‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার পথে নারীদের যৌন নিপীড়নের ভয়াবহতা তুলে ধরলেন শাবানা মাহমুদ

চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার পথে নারীদের যৌন নিপীড়নের ভয়াবহতা তুলে ধরলেন শাবানা মাহমুদ

ভয়েস অব পিপল রিপোর্ট, ৫ অক্টোবর :

ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ছোট নৌকায় যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা নারীদের ভয়াবহ যৌন সহিংসতার শিকার হতে হচ্ছে বলে দাবি করেছেন ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ। তাঁর ভাষায়, উত্তর ফ্রান্সে ছোট নৌকায় যুক্তরাজ্যে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা প্রায় প্রতিটি নারীই যাত্রাপথে ধর্ষণের শিকার হয়ে থাকতে পারেন।

তবে এটি কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নয়; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া একটি গুরুতর মূল্যায়ন। তিনি বলেছেন, উত্তর ফ্রান্সে পৌঁছানোর আগের পুরো যাত্রাপথে নারীরা মানবপাচারকারী ও অপরাধী চক্রের হাতে যৌন নির্যাতন, হুমকি ও শোষণের ঝুঁকিতে থাকেন।

শাবানা মাহমুদ সম্প্রতি ‘দ্য রেস্ট ইজ পলিটিক্স’ পডকাস্টে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, উত্তর ফ্রান্সে ছোট নৌকায় ওঠার অপেক্ষায় থাকা অভিবাসীদের বাছাই ও নিয়ন্ত্রণের বড় অংশই করে অপরাধী চক্র। তাঁর মতে, এই চক্রগুলোই ঠিক করে দেয় কারা বিপজ্জনক সমুদ্রপথে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার সুযোগ পাবে।

তিনি বলেন, নারীদের পাশাপাশি কিছু পুরুষও এই যাত্রাপথে নির্যাতন ও হুমকির শিকার হন। ফলে ছোট নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দেওয়ার ঘটনাকে শুধু সীমান্ত পারাপারের বিষয় হিসেবে দেখলে এর মানবিক বিপদের পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে মানবপাচারকারী চক্রের ভূমিকা। তাঁর মতে, যারা সীমান্ত পারাপারের এই অবৈধ ব্যবস্থাটি পরিচালনা করে, তারা একই সঙ্গে আশ্রয়প্রার্থীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। অর্থাৎ যুক্তরাজ্যে কারা পৌঁছাবে, সেই সিদ্ধান্তের একটি অংশ কার্যত রাষ্ট্রের হাতে না থেকে অপরাধী চক্রের হাতে চলে যাচ্ছে—এটাই তাঁর প্রধান উদ্বেগ।

যুক্তরাজ্য সরকার দীর্ঘদিন ধরে ছোট নৌকায় চ্যানেল পারাপার বন্ধ করতে মানবপাচারকারী ও সংঘবদ্ধ অভিবাসন অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। সেপ্টেম্বরে সংসদের স্বরাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির শুনানিতেও মাহমুদ বলেছিলেন, এই অপরাধী নেটওয়ার্কের কার্যক্রম শুধু নৌকা চালানোর পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; অভিবাসীদের উৎস দেশ থেকে শুরু করে যাত্রাপথ, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং উত্তর ফ্রান্সে নৌকায় ওঠার ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত এর বিস্তার রয়েছে।

তিনি আরও সতর্ক করেছিলেন, ছোট নৌকায় চ্যানেল পারাপার অত্যন্ত বিপজ্জনক। বড় নৌকা ব্যবহারের নতুন প্রবণতাও যাত্রীদের ঝুঁকি কমাচ্ছে না; বরং কিছু ক্ষেত্রে বিপদ আরও বাড়ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চ্যানেলে মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনা এখন আগের মতো প্রতিবার সংবাদে না এলেও তা অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে এই বক্তব্যের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের অভিবাসন নীতি নিয়ে আরেকটি বড় প্রশ্ন সামনে এসেছে। সরকার একদিকে অবৈধ ও অনিয়মিত অভিবাসন কমানোর চেষ্টা করছে, অন্যদিকে শরণার্থীদের জন্য নিরাপদ ও বৈধ পথ বাড়ানোর উদ্যোগও নিচ্ছে। সম্প্রতি সরকার আফগান নারী ও শিশু এবং ফিলিস্তিনিদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য পুনর্বাসন ও বৈধ প্রবেশের নতুন পথ চালুর ঘোষণা দিয়েছে।

শরণার্থী কাউন্সিলের ইমরান হুসাইন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যৌন সহিংসতার বিষয়টি সামনে আনার প্রশংসা করলেও বলেছেন, নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনপথ আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তাঁর যুক্তি, বৈধ পথ সীমিত থাকলে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের একটি অংশ অপরাধী পাচারকারীদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হতে পারে।

ফলে শাবানা মাহমুদের বক্তব্য শুধু ছোট নৌকা ঠেকানোর প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নারী নিরাপত্তা, মানবপাচার, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং শরণার্থীদের জন্য নিরাপদ বৈধ পথ তৈরির প্রশ্নও।

ব্রিটিশ সরকারের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে মানবপাচারকারী চক্রকে দুর্বল করা, অন্যদিকে যুদ্ধ, নিপীড়ন বা নির্যাতন থেকে পালিয়ে আসা প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীদের যেন আরও ভয়ংকর অপরাধী চক্রের হাতে পড়তে না হয়, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।