“যেখানে সময়ের শব্দে উঠে আসে সত্য”
কলিকালের কলধ্বনি ।। ১৬২।। কোন কিছুই বাদ নেই ভেজালের জালে, এই কলিকালে!
উৎসর্গ
এই সময়ের সেইসব মানুষকে,
যাদের বিবেক এখনো ভেজালমুক্ত

চলছে ভেজাল বিরোধী অভিযান
বাংলাদেশে ভেজাল এখন আর কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের সমস্যা নয়; যেন আমাদের সময়েরই আরেক নাম। বাজারের পণ্য থেকে শুরু করে এখন দেখছি মানুষের চিন্তাতে ভেজাল, চরিত্রে ভেজাল, শিশুর মধ্যে ভেজাল, কিশোরদের নিয়ে ভেজাল, বুড়োদের মধ্যে দেখি ভেজাল। গ্রাম থেকে শহর প্রায় সবখানে মানুষে মানুষে অতি তুচ্ছ কারনে বাঁধছে ভেজাল, কাটছে খাল, সেখানেও ভেজাল।
খাবার থেকে ওষুধ, মাদক থেকে রাজনীতি, অর্থনীতি থেকে ইতিহাস—কোনো কিছুই যেন ভেজালের জাল থেকে বাদ যাচ্ছে না। একসময় ভেজালকে আমরা অপরাধ হিসেবে দেখতাম; এখন তার অনেকটাই দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। আমরা দেখি, জানি, কখনো প্রতিবাদও করি—তারপরও মেনে নিই। আর এই মেনে নেওয়াই ভেজালকে আরও শক্তিশালী করে।

খাবারে ভেজাল বাংলাদেশে নতুন কোনো খবর নয়। চাল, আটা, ময়দা, ডাল, মসলা, তেল, মাছ, মাংস, দুধ—প্রায় সবকিছুকে ঘিরেই কোনো না কোনো সময় অভিযোগ উঠেছে। ফল পাকাতে ক্ষতিকর রাসায়নিক, খাবারে অননুমোদিত রং, মাছ-মাংস সতেজ রাখতে ক্ষতিকর উপাদান, এমনকি শিশুখাদ্যে ভেজালের খবরও বহু পুরোনো। ওষুধেও নকল বা নিম্নমানের পণ্যের অভিযোগ আছে। অর্থাৎ যে খাবার ও ওষুধ মানুষের জীবন রক্ষার কথা, সেখানেও কখনো ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
কিন্তু ভেজালের এই গল্প যে শুধু বাজারের পণ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, তার অদ্ভুত উদাহরণ মিলল মাদকের বাজারে। রাজশাহীর বাগানপাড়া রেললাইন এলাকায় জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি ও কোষ্ঠকাঠিন্যের ওষুধে লাল বা গোলাপি কালি লাগিয়ে সেগুলোকে ইয়াবা হিসেবে বিক্রির খবর এসেছে সংবাদমাধ্যমে। কম দামে ইয়াবা পাওয়ার আশায় গিয়ে কেউ কেউ কিনছেন রং মাখানো সাধারণ ওষুধ; এসব সেবন করে অসুস্থ হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। ভেজালের বাজার যে কতটা ‘উদ্ভাবনী’ হয়ে উঠেছে, এই ঘটনাই তার অস্বাভাবিক উদাহরণ।
মাদকের বাজারেও যখন ভেজাল ঢুকে পড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—ভেজাল কি শুধু পণ্যেই সীমাবদ্ধ? উত্তরটি আমাদের চারপাশেই ছড়িয়ে আছে। পণ্যের গণ্ডি পেরিয়ে ভেজাল এখন ঢুকে পড়েছে আমাদের চিন্তা ও মননেও।
ইতিহাসচর্চা তার একটি বড় উদাহরণ। ইতিহাসকে তার নিজস্ব সময়, প্রেক্ষাপট ও তথ্যের ভিত্তিতে না দেখে যখন বর্তমানের রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী কাউকে বড়, কাউকে ছোট কিংবা কাউকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়, তখন ইতিহাসের সঙ্গে ভেজাল মেশে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, গান্ধী, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, প্যাটেল—প্রত্যেকেরই ইতিহাসে নিজস্ব অবস্থান রয়েছে। তাঁদের কাউকে বর্তমানের রাজনৈতিক হিসাবের মধ্যে টেনে এনে নতুন পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করলে অতীতকে বোঝার বদলে আমরা তাকে ব্যবহার করতে শুরু করি।
ইতিহাসের কাজ কাউকে দেবতা বা খলনায়ক বানানো নয়; তথ্য, নথি ও প্রেক্ষাপটের আলোকে অতীতকে বোঝা। আর ইতিহাসকে দেখার এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্কও কম নয়। কারণ একটি সমাজের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেমন তার বর্তমানকে প্রভাবিত করে, তেমনি অতীতকে কীভাবে দেখা হবে, সেটিও অনেক সময় রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

রাজনীতিতেও তাই ভেজালের প্রশ্ন আছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে বাংলাদেশের রাজনীতি নানা বাঁক পেরিয়েছে—গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন হয়েছে, সরকার বদলেছে, নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটেছে; পাশাপাশি ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দলীয়করণ, রাজনৈতিক সংঘাত, সহিংসতা ও জবাবদিহির ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্র ও রাজনীতির সংস্কার নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। সেই সংস্কারের প্রশ্নে আলোচনা ও নানা উদ্যোগও হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কার শুধু নতুন মুখ, নতুন দল কিংবা নতুন স্লোগানে সম্পূর্ণ হয় না; এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, মতের ভিন্নতার প্রতি সহনশীলতা, ক্ষমতার জবাবদিহি এবং জনস্বার্থকে রাজনীতির কেন্দ্রে রাখা।
তাই রাজনীতির ‘ভেজাল’ বলতে কোনো একটি দল, ব্যক্তি বা সময়কে বোঝালে বিষয়টি ছোট হয়ে যায়। আসল সমস্যা তখনই, যখন আদর্শের জায়গা দখল করে কেবল ক্ষমতার হিসাব, জনস্বার্থের জায়গায় দলীয় স্বার্থ এবং জবাবদিহির জায়গায় অন্ধ আনুগত্য বসে যায়।
রাজনীতির এই আলোচনাই আমাদের আরেকটি জায়গায় নিয়ে যায়—অর্থনীতিতে। কারণ ক্ষমতা ও অর্থের সম্পর্ক অস্বীকার করার উপায় নেই। আর যখন অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে দ্রুত মুনাফাই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে ওঠে, তখন সেখানেও ভেজালের সুযোগ তৈরি হয়।
কম খরচে বেশি লাভ, নিম্নমানের পণ্য দিয়ে বেশি দাম আদায় কিংবা ভোক্তার অজ্ঞতার সুযোগ নেওয়া—এসবের পেছনে কাজ করে সেই দ্রুত মুনাফার মানসিকতা। একজনের অতিরিক্ত মুনাফা অন্যজনের চিকিৎসা ব্যয় হয়ে ফিরে আসতে পারে; একজনের অসাধু ব্যবসা একটি পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ তৈরি করতে পারে। অথচ লাভের হিসাব খুব সহজে করা হয়, ক্ষতির হিসাবটি থেকে যায় আড়ালে।
এই অর্থনৈতিক বাস্তবতার সবচেয়ে অস্বস্তিকর দিকটি তখনই সামনে আসে, যখন অর্থের হিসাব মানুষের মূল্যকেও ছাপিয়ে যায়। আর সেখান থেকেই ভেজালের গল্প এসে পৌঁছে যায় সমাজের সবচেয়ে সংবেদনশীল জায়গায়—শিশুর কাছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপে শিশু ‘দত্তক’ দেওয়ার নামে পোস্ট, দর-কষাকষি এবং টাকার অঙ্ক প্রকাশের খবর সামনে এসেছে। একটি পোস্টে ছয় মাস বয়সী একটি ছেলে শিশুর জন্য দুই লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে বলেও সংবাদে প্রকাশিত হয়েছে। দত্তক গ্রহণ অবশ্যই মানবিক ও আইনসম্মত প্রক্রিয়া হতে পারে; কিন্তু দত্তকের আড়ালে যদি শিশুকে কেনাবেচার বস্তু বানানো হয়, তাহলে সেটি শুধু অপরাধ নয়, মানবিকতার জন্যও ভয়ংকর সতর্কবার্তা।
একটি শিশু কোনো পণ্য নয়। তার কোনো বাজারদর হতে পারে না।
অথচ এখানেই আমাদের সময়ের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি সামনে আসে—আমরা কি ধীরে ধীরে এমন এক সমাজে পরিণত হচ্ছি, যেখানে সবকিছুকে অর্থমূল্যে মাপার প্রবণতা তৈরি হয়েছে? যেখানে খাবারের মান, ওষুধের নিরাপত্তা, ইতিহাসের সত্য, রাজনীতির আদর্শ, এমনকি একটি শিশুর জীবনও কোনো না কোনোভাবে লেনদেনের যুক্তির মুখোমুখি হচ্ছে?
সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, আমরা এসবের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। খাবারে ভেজাল হলে বলি, ‘সব জায়গাতেই আছে।’ নকল ওষুধ হলে বলি, ‘সাবধানে কিনতে হবে।’ মাদকে ভেজাল হলে বলি, ‘সস্তায় নিতে গেলে এমনই হয়।’ ইতিহাস বিকৃত হলে বলি, ‘প্রত্যেকে নিজের মতো লেখে।’ রাজনীতিতে অনৈতিকতা দেখলে বলি, ‘রাজনীতি এমনই।’ আর শিশু কেনাবেচার খবর দেখেও হয়তো কয়েক মুহূর্তের বিস্ময়ের পর অন্য খবরে চলে যাই।
এই ‘এমনই তো’ মানসিকতাই ভেজালের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
ভেজাল ঠেকাতে দেশে আইন আছে—নিরাপদ খাদ্য আইন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ফরমালিন নিয়ন্ত্রণসহ নানা ব্যবস্থা। অভিযান হয়, জরিমানাও হয়। কিন্তু আইন ও অভিযান তখনই কার্যকর হয়, যখন অপরাধ করে লাভবান হওয়ার সুযোগ কমে এবং মানুষের মধ্যে অন্যায়কে মেনে না নেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়। কারণ ভেজাল পণ্যের গণ্ডি পেরিয়ে অনেক আগেই সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
তাই আজ প্রশ্ন শুধু—খাবারে কী মেশানো হচ্ছে, ওষুধে কী মেশানো হচ্ছে কিংবা মায়াবড়িতে কী রং লাগানো হচ্ছে? প্রশ্ন আরও গভীর—আমাদের চিন্তায়, ইতিহাসে, রাজনীতিতে এবং মানবিকতায় কী মেশানো হচ্ছে?
একটি সমাজের সবচেয়ে ভয়ংকর অবস্থা তখনই, যখন মানুষ ভেজালকে আর ভেজাল বলে মনে করে না; বরং তাকে জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম বলে মেনে নেয়।
এই জায়গা থেকেই বের হতে হবে। আইন তার কাজ করবে, রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করবে; কিন্তু ব্যক্তির সততা, সামাজিক সচেতনতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস ছাড়া কোনো সমাজই পুরোপুরি ভেজালমুক্ত হতে পারে না।
ভেজালের এই কলিকালে তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন—আমরা কী খাচ্ছি, কী কিনছি বা কী বিক্রি করছি, তার পাশাপাশি আমরা কী বিশ্বাস করছি এবং কেমন মানুষ হয়ে উঠছি?
কারণ বাজারের ভেজাল পরীক্ষায় ধরা পড়ে;
মানুষের ভেতরের ভেজাল ধরা পড়ে তার কাজে।
লেখক: সম্পাদক, কলামিস্ট, বিশ্লেষক, গল্পকার ও সাবেক অধ্যাপক
লন্ডন, ৩ অক্টোবর, ২০২৬