্যান্য পথও জরিপে উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছে। বিদ্যমান সম্পর্ক বজায় রেখে বাণিজ্যিক বাধা যতটা সম্ভব কমানোর পক্ষে ছিলেন ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ। EU-এর সঙ্গে কাস্টমস ইউনিয়নে যাওয়ার পক্ষে ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ, একক বাজারে যোগ দেওয়ার পক্ষে ৪৫ দশমিক ১ শতাংশ এবং সহযোগী সদস্যপদের পক্ষে ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ মত দিয়েছেন।
অন্যদিকে EU থেকে আরও দূরে সরে যাওয়ার পক্ষে ছিলেন ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ উত্তরদাতা; ৪১ দশমিক ২ শতাংশ এর বিরোধিতা করেছেন।
জরিপে Brexit-এর অতীত ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। ৫২ দশমিক ৪ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, ২০১৬ সালে EU থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। ২৯ দশমিক ৭ শতাংশ মনে করেন সিদ্ধান্তটি সঠিক ছিল। Brexit সফল হয়েছে কি না—এই প্রশ্নে ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ একে ব্যর্থতা হিসেবে দেখেছেন, ১২ দশমিক ২ শতাংশ সফল বলেছেন।
তবে EU-তে ফেরার প্রশ্নে ব্রিটিশ জনমতকে একমুখী বলা যাচ্ছে না। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের মতো Brexit-এর পক্ষে ব্যবহৃত পুরোনো যুক্তিগুলোও এখনো একটি অংশের ভোটারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে জরিপে উঠে এসেছে।
সরকার কী বলছে
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম সম্প্রতি ব্রিটেনের সঙ্গে ইউরোপের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের বিভিন্ন সম্ভাবনা পর্যালোচনার কথা বলেছেন। পরে তিনি EU-তে পুরোপুরি ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনাও আলোচনার মধ্যে রাখার কথা জানান। তবে সরকার এখনই EU-তে পুনরায় সদস্য হওয়ার জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেয়নি।
বিষয়টি নিয়ে সরকারের ভেতরেও সতর্কতা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব আসনে ২০১৬ সালের গণভোটে EU ছাড়ার পক্ষে ভোট বেশি ছিল, সেসব এলাকার প্রতিনিধিত্বকারী কিছু মন্ত্রী Brexit-এর পুরোনো বিভাজন আবার সামনে চলে আসতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
Guardian-এর প্রতিবেদনে কয়েকজন মন্ত্রীর বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনা প্রয়োজন। অন্যদিকে কয়েকজন মন্ত্রী সতর্ক করেছেন যে EU-তে পুনরায় যোগ দেওয়ার প্রশ্নটি রাজনৈতিক ও সাংবিধানিকভাবে জটিল এবং এর ফলে পুরোনো বিভাজনও আবার সামনে আসতে পারে।
জরিপে আরও যা উঠে এসেছে
জরিপে ৬০ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা বলেছেন, যুক্তরাজ্যকে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে EU-কে যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত—যদি তিনটির মধ্যে একটি বেছে নিতে হয়।
প্রায় ৮০ শতাংশ উত্তরদাতা ব্রিটিশ পাউন্ড বজায় রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদ বা ECHR-এ থাকার পক্ষেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া গেছে—৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ পক্ষে এবং ২৪ দশমিক ২ শতাংশ বিপক্ষে।
EU-তে ফেরার সময় নিয়েও মতামতের পার্থক্য রয়েছে। ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ বলেছেন, যুক্তরাজ্যের অবিলম্বে EU-তে ফিরে যাওয়া উচিত। ২২ দশমিক ৯ শতাংশ আগামী তিন বছরের মধ্যে ফেরার পক্ষে এবং ৮ দশমিক ৪ শতাংশ আগামী এক দশকের মধ্যে ফেরার পক্ষে মত দিয়েছেন। ২৩ শতাংশ কোনোভাবেই EU-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চান না।
Brexit থেকে EU-তে ফেরার আলোচনায় ১০ বছরের পথ
২৩ জুন ২০১৬ — যুক্তরাজ্যে EU সদস্যপদ নিয়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ৫২ শতাংশ ভোটার EU ছাড়ার পক্ষে এবং ৪৮ শতাংশ থাকার পক্ষে ভোট দেন। মোট ৩ কোটি ৩৫ লাখের বেশি মানুষ ভোট দেন।
১৬ মার্চ ২০১৭ — ব্রিটিশ পার্লামেন্ট Article 50-এর অধীনে EU ছাড়ার প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য সরকারকে ক্ষমতা দেয়।
৩১ জানুয়ারি ২০২০ — যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করে। এরপর একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা Transition Period চালু থাকে।
৩১ ডিসেম্বর ২০২০ — Transition Period শেষ হয়। ব্রিটেন EU Single Market ও Customs Union থেকে বেরিয়ে যায়।
১ জানুয়ারি ২০২১ — EU-এর সঙ্গে নতুন Trade and Cooperation Agreement-এর অধীনে যুক্তরাজ্য ও EU-এর সম্পর্কের নতুন পর্যায় শুরু হয়।
২০২৬ — Brexit-এর প্রায় এক দশক পর নতুন জরিপে EU-তে পুনরায় যোগ দেওয়ার পক্ষে ৪৯ শতাংশ সমর্থন পাওয়া গেল। একই সময়ে ব্রিটিশ সরকারের ভেতরে ইউরোপের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে নতুন পর্যালোচনার কথাও সামনে এসেছে।
সামনে প্রশ্নটি কী?
ব্রিটেন এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বিতর্কটি শুধু “Brexit থাকবে নাকি বাতিল হবে”—এমন সরল প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। EU-তে পুরোপুরি ফিরে যাওয়া, কাস্টমস ইউনিয়নে যোগ দেওয়া, একক বাজারে প্রবেশ করা, সহযোগী সদস্যপদ নেওয়া কিংবা বর্তমান সম্পর্ক বজায় রেখে বাণিজ্যিক বাধা কমানোর মতো একাধিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
তবে এসবের কোনোটিই এখন পর্যন্ত সরকারের সিদ্ধান্ত নয়। আজকের জরিপ মূলত দেখাচ্ছে, Brexit-এর এক দশক পর ব্রিটিশ ভোটারদের মধ্যে ইউরোপের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে মতামত আগের তুলনায় কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং কোন কোন পথ নিয়ে জনমত তৈরি হচ্ছে।
ফলে ২০১৬ সালের গণভোটের প্রায় এক দশক পর ব্রিটিশ রাজনীতিতে আবারও ফিরে এসেছে পুরোনো ইউরোপ প্রশ্ন—তবে এবার প্রশ্নটি শুধু “Leave না Remain” নয়; বরং Brexit-এর পর ব্রিটেন ইউরোপের সঙ্গে ঠিক কতটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক চাইবে।