‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

ব্রিটিশ কর্মীর ঘাটতি মেটাতে বিদেশি শ্রমিক—‘সহজ পথ’ বেছে নিচ্ছেন মন্ত্রীরা: শাবানা মাহমুদ

ব্রিটিশ কর্মীর ঘাটতি মেটাতে বিদেশি শ্রমিক—‘সহজ পথ’ বেছে নিচ্ছেন মন্ত্রীরা: শাবানা মাহমুদ

নিজস্ব প্রতিবেদক, ৫ অক্টোবর :

ব্রিটেনে কোনো খাতে কর্মীর ঘাটতি দেখা দিলেই দেশীয় কর্মী তৈরি বা দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের বদলে বিদেশি কর্মী আনার পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে—সরকারের ভেতর থেকেই এমন সমালোচনা উঠেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেছেন, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মন্ত্রীরা তাঁকে নিয়মিত বিদেশি কর্মীদের জন্য ভিসা দেওয়ার অনুরোধ করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, এমন অনুরোধ প্রতি এক বা দুই সপ্তাহে অন্তত একবার তাঁর কাছে আসে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট দক্ষতার কর্মী—যেমন ঝালাই বা ওয়েল্ডিং কর্মী—আনার জন্য ১০টি ভিসার অনুরোধও করা হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, ব্রিটেনে যদি মাত্র ১০ জন ওয়েল্ডার প্রয়োজন হয়, তাহলে সেই কর্মী দেশেই খুঁজে বা প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করা যাচ্ছে না কেন?

শাবানা মাহমুদ বলেন, বিদেশি কর্মী আনার ভিসা ব্যবস্থা সরকারের কাছে এমন একটি ‘সহজে ব্যবহারযোগ্য পথ’ হয়ে গেছে, যার মাধ্যমে কোনো খাতে দ্রুত কর্মীর ঘাটতি পূরণ করা যায়। কিন্তু তাঁর মতে, এভাবে তাৎক্ষণিক ঘাটতি পূরণ করতে থাকলে দেশের নিজস্ব শ্রমশক্তির দক্ষতা উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দুর্বল হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, কোনো মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিতে বিষয়টি জরুরি হতে পারে—কাজের জায়গায় এখনই লোক দরকার, তাই বিদেশ থেকে কর্মী আনাই দ্রুত সমাধান। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর প্রশ্ন হলো, দেশের শ্রমবাজারের জন্য মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কোথায়? শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্দক্ষীকরণের মাধ্যমে ব্রিটেনে থাকা মানুষদের সেই কাজের উপযোগী করে তোলার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

শাবানা মাহমুদের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ব্রিটেনে বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। তাঁর যুক্তি, দেশের তরুণদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা তৈরির দিকে যথেষ্ট মনোযোগ না দিয়ে বিদেশ থেকে শ্রমিক আনা সহজ হয়ে গেলে এই সমস্যার সমাধান আরও পিছিয়ে যায়।

বিদেশি কর্মীদের নিয়োগের পেছনে শুধু দক্ষতার ঘাটতি নয়, কম শ্রমমূল্যও একটি কারণ হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বিশেষ করে সামাজিক পরিচর্যা বা কেয়ার খাতে বিদেশি কর্মীদের কম মজুরি ও দুর্বল কর্মপরিবেশে কাজ করার ঝুঁকি রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শ্রমিক আনার ক্ষেত্রে শুধু কতজন কর্মী প্রয়োজন তা নয়, তাঁদের বেতন, অধিকার ও কর্মপরিবেশও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

বিষয়টি ব্রিটেনের বর্তমান অভিবাসন নীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। একদিকে সরকার নেট অভিবাসন কমানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে স্বাস্থ্য, পরিচর্যা, নির্মাণ ও অন্যান্য খাতে কর্মীর ঘাটতি থাকলে বিদেশি কর্মীর ওপর নির্ভরতার দাবি উঠছে। ফলে সরকারের ভেতরেই ‘অভিবাসন কমানো’ বনাম ‘শ্রমিকের ঘাটতি পূরণ’—এই দুই প্রয়োজনের মধ্যে টানাপোড়েন স্পষ্ট হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে দ্য টাইমস জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাজ্যের নেট অভিবাসন কমে ১ লাখ ৭১ হাজারে নেমেছে; আগের বছর তা ছিল ৩ লাখ ৩১ হাজার এবং ২০২৩ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার। অর্থাৎ অভিবাসন কমানোর সরকারি নীতির পাশাপাশি শ্রমবাজারে বিদেশি কর্মীর প্রয়োজন নিয়ে বিতর্কটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এদিকে বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে আসা বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের নিয়ম আরও কঠোর করার প্রস্তাব নিয়েও লেবার পার্টির ভেতরে বিতর্ক চলছে। শাবানা মাহমুদের প্রস্তাবে অনেক অভিবাসীর অনির্দিষ্টকালের বসবাসের অনুমতি বা আইএলআর পাওয়ার পথ পাঁচ বছর থেকে দীর্ঘ হতে পারে। কেয়ার খাতে কাজ করা বিদেশি কর্মীদের ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত সময়সীমা নিয়ে বিশেষ সমালোচনা হয়েছে।

তবে শাবানা মাহমুদের বর্তমান বক্তব্যকে বিদেশি কর্মী সম্পূর্ণ বন্ধ করার ঘোষণা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় হলো—যেখানে সত্যিকারের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে সেখানে বিদেশি কর্মী প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি ঘাটতির দ্রুত সমাধান হিসেবে অভিবাসনকে ব্যবহার করা উচিত নয়।

ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্যও এই বিতর্কের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ গত কয়েক বছরে স্বাস্থ্য ও পরিচর্যাসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশি ও অন্যান্য বিদেশি কর্মীর সংখ্যা বেড়েছে। ফলে একদিকে শ্রমবাজারে তাঁদের অবদান, অন্যদিকে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, বেতন ও কর্মপরিবেশ—সবকিছুই এখন ব্রিটিশ সরকারের নীতিনির্ধারণের আলোচনায় পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।

শাবানা মাহমুদের এই মন্তব্য এসেছে ‘দ্য রেস্ট ইজ পলিটিক্স’ পডকাস্টে দেওয়া এক বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে। একই সাক্ষাৎকারে তিনি ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দেওয়া নারী আশ্রয়প্রার্থীদের যৌন নির্যাতনের ঝুঁকি এবং মানবপাচারকারীদের ভূমিকা নিয়েও মন্তব্য করেন।