‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

চীনা গোয়েন্দাদের জন্য গবেষণা, যুক্তরাজ্যের শতাধিক গবেষককে নিয়ে এমআই৫-এর সতর্কবার্তা

চীনা গোয়েন্দাদের জন্য গবেষণা, যুক্তরাজ্যের শতাধিক গবেষককে নিয়ে এমআই৫-এর সতর্কবার্তা

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৩ অক্টোবর :

যুক্তরাজ্যের শতাধিক গবেষক এমন কিছু গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন, যেগুলোর অর্থায়নের সঙ্গে চীনের গোয়েন্দা সংস্থার সম্পর্ক রয়েছে বলে দাবি করেছে ব্রিটিশ অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, গোপন যোগাযোগব্যবস্থা ও তথ্য লুকিয়ে পাঠানোর প্রযুক্তি—এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে পরিচালিত গবেষণা চীনের গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়াতে কাজে লাগতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।

৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বিশেষ গোয়েন্দা সতর্কবার্তায় এমআই৫ বলেছে, চায়না জেনারেল টেকনোলজি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিজিটিআরআই)-এর সঙ্গে চীনের মিনিস্ট্রি অব স্টেট সিকিউরিটি (এমএসএস)-এর ‘খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’ রয়েছে। এমআই৫-এর ভাষ্য অনুযায়ী, সিজিটিআরআইয়ের প্রধান উদ্দেশ্যগুলোর একটি হলো এমন গবেষণায় অর্থায়ন করা, যা এমএসএসের প্রযুক্তিগত গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়াতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি চায়না একাডেমি অব জেনারেল টেকনোলজি নামেও পরিচিত।

এমআই৫ জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের ১০০-এর বেশি সংশ্লিষ্ট গবেষক সিজিটিআরআইয়ের অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পে অবদান রেখেছেন। এসব গবেষণার মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, গোপন যোগাযোগব্যবস্থা এবং স্টেগানোগ্রাফি রয়েছে। স্টেগানোগ্রাফি এমন একটি প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে কোনো ফাইল, ছবি বা অন্য তথ্যের আড়ালে গোপন বার্তা লুকিয়ে পাঠানো যায়।

তবে এমআই৫-এর সতর্কবার্তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব গবেষক যে চীনা গোয়েন্দা সংস্থাকে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে কাজ করেছেন—এমন অভিযোগ করা হয়নি। বরং সংস্থাটি বলেছে, অনেক গবেষক ও প্রতিষ্ঠান হয়তো সিজিটিআরআইয়ের সঙ্গে সৎ বিশ্বাসেই কাজ করেছেন এবং গবেষণার অর্থের পেছনে এমএসএসের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে জানতেন না।

এ কারণেই যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সিজিটিআরআইয়ের সঙ্গে চলমান এবং ভবিষ্যৎ সব ধরনের সহযোগিতা পর্যালোচনার পরামর্শ দিয়েছে এমআই৫। একই সঙ্গে চীনা কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গবেষণা করার ক্ষেত্রে অর্থের চূড়ান্ত উৎস যাচাই করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

বিষয়টি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এমআই৫ গবেষকদের ২০২৩ সালের জাতীয় নিরাপত্তা আইন সম্পর্কেও সতর্ক করেছে। আইনের ৩ নম্বর ধারায় কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার যুক্তরাজ্য-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে জেনে বা যুক্তিসঙ্গতভাবে জানার কথা থাকা সত্ত্বেও গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করা অপরাধ হতে পারে। আর ১৭ নম্বর ধারায় বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে নির্দিষ্ট ধরনের বস্তুগত সুবিধা গ্রহণের বিষয়টিও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সিজিটিআরআইয়ের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক গবেষক স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনি অপরাধ করেছেন। আইনের ধারাগুলোতে ব্যক্তির জ্ঞান, উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এমআই৫ও বলেছে, যারা সিজিটিআরআইয়ের অর্থায়নে গবেষণা চালিয়ে যেতে চান, তাদের স্বাধীন আইনি পরামর্শ নেওয়া উচিত।

এদিকে লন্ডনে চীনা দূতাবাস এমআই৫-এর অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। দূতাবাসের একজন মুখপাত্র অভিযোগগুলোকে ‘কাল্পনিক ও সম্পূর্ণ বানানো’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, যুক্তরাজ্য ও চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে গবেষণা সহযোগিতা আইন মেনেই হয়ে থাকে। চীনা পক্ষ যুক্তরাজ্যকে এসব অভিযোগ ছড়িয়ে শিক্ষা ও গবেষণা সহযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত না করার আহ্বান জানিয়েছে।

এ ঘটনায় ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামনে এখন বড় প্রশ্ন শুধু বিদেশি অর্থ গ্রহণের নয়; বরং গবেষণার অর্থ কোথা থেকে আসছে, গবেষণার ফল কোথায় যাচ্ছে এবং দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি শেষ পর্যন্ত কার কাজে লাগতে পারে—এসব বিষয়ও নতুন করে যাচাই করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার এই প্রকাশ্য সতর্কবার্তা তাই যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং চীনের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা যাচাইকে নতুন গুরুত্বের সামনে নিয়ে এসেছে।