ভয়েস অব পিপল ।। জনগণের কণ্ঠস্বর, বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ১ ।। অরণ্যের আইন

নির্ঝর এর ঝরঝরে অনুগল্প ।। ১ ।। অরণ্যের আইন

।। অরণ্যের আইন ।।

সিদ্দিকুর রহমান নির্ঝর

রাতের বৃষ্টিটা হঠাৎ থেমে যায়। মনেই হচ্ছে না কিছুক্ষণ আগেই মুশলধারে বৃষ্টি হচ্ছিলো। সিলেট এলাকার বৃষ্টি বলে কথা। এভাবে হঠাৎ যে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাবে চিন্তাই করা যায় না।

রফিক পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে নামতে একবার আকাশের দিকে তাকায়। চাঁদ নেই, তারা নেই। শুধু কালো মেঘের ফাঁকে ফাঁকে অদ্ভুত এক নীরবতা। তার হাতে একটা পুরোনো টর্চ। টর্চের আলো কাঁপে, হাতও কাঁপে।

সে জানে, এই পাহাড়ে অন্ধকারেরও মালিক আছে।

নিচের বস্তির মানুষজন জায়গাটার নাম নেয় ফিসফিস করে। কেউ জোরে বলে না। যেন নাম নিলেই বিপদ এসে দরজায় দাঁড়াবে।

রফিকের ছোট ভাই সোহেল তিন দিন ধরে নিখোঁজ। কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

থানায় গিয়েছিল সে। ডিউটি অফিসার চা খেতে খেতে বলেছিল, "খোঁজ নেব।"

তারপর আর কিছু হয়নি।

কিন্তু আজ বিকেলে এক কিশোর এসে খবর দেয়, সোহেলকে নাকি কারা পাহাড়ের ওপরে নিয়ে গিয়েছে। সেখানে নাকি বিচার বসবে।

বিচার!

শব্দটা শুনে রফিকের হাসি পেয়েছিল। এই দেশে আদালত আছে, বিচারক আছে, আইন আছে। তবু পাহাড়ের গহিনে আবার আলাদা বিচার কিসের? রফিক বলে।

কিশোরটি শুধু বলেছিল, "ওখানে অন্য আইন চলে ভাই।"

পাহাড়ের ভেতরে ঢুকতেই রফিক বুঝতে পারে কথাটা মিথ্যা নয়।

দুই পাশে টিনের ঘর। মাঝখানে সরু রাস্তা। কিছু যুবক দাঁড়িয়ে আছে। কারও হাতে ওয়াকিটকি, কারও হাতে লাঠি। তাদের চোখে এমন এক দৃষ্টি, যেন তারা রাষ্ট্রের নয়, রাষ্ট্র তাদের।

একজন পথ আটকে দাঁড়ায়।

"কোথায় যাবি?"

রফিক উত্তর দেয় না। শুধু বলে, "আমার ভাইকে খুঁজছি।"

লোকটা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর অদ্ভুত হাসি হেসে সরে যায়।

আরও ভেতরে গিয়ে সে একটা টিনের ঘরের সামনে ভিড় দেখতে পায়।

ঘরের ভেতর একজন মোটা লোক বসে আছে প্লাস্টিকের চেয়ারে। তার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে কয়েকজন মানুষ।

এক বৃদ্ধ কাঁদতে কাঁদতে বলছে, "স্যার, জমিটা আমার।"

মোটা লোকটি হাই তোলে।

তারপর বলে, "আজ থেকে আর তোমার না।"

বৃদ্ধ আর কিছু বলতে পারে না।

চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোও চুপ।

রফিকের মনে হয়, সে যেন বাংলাদেশের কোনো এলাকায় নয়, বহু শতাব্দী আগের কোনো রাজ্যে এসে পড়েছে। যেখানে রাজা আছে, প্রজা আছে, কিন্তু আইন নেই।

হঠাৎ তার চোখে পড়ে সোহেলকে।

এক কোণে বসে আছে। মুখ ফুলে গেছে। ঠোঁট ফেটে রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে আছে।

রফিক ছুটে যেতে চায়।

কিন্তু দুইজন লোক তার কাঁধ চেপে ধরে।

"দাঁড়া।"

"কেন?"

"বিচার শেষ হয়নি।"

রফিক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে।

সোহেলের অপরাধ কী?

উত্তর আসে খুব সহজভাবে।

সে নাকি থানায় গিয়ে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে চেয়েছিল।

এইটুকুই।

রফিক তখন প্রথমবারের মতো ভয় পায়।

সত্যিকারের ভয়।

কারণ সে বুঝতে পারে, এখানে অপরাধ মানে চুরি নয়, ডাকাতি নয়, খুনও নয়। এখানে অপরাধ হলো কথা বলা।

দূরে কোথাও কুকুর ডাকে। পাহাড়ের ওপর বাতাস বয়ে যায়। মোটা লোকটি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। তারপর সোহেলের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে যায়। ঠিক তখনই অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা বিকট চিৎকার ভেসে আসে। চিৎকারটা কার, কেউ জানে না। তাহলে কি তার ছোট ভাই সোহেল..আর ভাবতে পারে না রফিক।

রফিক শুধু দেখে, চারপাশের মানুষগুলো এক মুহূর্তে নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।

আর পাহাড়ের গভীর অন্ধকারটা যেন ধীরে ধীরে আরও কাছে এগিয়ে আসছে...।

লন্ডন, ৫ জুন ২০২৬