‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’
চট্টগ্রাম বন্দরের একের পর এক টার্মিনাল যাচ্ছে বিদেশি অপারেটরের হাতে
ভয়েস অব পিপল, ৪ অক্টোবর :
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের একের পর এক টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় দেওয়ার প্রক্রিয়া নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। সর্বশেষ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল—এনসিটি ও এর ওভারফ্লো ইয়ার্ড ১৫ বছরের জন্য আন্তর্জাতিক অপারেটরের কাছে দেওয়ার প্রস্তাবে সরকারের অনুমোদন মিলেছে। একই সময়ে চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল—সিসিটিসহ আরও কয়েকটি স্থাপনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় দেওয়ার প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে।

এনসিটি নিয়ে আলোচনাটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার ওঠানামার প্রায় ৪৪ শতাংশ এই টার্মিনালের মাধ্যমে হয়েছে। অর্থাৎ বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার টার্মিনালগুলোর একটির পরিচালনা দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে এর প্রভাব শুধু বন্দরের শ্রমিকদের ওপর নয়, দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থা ও অর্থনীতির ওপরও পড়তে পারে।
সরকারের যুক্তি হলো, আন্তর্জাতিক মানের অপারেটর এলে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, উন্নত যন্ত্রপাতি ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। বিশ্বজুড়ে বড় বন্দর পরিচালনায় বিশেষায়িত আন্তর্জাতিক কোম্পানির অংশগ্রহণ রয়েছে। ফলে সঠিক চুক্তি, বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা এবং কার্যকর নজরদারি থাকলে বিদেশি অপারেটর ব্যবহারের মাধ্যমে বন্দরের কার্যক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এর সম্ভাব্য আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো—বাংলাদেশের দ্রুত বাড়তে থাকা বাণিজ্যের চাপ সামলাতে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা অভিজ্ঞতা ব্যবহার করা। বিদেশি অপারেটর যদি নতুন যন্ত্রপাতি, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও দ্রুত কনটেইনার খালাসের ব্যবস্থা করে, তাহলে জাহাজের অপেক্ষার সময় কমানো এবং ব্যবসার লজিস্টিক ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এখানেই শেষ নয়। প্রশ্ন উঠছে কোন শর্তে, কত খরচে এবং রাষ্ট্রের জন্য কতটা লাভজনকভাবে এসব চুক্তি করা হচ্ছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, দীর্ঘমেয়াদি কনসেশনের ফলে দেশীয় কর্মসংস্থান সংকুচিত হতে পারে এবং বন্দরের ওপর রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ কমতে পারে। তারা আরও বলছে, একটি কৌশলগত জাতীয় অবকাঠামোর পরিচালনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার আগে সম্ভাব্য আয়, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার সক্ষমতা, বিদেশি অপারেটর এলে সরকারের আর্থিক সুবিধা এবং শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ—সবকিছুর তুলনামূলক হিসাব প্রকাশ করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে এনসিটির ক্ষেত্রে প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ইতিমধ্যে চালু এবং দেশের প্রধান কনটেইনার টার্মিনাল। ফলে নতুন করে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার আগে রাষ্ট্র নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় একই ধরনের দক্ষতা ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারত কি না—এটি একটি যৌক্তিক নীতিগত প্রশ্ন।
এখানে বিদেশি প্রতিষ্ঠান মানেই ক্ষতি—এমন সিদ্ধান্ত যেমন ঠিক হবে না, তেমনি বিদেশি প্রতিষ্ঠান এলেই বন্দর আধুনিক হয়ে যাবে—এমন ধারণাও পরীক্ষা ছাড়া গ্রহণযোগ্য নয়।
মূল বিষয় হওয়া উচিত চুক্তির স্বচ্ছতা।
বিদেশি অপারেটর কত বিনিয়োগ করবে, সরকার কত রাজস্ব পাবে, অপারেটরের আয় কীভাবে নির্ধারিত হবে, কর্মীদের চাকরি ও সুযোগ-সুবিধা কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, নিরাপত্তা ও তথ্য ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকবে এবং চুক্তি ভঙ্গ হলে সরকারের কী অধিকার থাকবে—এসব প্রশ্নের উত্তর জনগণের সামনে থাকা প্রয়োজন।
এরই মধ্যে এনসিটির পাশাপাশি সিসিটি পরিচালনায় সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল—আরএসজিটি নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিয়েছে। সিসিটি ২০২৫ সালে বন্দরের মোট কনটেইনার ওঠানামার প্রায় ১৬ শতাংশ পরিচালনা করেছে।
অর্থাৎ বিষয়টি এখন আর একটি টার্মিনালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালনা ব্যবস্থায় বিদেশি অংশগ্রহণ ক্রমেই বড় হচ্ছে।
এ কারণে বিতর্কটিকে শুধু ‘বিদেশি বনাম দেশি’ হিসেবে দেখলে সমস্যার মূল জায়গাটি আড়াল হয়ে যাবে। আসল প্রশ্ন হলো—বিদেশি দক্ষতা নেওয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পাচ্ছে এবং কী ছাড়ছে?
সরকার যদি আন্তর্জাতিক অপারেটরের মাধ্যমে প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও দক্ষতা আনতে চায়, তাহলে সেটি অবশ্যই চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ নিশ্চিত করেই করতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের চাকরি ও অধিকার সুরক্ষা এবং বন্দরের নিরাপত্তা ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও স্পষ্ট থাকতে হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। তাই এর পরিচালনা নিয়ে সিদ্ধান্ত কোনো সাধারণ ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়। দক্ষতা বাড়ানোর প্রয়োজন যেমন বাস্তব, তেমনি জাতীয় স্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নও বাস্তব।
শেষ পর্যন্ত সাফল্য নির্ভর করবে বিদেশি অপারেটর আনা হয়েছে কি না তার ওপর নয়; বরং কী শর্তে আনা হয়েছে, রাষ্ট্র কতটা স্বচ্ছতা রেখেছে এবং জনগণের অর্থনীতি ও জাতীয় স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হয়েছে—তার ওপর।