ইরানের শাহেদ ড্রোনের তাণ্ডবে বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের রূপ
ভয়েস অব পিপল, লন্ডন সময় ১৪:১০:
ইরানের তৈরি শাহেদ-১৩৬ নামের আক্রমণাত্মক ড্রোন ইতিমধ্যেই ইউক্রেনের আকাশে আতঙ্কের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। এখন সেই একই ড্রোন মধ্যপ্রাচ্যের আকাশেও দেখা যাচ্ছে। গত ৪৮ ঘণ্টায় ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে শত শত ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
ইরানের এই ড্রোনগুলো তুলনামূলকভাবে বড়, শব্দযুক্ত এবং ডেল্টা-উইং বা ত্রিভুজাকৃতির ডানাযুক্ত। এর দাম প্রায় ৫০ হাজার ডলার হলেও এগুলো তৈরি করা তুলনামূলক সহজ। তাই ব্যয়বহুল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় যুদ্ধক্ষেত্রে এগুলো দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করা সম্ভব বলে সামরিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
সাম্প্রতিক হামলায় বাহরাইন, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন স্থাপনায় ড্রোন আঘাত হেনেছে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, বাহরাইনের একটি উঁচু ভবনের দিকে রাতের অন্ধকারে একটি ড্রোন এগিয়ে যাচ্ছে। ইঞ্জিনের শব্দ অনেকটা ঘাস কাটার যন্ত্রের মতো শোনা যায়। কিছুক্ষণ পর সেটি ভবনে আঘাত হানে এবং আগুনের শিখা ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা শুরু করার পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর দিকে এক হাজারেরও বেশি ড্রোন ছোড়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সোমবার বিকেলে সংযুক্ত আরব আমিরাত জানায়, তাদের দিকে মোট ৬৮৯টি ড্রোন পাঠানো হয়েছিল, যার মধ্যে ৬৪৫টি ভূপাতিত করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৬ শতাংশ ড্রোন প্রতিরক্ষা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে পেরেছে।
শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩.৫ মিটার এবং ডানার বিস্তার ২.৫ মিটার। এগুলো সাধারণত ধীরগতির এবং প্রায় ৫০ কেজি বিস্ফোরক বহন করতে পারে। এই পরিমাণ বিস্ফোরণ একটি বড় ভবনে ক্ষতি করতে পারে, যদিও পুরো ভবন ধ্বংস করার জন্য তা যথেষ্ট নয়। তবে আক্রমণের আগে ড্রোনের শব্দ ও শেষ মুহূর্তের তীব্র ডাইভ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটির ওপর দিয়ে একটি ড্রোন উড়ে এসে রাডার ডোমে আঘাত করে সেটি ধ্বংস করে দেয়। কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও একই ধরনের হামলার খবর পাওয়া গেছে। এমনকি সাইপ্রাসের আক্রোটিরি বিমানঘাঁটিতেও হামলা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই ড্রোনগুলোর পাল্লা প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। এগুলো সাধারণত আগে থেকেই নির্ধারিত জটিল রুটে নিচু উচ্চতায় উড়ে যায়, যাতে রাডারের নজর এড়ানো যায়। তবে ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, অনেক ক্ষেত্রে এগুলো দূর থেকে অপারেটর দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব, ফলে শেষ মুহূর্তে দিক পরিবর্তন করা যায়।
শাহেদ-১৩৬ ড্রোন প্রথম তৈরি হয় গত দশকের শেষ দিকে। ২০২১ সালের জুলাইয়ে ইসরায়েলি মালিকানাধীন একটি তেলবাহী জাহাজে হামলার সময় এগুলো প্রথম আন্তর্জাতিকভাবে নজরে আসে। পরে ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া ব্যাপকভাবে এই ড্রোন ব্যবহার শুরু করলে বিশ্বজুড়ে এগুলোর পরিচিতি বাড়ে।
রাশিয়া পরে এই ড্রোনের নকশা ব্যবহার করে নিজ দেশে বড় পরিসরে উৎপাদনও শুরু করে। ইউক্রেনে অনেক সময় একসঙ্গে শত শত ড্রোন ছুড়ে দিয়ে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি ইরান একই কৌশল মধ্যপ্রাচ্যেও প্রয়োগ করে, তাহলে তা আঞ্চলিক অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ইতোমধ্যে সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারে একটি ড্রোন হামলায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে বিশ্বের অন্যতম বড় এই রিফাইনারি সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হয়েছে।
সামরিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, কম খরচে তৈরি হওয়া এবং দীর্ঘ পাল্লার কারণে শাহেদ ড্রোন ভবিষ্যতের আঞ্চলিক সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই প্রশ্ন উঠছে—ইরান কতদিন এ ধরনের প্রযুক্তি ও কৌশলের মাধ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে এবং এর প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যে কতটা বিস্তৃত হবে।