‘‘দেশ থেকে দেশান্তরে, ভয়েস অব পিপল সবার ঘরে’’

সিলেটে হাম-ডেঙ্গুর দ্বৈত চাপ, একদিনে হাসপাতালে ১৮১ রোগী

সিলেটে হাম-ডেঙ্গুর দ্বৈত চাপ, একদিনে হাসপাতালে ১৮১ রোগী

নিজস্ব প্রতিবেদক, ৬ অক্টোবর :

সিলেট বিভাগে একই সঙ্গে হাম ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় শুধু এই দুই রোগে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১৮১ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৬৩ জন এবং ডেঙ্গু নিয়ে ১৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের ৬ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ১৬৩ জনের মধ্যে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৬০ জন, শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৫৪ জন, পার্কভিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৫ জন, মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ১৩ জন, রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঁচজন, বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচজন এবং বিশ্বনাথ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন ভর্তি হয়েছেন।

এ নিয়ে বর্তমানে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ৫৪২ জন চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ৪১১, সুনামগঞ্জে ৭০, হবিগঞ্জে ৩৩ এবং মৌলভীবাজারে ২৮ জন।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত সিলেট বিভাগে নিশ্চিত হামে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৮১ জন। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ৪০৮, হবিগঞ্জে ১৫৮, মৌলভীবাজারে ১৫৮ এবং সুনামগঞ্জে ৩৫৭ জন। একই সময়ে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত হাম মিলিয়ে বিভাগে ১৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে—সন্দেহভাজন হামে ১৭২ জন এবং নিশ্চিত হামে ১০ জন।

অন্যদিকে সিলেটে ডেঙ্গুর সংক্রমণও কমছে না। গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগে নতুন করে ১৮ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এতে চলতি বছর সিলেট বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮৯ জনে। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৪৮ জন।

অর্থাৎ, হামের ক্ষেত্রে ১৬৩ হলো একদিনের নতুন ভর্তি, আর ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে ৪৮৯ হলো চলতি বছরের মোট আক্রান্তের সংখ্যা—দুটি সংখ্যাকে একই অর্থে দেখা যাবে না।

সিলেটের এই পরিস্থিতি জাতীয় স্বাস্থ্যঝুঁকিরও অংশ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ ৬ অক্টোবরের হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ২৯১ জন হাসপাতালে এসেছেন; তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ১৮০ জন ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে নতুন করে ১০২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং হামের উপসর্গে আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

১৫ মার্চ থেকে ৬ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৯৯ হাজার ১৩। এদের মধ্যে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৫১৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ২১ হাজার ৯১০ জনের শরীরে। সন্দেহভাজন হামে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩২, আর নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ১০২ জনের। অর্থাৎ সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত—দুই হিসাব মিলিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ১৩৪।

জাতীয় হিসাবে হামের মৃত্যুর দিক থেকে সিলেটও অত্যন্ত উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে হামের উপসর্গজনিত মৃত্যুর সংখ্যা সিলেটে ১৭৯, যা ঢাকা বিভাগের পর দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ।

ডেঙ্গুর পরিস্থিতি আরও দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৬ অক্টোবরের সর্বশেষ হিসাবে গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ১ হাজার ৯৯৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মারা গেছেন ১০ জন। চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯০ হাজার ৩৫৬ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ২৮১ জনের। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন ১৮ জন।

অক্টোবরের প্রথম ছয় দিনেই ডেঙ্গুতে দেশে ৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেপ্টেম্বরে মারা গিয়েছিলেন ১৪৮ জন এবং ওই মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। ফলে বর্ষা শেষ হওয়ার পরও ডেঙ্গুর সংক্রমণ কমার পরিবর্তে আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একই সময়ে দুই ধরনের সংক্রামক রোগের চাপ হাসপাতাল ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। হাম ঠেকাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শিশুদের টিকাদান ও দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ; অন্যদিকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি ও টিকা-নির্ভর রোগের নজরদারি নিয়ে একটি স্বাধীন পর্যালোচনাও চালাচ্ছে, যা ৪ থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশের আট বিভাগে পরিচালিত হচ্ছে।

সিলেটের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো—একদিকে হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন শত শত রোগী আসছেন, অন্যদিকে ডেঙ্গুও নতুন রোগী যোগ করছে। ফলে শুধু রোগীর চিকিৎসা নয়, হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক-নার্স, শিশু চিকিৎসা এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ—সব ক্ষেত্রেই সমন্বিত প্রস্তুতি প্রয়োজন।