দেশে ঈদযাত্রায় প্রাণ গেল ৪৩৮ জনের, সড়কেই সবচেয়ে বেশি মৃত্যু; উদ্বেগ বাড়াল দুর্ঘটনার ঊর্ধ্বগতি
ঢাকা প্রতিনিধি:
পবিত্র ঈদুল আজহাকে ঘিরে দেশের মানুষের আনন্দময় যাত্রা এবারও রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে। রাজধানী থেকে গ্রামের পথে এবং ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরার সময় সারা দেশে সড়ক, রেল ও নৌপথে সংঘটিত দুর্ঘটনায় অন্তত ৪৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ১ হাজার ৩৪০ জন। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে সড়কপথে, যেখানে ৩৯৪টি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ৪০২ জন।
রোববার রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি ঈদযাত্রা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করে এসব তথ্য জানায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২১ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত মোট ১৫ দিনের ঈদযাত্রা ও ঈদ-পরবর্তী কর্মস্থলে ফেরার সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। সড়ক দুর্ঘটনার পাশাপাশি রেলপথে ৩১টি দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হয়েছেন। নৌপথে ১৭টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ১৩ জন এবং আহত হয়েছেন ১৬ জন।
গত বছরের তুলনায় বেড়েছে দুর্ঘটনা
যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের ঈদুল আজহার তুলনায় এ বছর দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি উভয়ই বেড়েছে। ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় ৩৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৯০ জন নিহত ও ১ হাজার ১৮২ জন আহত হয়েছিলেন। সেই তুলনায় এ বছর দুর্ঘটনা বেড়েছে প্রায় ৪ শতাংশ, মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে ৩ শতাংশের বেশি এবং আহতের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের সংকট এবং কার্যকর সংস্কারের অভাব এ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
মোটরসাইকেলেই সবচেয়ে বেশি মৃত্যু
প্রতিবেদন বলছে, দুর্ঘটনার তালিকায় বরাবরের মতো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাহন হিসেবে উঠে এসেছে মোটরসাইকেল। ঈদযাত্রাকালে ১৫৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৫৯ জন নিহত এবং ১৮০ জন আহত হয়েছেন।
অর্থাৎ মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৩৯ শতাংশই ঘটেছে মোটরসাইকেলকে কেন্দ্র করে। দ্রুতগতিতে চলাচল, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার না করা, মহাসড়কে অনিয়ন্ত্রিত মোটরসাইকেল চলাচল এবং বৃষ্টির কারণে সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোকে এ প্রবণতার জন্য দায়ী করা হচ্ছে।
কোন যানবাহন কতটা জড়িত
দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মোটরসাইকেলের পরেই রয়েছে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান। এরপর রয়েছে যাত্রীবাহী বাস।
দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের মধ্যে—
- মোটরসাইকেল: ২৮.৯০ শতাংশ
- ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান: ২১.৪০ শতাংশ
- বাস: ১৬.৫৬ শতাংশ
- ব্যাটারিচালিত রিকশা: ১২.৩৪ শতাংশ
- কার ও মাইক্রোবাস: ৭.৮১ শতাংশ
- নছিমন-করিমন: ৬.৫৬ শতাংশ
- সিএনজিচালিত অটোরিকশা: ৬.৪০ শতাংশ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মহাসড়কে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের মিশ্র চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
মুখোমুখি সংঘর্ষই সবচেয়ে ভয়াবহ
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক দুর্ঘটনাই ঘটেছে মুখোমুখি সংঘর্ষে। মোট দুর্ঘটনার ৪৬.৪৪ শতাংশ ছিল এ ধরনের।
এ ছাড়া—
- গাড়িচাপা বা ধাক্কা: ২৯.১৮ শতাংশ
- নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়া: ১৭.২৫ শতাংশ
- ট্রেন-যানবাহনের সংঘর্ষ: ১.৫২ শতাংশ
- অন্যান্য কারণ: ৫.৫৮ শতাংশ
বিশ্লেষকদের মতে, মহাসড়কে ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতা, বিপরীত লেনে প্রবেশ এবং গতিসীমা না মানার প্রবণতা মুখোমুখি সংঘর্ষের বড় কারণ।
জাতীয় মহাসড়কেই অর্ধেকের বেশি দুর্ঘটনা
সড়কের ধরন অনুযায়ী দেখা গেছে, দেশের জাতীয় মহাসড়কগুলোই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মোট দুর্ঘটনার—
- ৫০.৫০ শতাংশ ঘটেছে জাতীয় মহাসড়কে
- ৩০.৭১ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে
- ১৪.৪৬ শতাংশ ফিডার রোডে
- ২.৫৩ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে
- ০.২৫ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে
- ১.৫২ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে
কেন বাড়ছে দুর্ঘটনা
যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে দুর্ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।
সংগঠনটির মতে, বৃষ্টির কারণে দেশের বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়কে অসংখ্য গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। এসব গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে অনেক যানবাহন নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। পাশাপাশি মহাসড়কে মোটরসাইকেল, অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশার অবাধ চলাচল পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
এ ছাড়া সড়কবাতির অভাব, রোড সাইনের স্বল্পতা, মিডিয়ান না থাকা, নির্মাণ ত্রুটি, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক এবং অতিরিক্ত গতিকেও দুর্ঘটনার বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
চালক সংকট ও অতিরিক্ত ট্রিপের চাপ
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঈদের সময় পরিবহন খাতে চালক সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। ফলে প্রায় ৮০ শতাংশ যানবাহন একজন চালক দিয়েই দীর্ঘ সময় পরিচালনা করা হয়েছে।
বিশ্রামহীনভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়ি চালানোর ফলে চালকদের মনোযোগ কমে যায় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে কিছু পরিবহন মালিক অতিরিক্ত মুনাফার আশায় পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ বাস মেরামত না করেই রাস্তায় নামিয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
ফলে যাত্রীবোঝাই অনেক বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদ, খাল বা সড়কের পাশের নিচু স্থানে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের দাবি
সংবাদ সম্মেলনে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, প্রতি ঈদেই লাখো মানুষ রাজধানী ও বিভিন্ন শহর থেকে গ্রামের পথে যাতায়াত করেন। কিন্তু এখনো পরিবহন ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হয়নি।
তিনি বলেন, শুধু ঈদকেন্দ্রিক সাময়িক ব্যবস্থা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রয়োজন। উন্নত বিশ্বের আদলে আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক, প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহন অপসারণ জরুরি।
সংগঠনটি মহাসড়কে নিরাপত্তা করিডর নির্মাণ, নিয়মিত রোড সেফটি অডিট, চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ, বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি, চাঁদাবাজি বন্ধ এবং পরিবহন খাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করারও সুপারিশ করেছে।
উদ্বেগজনক বার্তা
ঈদের সময় মানুষ পরিবার-পরিজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করতে বাড়ি ফেরে। কিন্তু প্রতি বছর শত শত মানুষের প্রাণহানি প্রমাণ করে, বাংলাদেশের সড়ক নিরাপত্তা সংকট এখনো গভীর। দুর্ঘটনার সংখ্যা ও প্রাণহানির ধারাবাহিক বৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সাময়িক অভিযান নয়—পরিকল্পিত ও স্থায়ী সংস্কার ছাড়া এ পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া কঠিন হবে।